Published : 31 May 2026, 12:01 AM
ঢাকার কলাবাগানের বাসা থেকে গ্রীন লাইফ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক কাজী সাবিরা রহমান লিপির লাশ উদ্ধারের পর পাঁচ বছর পার হলেও হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ।
থানা পুলিশ, ডিবি পুলিশের হাত ঘুরে মামলার তদন্তভার পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এখন পর্যন্ত মামলার প্রতিবেদন জমা দিতে ৫০ বার সময় নিয়েছে এ তদন্ত সংস্থা। কিন্তু অভিযোগপত্র জমা পড়েনি।
সাবিরার মা সালমা রহমানের প্রশ্ন, “এত দিনেও জানতে পারব না মেয়েটার খুনি কে?”
সবশেষ গত ২৭ এপ্রিল এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমার দিন ছিল। তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. এমরানুল হক সেদিনও প্রতিবেদন দিতে পারেনি। আগামী ৭ জুন প্রতিবেদন জমার পরবর্তী দিন রেখেছেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মনিরুল ইসলাম।
যোগাযোগ করা হলে পরিদর্শক এমরানুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, " আপাতত বিশেষ কোনো আপডেট নাই। মামলাটা যে পর্যায়ে ছিল, সেই তদন্তের পর্যায়েই আছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টা নিয়ে তৎপর। খুঁটিনাটি বিষয়গুলো পর্যালোচনা করছি। তদন্ত শেষ হলে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেব।"
এদিকে এতদিনেও মামলার তদন্ত শেষ না হওয়ায় হতাশা ভর করছে সাবিরার পরিবারে।
সাবিরার মামাতো ভাই, মামলার বাদী রেজাউল হাসান মজুমদার জুয়েল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "তদন্ত কর্মকর্তা আসে, তদন্ত কর্মকর্তা যায়। কিন্তু তদন্ত শেষ হয় না। রহস্য উদঘাটন হয় না। মামলাটার তেমন কোনো আপডেট নাই।
“ফ্যামিলি থেকে হতাশাবোধ করছি। বিচার হোক বা না হোক, খুনের রহস্য, কে খুন করল এটা জানতে চাই। পাঁচটা বছর হয়ে গেল খুনের কারণ জানতে পারলাম না।"

কলাবাগান প্রথম লেইনের একটি বাড়ির চার তলার ফ্ল্যাট থেকে ২০২১ সালের ৩০ মে সাবিরার লাশ উদ্ধার করা হয়। তখন ৪৭ বছর বয়সী এই চিকিৎসক গ্রীন লাইফ হাসপাতালে কাজ করতেন। তার শরীরে ধারাল জখম এবং পুড়ে যাওয়ার চিহ্ন পাওয়ার কথা পুলিশ জানিয়েছিল।
ওই ঘটনায় ১ জুন কলাবাগান থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন রেজাউল হাসান মজুমদার জুয়েল। এজাহারে কাউকে আসামি করা না হলেও তদন্তে নেমে ২০২২ সালের ১৯ এপ্রিল সাবিরার স্বামী এ কে এম সামছুদ্দিন আজাদকে শান্তিনগর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই।
সে সময় রিমান্ডে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। এখন উচ্চ আদালত থেকে জামিনে রয়েছেন তিনি।
সাবিরার স্বামীর প্রসঙ্গ টেনে রেজাউল হাসান বলেন, "সে ধুরন্ধর। হত্যাকাণ্ডে জড়িত কি না জানি না। ঘটনার দিন সে বাসায় ছিল, তার ড্রাইভারও বাসায়। যদিও পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, তবে লেট হয়ে গেছে। ঘটনার পরপরই তাকে গ্রেপ্তার করা উচিত ছিল। তা না করায় সে যথেষ্ট সময় পেয়েছে নিজেকে প্রস্তুত করার।"
মামলার তদন্তে ডিবি পুলিশের ‘গাফিলতি ছিল’ অভিযোগ করে বাদী বলেন, "তারা সঠিক পথে মামলাটা তদন্ত করতে পারেনি। তারা গাফিলতি করেছে। মামলাটা ইচ্ছা করে ঘোলাটে বানিয়ে ফেলছে। আমরা হতাশ।"
কয়েকদিন আগে সাবিরার মায়ের বাসায় গিয়েছিলেন জানিয়ে রেজাউল হাসান বলেন, “উনি আমাদের কাছে জানতে চান খুনি কেন, মামলার তদন্ত কতদূর। অনেক বছর তো হয়ে গেল, সাবিরার কথা মনে পড়লে অস্থির হয়ে পড়েন।"
ডা. সাবিরা যে ফ্ল্যাটে থাকতেন, সেই বাসায় কক্ষ ছিল তিনটি। একটি কক্ষে সাবিরা থাকতেন, বাকি দুটি কক্ষ দুই তরুণীকে সাবলেট দিয়েছিলেন।
সাবিরার পাশের কক্ষের কানিজ সুবর্ণা মডেলিং করতেন। তিনিই প্রথমে ভবনের দারোয়ানসহ কয়েকজনকে এনে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে সাবিরার লাশ দেখেন।
তারা ঢুকে দেখতে পান, সাবিরা বিছানায় পড়ে আছেন এবং ঘরে ধোঁয়া। পরে ফায়ার ব্রিগেড এসে পানি ছিটিয়ে চলে যায়। পুলিশ বেলা ১২টার দিকে এসে তাকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে।
আরেকটি কক্ষে যে তরুণী থাকতেন, তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় প্রশাসনে (বিবিএ) পড়তেন। তিনি ঘটনার আগেই বাড়িতে গিয়ে আর ফেরেননি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কলাবাগান জোনের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ ফারুকুজ্জামান সেদিন বলেছিলেন, “তার (সাবিরা) গলায় ও কোমরে গুরুতর জখম আছে। বিছানার জাজিম পোড়া দেখা গেছে এবং শরীরেও পুড়ে যাওয়ার চিহ্ন রয়েছে।”



কিন্তু পুলিশ কোনো অস্ত্র পায়নি, খুনির আঙুলের ছাপ নেই কোথাও। এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি, যিনি সন্দেহজনক কাউকে ভবনে ঢুকতে বা বের হতে দেখেছেন। সেই ভবনে নেই কোনো সিসিটিভি ক্যামেরাও।
ওই ঘটনায় সাবিরার পাশের কক্ষের তরুণী, তার ছেলে বন্ধু এবং বাড়ির দারোয়ানকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। কিন্তু তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
মামলা হওয়ার পর পুলিশের তদন্ত এগোতে থাকে সাবিরার স্বামীকে ঘিরে। থানা ও ডিবি পুলিশ এই হত্যা রহস্য উন্মোচন করতে না পারার পর ২০২১ সালের ২২ আগস্ট মামলার দায়িত্ব পায় পিবিআই।
পরের বছর এপ্রিলে সাবিরার স্বামী আজাদকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাতেও রহস্যের জট খোলেনি। তিনি এখন জামিনে মুক্ত।
কবে নাগাদ তদন্ত শেষ হবে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা এমরানুল হক বলেন, "এটা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।"