১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

ভাঙা হাটে ঈদের সকালে গরু নিয়ে বসে বিমর্ষ বেপারীরা

এবারের লোকসানের বোঝা টেনে আগামীতে গরুর ব্যবসায় থাকবেন কি না, সেই দুশ্চিন্তাও ভর করেছে।

ভাঙা হাটে ঈদের সকালে গরু নিয়ে বসে বিমর্ষ বেপারীরা

অবিক্রিত গরু নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে ঢাকার দনিয়া হাটে বসে শফিকুল ইসলাম।

শেখ আবু তালেব

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 29 Jun 2023, 02:39 PM

Updated : 03 Jul 2023, 11:05 PM

মাঝারি আকারের ২২টি গরু নিয়ে কুষ্টিয়া থেকে এসেছেন আব্দুস সামাদ। সেই গরু দেখভালে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন আরও দু’জনকে। নগদ টাকায় কিনে এসব গরু এনেছিলেন ঢাকার যাত্রাবাড়ীর দনিয়ার হাটে।

ঈদের আগে দিন বুধরাত রাত পর্যন্ত সামাদ ১৫টি গরু বিক্রি করতে পেরেছিলেন। রয়ে গেছে সাতটি।

আগেরগুলো যে খুব লাভে বিক্রি করতে পেরেছেন, তাও নয়। রয়ে যাওয়া সাতটির দাম কমিয়েও ক্রেতা পাননি।

তাই বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে সবাই যখন নামাজ পড়তে ঈদগাহমুখী , তখনও দুই সহকারীকে নিয়ে সামাদ আশ্রয় নিয়েছিলেন ফুটব্রিজের নিচে; সামনেই বাঁধা মাঝারি আকারের গরু সাতটি।

সুনসান এই হাটে কোনো ক্রেতা দেখা যায়নি ঈদের সকালে, যাওয়ার কথাও না। হাটের ইজারাদার ও নিরাপত্তা কর্মীরাও চলে গেছে। জনমানবশূন্য সেই হাটে শুধু গরু নিয়ে ব্যবসায়ী ও তাদের সঙ্গী কজনই কেবল ছিল।

Image

কুষ্টিয়া থেকে ঢাকার দনিয়ার হাটে আসা আব্দুস সামাদের সাতটি গরুই বিক্রি হয়নি

ঢাকায় গরু এনে এবারের অভিজ্ঞতা ‘ভালো না’, এক কথায় বললেন সামাদ। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “নগদ টাকা দিয়ে সব গরু কিনে হাটে আনলাম। যেগুলো বিক্রি হয়েছে, তাতে লোকসান হয়নি ঠিকই। কিন্তু লাভ হয়েছে মাত্র ২-৫ হাজার ট্যাকা।”

এই লাভের টাকাও আসলে থাকছে না তার কাছে, উল্টো পকেট থেকেও কিছু যাবে।

সামাদ বললেন, “গরু আনা, হাটে রাখা, মানুষ খাটানো, ৪-৫ দিন হাটে থাকার খরচ, গরুর খাবার, ট্রাক ভাড়া, আবার গ্রামে ফেরত যেতে এ টাকা শেষ হয়ে যাবে। শেষে হাতে কিছুই থাকবে না।”

পুরানো খবর:

ঢাকার গাবতলীর হাটে গরুর বেপারীদের মাথায় হাত

পুরানো খবর:

ঢাকার কোরবানির হাটে শেষ বেলায় উল্টো চিত্র

এবার ঢাকায় কোরবানির হাটগুলোতে ছিল গরুর বেপারীদের হাহাকার। অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে বিরূপ আবহাওয়ায় গরু বিক্রি হয়েছে কম, বিশেষ করে বড় গরু যারা নিয়ে এসেছিলেন, তারা ক্রেতাই পাননি। আর যে দাম পাওয়ার কথা সেই দাম ওঠেনি বলেই বেপারীদের ভাষ্য।

হাটে কেনা-বেচার শেষ দিন বুধবার রাজধানীতে গরুর সবচেয়ে বড় বাজার গাবতলীতে অনেক বেপারী লোকসান দিয়ে বিক্রি করতে চেয়েও ক্রেতা পাননি বলে জানান।

যে সাতটি গরু সামাদ নিয়ে এসেছিলেন, সেগুলোও কিছুটা লোকসান দিয়ে বিক্রি করতে চেয়েছিলেন সামাদ; কেননা তাতে এগুলো ফেরত নেওয়ার ট্রাকভাড়াটা অন্তত বাঁচবে।

Image

ঢাকায় কোরবানির হাটে গরু নিয়ে এসে লোকসানে পড়ে বিমর্ষ আব্দুস সামাদ

সামাদ বলেন, “যে গরু আছে এখনও, তার প্রত্যেকের পেছনে ৬০-৭০ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। কিন্তু দাম বলে ৪৫-৫০ হাজার টাকা। এত কমে তো আর বিক্রি করা যায় না।”

এখন অবিক্রিত গরু বাড়িতে নিয়ে আরো কমপক্ষে দিন দশেক পুষতে হবে। এরপর গ্রামের হাটে বা কসাইয়ের কাছেই বিক্রি করার পরিকল্পনা করছেন বির্মষ সামাদ।

তবে তিনি এটাও জানেন, কোরবানির হাটে যে দাম পাওয়া যায়, তা গ্রামের হাটে পাওয়া যাবে না।

সামাদ বলেন, কোরবানির ঈদের ১০-১৫ দিন বাজারে মাংসের চাহিদা থাকে না। সবার বাড়িতেই মাংস থাকে। তাই এ কয়দিন গরু বিক্রি করা যাবে না।

বিক্রি না হওয়া এই গরু ঢাকা থেকে গ্রামে নিয়ে পুনরায় বিক্রি না হওয়া পর্যন্ত দেখভাল খরচ বহন করতে হবে।

বড় লোকসানের বোঝা টেনে আগামী কোরবানির ঈদে গরু ব্যবসায় নামতে পারবেন কি না, সেই দুশ্চিন্তা এখনই কপালে ভাঁজ ফেলেছে সামাদের।

সামাদের মতো আরো অনেক ব্যবসায়ীর সব গরু বিক্রি হয়নি। কেউ বুধবার রাতে ফিরে গেছেন। কেউ গাড়ির সন্ধান করছেন।

তাদের একজন ফরিদপুর সদর উপজেলার মোজাফফর হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এবারের হাটে সাতটি গরু এনেছিলেন, চারটা বিক্রি হলেও তিনটি বিক্রি হয়নি।

Image

দনিয়া হাটে মোজাফফর হোসেনের তিনটি গরু অবিক্রিত থেকে গেছে 

“পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান হলেও বিক্রি করে দিতাম। এমনিতেই গ্রাহক কম, তার উপর দাম বলেছেন, কেনা দরের চেয়েও ১০-১৫ হাজার টাকা কম। তাই ফেরত নিয়ে যাব গাড়ি পেলে।”

মেঘ কালো আকাশের নিচে হাটের মধ্যে তিনটি গরুর মাঝে বসে ঝিমুচ্ছিলেন ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম। তিনি পাঁচটি গরু এনেছিলেন। তিনটিই বিক্রি করতে পারেননি।

“যে দর উঠেছিল তাতে গরু বাড়ি নিয়ে যাওয়াই ভালো,” বলেন তিনি।

এভাবে অনেক গরুই অবিক্রিত থেকে গেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট মহাসড়কের দনিয়া এলাকায় বসানো অস্থায়ী হাটে।

গত ৭-৮ বছরে ধরে দনিয়ার এ অস্থায়ী হাটে কোনো গরু অবিক্রিত থাকেনি বলে জানিয়েছেন এলাকার ব্যবসায়ী ও হাটে আগত গরু ব্যবসায়ীরা। তবে এবার পরিস্থিতি বিপরীত দেখা গেল।

সরকারি হিসাবে গত বছর কোরবানির পশুর চাহিদা ছিল ১ কোটি ২১ লাখ। এর বিপরীতে কোরবানির সময়ে পশু জবাই হয় ৯৯ লাখ।

তবে এবার কোরবানির পশু চাহিদার চেয়ে বেশি প্রস্তুত থাকায় পশু উদ্বৃত্ত থাকতে পারে বলে আগেই জানিয়েছে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

Image

অবিক্রিত তিনটি গরু নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে দনিয়া হাটে বসে শফিকুল ইসলাম

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর কোরবানির জন্য পশু প্রস্তুত আছে ১ কোটি ২৫ লাখ ৩৬ হাজার ৩৩৩টি। এর মধ্যে ৪৮ লাখের বেশি হচ্ছে গরু এবং মহিষ।

অন্যদিকে চাহিদা রয়েছে ১ কোটি ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৭৩৯টি। সবমিলিয়ে কোরবানির পশু উদ্বৃত্ত থাকবে ২১ লাখের বেশি বলেই ধরে নেওয়া হচ্ছে।

এবার ঈদের দিনসহ সর্বমোট পাঁচ দিনের জন্য ইজারার অনুমোদন পাওয়া ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ দুই সিটি কর্পোরেশনে এবার হাট বসেছে ২১টি স্থানে। যার মধ্যে মাত্র দুটি হাট স্থায়ী। দনিয়াসহ বাকিগুলো শুধু কোরবানির ঈদ উপলক্ষে অস্থায়ীভাবে বসানো হয়েছে।