Published : 01 Jul 2026, 01:43 PM
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল পরিচালনায় গঠিত অ্যাডহক কমিটির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাই কোর্টে রিট আবেদন করেছেন একজন আইনজীবী।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইউনুছ আলী আকন্দ বুধবার এই রিট আবেদন করেন। আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলকে সেখানে বিবাদী করা হয়।
আইন মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনের কার্যকারিতা কেন ‘আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও বেআইনি’ ঘোষণা করা হবে না, সে প্রশ্নে রুল জারির আর্জি জানানো হয়েছে রিট আবেদনে। সেইসঙ্গে রুল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় ওই প্রজ্ঞাপনের কার্যকারিতা স্থগিত চাওয়া হয়েছে।
এছাড়া আগামী ৩০ দিনের মধ্যে বার কাউন্সিলের নির্বাচন অনুষ্ঠানের নির্দেশনা এবং নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত বার কাউন্সিলের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অ্যাটর্নি জেনারেল ও বার কাউন্সিলের সচিবকে দায়িত্ব দেওয়ার আরজি জানানো হয়েছে আবেদনে।
রিট আবেদন করার পর ইউনুস আলী আকন্দ সাংবাদিকদের বলেন, "ইতোপূর্বে নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা করেছিল, কিন্তু এই সরকার সেই নির্বাচন স্থগিত করে দেয়। পরে পুনরায় নির্বাচন তফসিল ঘোষণা না করে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি যোগসাজশে একটি অ্যাডহক কমিটি করেছে; যেটা বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের আটের দুই অনুচ্ছেদের সাথে সাংঘর্ষিক।"
২০২৪ সালে জুলাই আন্দোলনের আগে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ‘একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ’ ছিল। ২০২২ সালের মে মাসের নির্বাচনে ১৪ পদের মধ্যে ১০টিতেই জয় পায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত ‘সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ’ এবং পদাধিকারবলে তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।
ওই বছর ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আমিন উদ্দিন পদত্যাগ করেন। ৮ অগাস্ট সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আসাদুজ্জামানকে (বর্তমান আইনমন্ত্রী) নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল নিযুক্ত করা হয়। এর ফলে তিনি পদাধিকারবলে বার কাউন্সিলের নতুন চেয়ারম্যান হন।
এরপর সেপ্টেম্বর মাসে আইনজীবী তালিকাভুক্তির এনরোলমেন্ট কমিটিতে যুক্ত হন ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল ( বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল)।
পরবর্তীতে নিয়মিত কমিটির মেয়াদ শেষে নতুন নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ২৮ মে এক বছর মেয়াদের জন্য ১৪ সদস্যের একটি অ্যাডহক কমিটি গঠন করেছিল আইন মন্ত্রণালয়, যার চেয়ারম্যান ছিলেন মো. আসাদুজ্জামান।
তবে এই কমিটির আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ২০২৫ সালের ২৪ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে সংবাদ সম্মেলন করে এটি বাতিলের দাবি তোলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আইনজীবী সংগঠন ‘ন্যাশনাল লইয়ার্স অ্যালায়েন্স (এনএলএ)’।
তাদের দাবি ছিল, বার কাউন্সিলের মূল আইনে এমন অ্যাডহক কমিটির কোনো স্পষ্ট বিধান নেই।
এই কমিটির ব্যবস্থাপনায় ২০২৬ সালের ১৯ মে সাধারণ সদস্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের সূচি নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু গত ১৫ এপ্রিল এক জরুরি সভায় দেশব্যাপী তীব্র জ্বালানি সংকট ও জেলা বারগুলোর আবেদনের মুখে সেই নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়।

এই নির্বাচন স্থগিতের ধারাবাহিকতাতেই মঙ্গলবার সরকার ১৫ সদস্যের একটি নতুন অ্যাড-হক কমিটি গঠন করে দেয়, যার চেয়ারম্যান থাকবেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জয়নুল আবেদীন, বদরুদ্দোজা বাদল, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, জসীম উদদীন সরকার, এ এইচ এম মুশফিকুর রহমান তুহিন, রাগীব রউফ চৌধুরী, নাসির উদ্দিন অসীম, সরকার তাহমিনা বেগম সন্ধ্যা, মোহাম্মদ হোসেন লিপু এবং মোহাম্মদ শিশির মনির।
এছাড়া জেলা আইনজীবী সমিতিগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামের আইনজীবী নাজিম উদ্দিন চৌধুরী, বগুড়ার আলী আসগর, ঢাকার সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং সুপ্রিম কোর্টের মাহফুজুর রহমান মিলন এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এই অ্যাডহক কমিটির মেয়াদ হবে ১ জুলাই থেকে এক বছর।
আগের আওয়ামী লীগ সরকারের ধারাবাহিকতা বর্তমান সরকারও বজায় রেখেছে দাবি করে আইনজীবী ইউনুস আলী আকন্দ বলেন, "আমরা জানি, প্রতি তিন বছর অন্তর অন্তর বার কাউন্সিলে মে মাসের ভেতর নির্বাচন হয়। কিন্তু ২০২১ সালে মহামারীর কারণে আওয়ামী লীগ সরকার বার কাউন্সিল অর্ডার ১৯৭২-এ একটি অ্যামেন্ডমেন্ট করে। সেখানে এক বছরের জন্য অ্যাডহক কমিটি করতে পারে, এই মর্মে আইন সংশোধন করে।
“আওয়ামী লীগ সরকারও একাধিকবার অ্যাডহক কমিটি করেছে। বিএনপি সরকার সেই আওয়ামী লীগের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নির্বাচন না করে একাধিকবার অ্যাডহক কমিটি করছে।"
৩০ জুনের প্রজ্ঞাপনের আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, "গতকাল যে অ্যাডহক কমিটি করেছে, ওখানে উল্লেখ করা হয়েছে আটের দুই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তারা এই কমিটি করেছে। কিন্তু ওই আটের দুই অনুচ্ছেদে এক বছরের জন্য কমিটি করতে পারে। এক বছরের কমিটি ইতিপূর্বে শেষ হয়ে গেছে। এখন নির্বাচন ছাড়া কোনো অ্যাডহক কমিটি ওই আইনে বহাল থাকতে পারে না।"
কমিটিতে ‘রাজনৈতিক ভাগাভাগির’ সমালোচনা করে এ আইনজীবী বলেন, "সরকারের হস্তক্ষেপে বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপির মধ্যে পদ ভাগাভাগি করে এই অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছে। একটি নির্বাচিত কমিটিতে ১৫ জন সদস্য থাকেন, কিন্তু অ্যাডহক কমিটিতেও ১৫ জন সদস্য রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাছাড়া যে আইনের অধীনে এই অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেটি নিজেই সংবিধানের পরিপন্থি।"
রিটের আবেদন বলা হয়, “২০২১ সালের সংশোধনীটি নিজেই সংবিধান এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অর্ডার ১৯৭২-এর পরিপন্থি। ফলে এর অধীনে গঠিত সব অ্যাডহক কমিটি সম্পূর্ণ বেআইনি ও অসাংবিধানিক। অ্যাডহক কমিটির সদস্যরা রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত এবং তাদের কেউ নিরপেক্ষ নন। ব্যক্তিগত স্বার্থে গঠিত এই কমিটি সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থি।”
ইউনুস আলী আকন্দ বলেন, তিনি বিষয়টি আদালতে উপস্থাপন (মেনশন) করবেন এবং আগামী রোববার এর শুনানি হতে পারে বলে তিনি আশাবাদী।
পুরনো খবর