Published : 14 May 2026, 11:41 PM
রাজধানীর গুলশানের ‘শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্ক’এর নাম বদল নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চললেও নাম বদলের কাজটি কীভাবে করা হল, তা নিয়েই তৈরি হয়েছে অস্পষ্টতা।
পার্কটির চারপাশের সাইনবোর্ডগুলো থেকে দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের নাম সরিয়ে ‘গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক ও ক্রীড়া কমপ্লেক্স’ লেখা নতুন সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে, যা নিয়ে ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন তাজউদ্দীন আহমদের ছেলে তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন বলছে, সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ২০২০ সালে পার্কটির নাম বদলে তাজউদ্দীন আহমদের নামে রাখা হয়। এখনও সেই নামই আছে।
অন্যদিকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-রাজউক বলছে, এ পার্কের মালিক তারা, উত্তর সিটি করপোরেশনকে দেওয়া হয়েছিল আধুনিকায়নের জন্য। পার্কটির নাম আগে ‘গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক’ ছিল, এখনো সেই নামই আছে ।
গত বুধবার পার্কে গিয়ে দেখা যায়, তাজউদ্দীন আহমদের নামে থাকা চারটি সাইনবোর্ড ও একটি নামফলকের মধ্যে পশ্চিম পাশের নামফলকটি ছাড়া বাকি চারটি সাইনবোর্ড খুলে ফেলা হয়েছে। মূল ফটকের ভেতরের ভবনে লাগানো হয়েছে নামফলক । সাইনবোর্ডে লেখা–‘গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক ও ক্রীড়া কমপ্লেক্স; পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় গুলশান ইয়ুথ ক্লাব লিমিটেড’।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবুল কাশেম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পার্কটি ডিএনসিসির নামেই রেকর্ডভুক্ত আছে। এ বিষয়ে সরকারি গেজেটও রয়েছে। ২০২০ সালে ডিএনসিসির নামকরণ কমিটির সুপারিশ ও সভার অনুমোদনের পর স্থানীয় সরকার বিভাগের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এর নামকরণ করা হয়।”
তিনি অভিযোগ করেন, “সাত-আট মাস আগে রাজউক একতরফাভাবে একটি রেজুলেশন করে পার্কটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। এ বিষয়ে ডিএনসিসি চিঠি দিলেও রাজউক কোনো জবাব দেয়নি। এখন আবার নাম পরিবর্তন করতে হলে একই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। আমাদের জানা মতে, সে ধরনের কোনো প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।”
অন্যদিকে রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বিষয়টিকে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ হিসেবে তুলে ধরছেন।
তিনি বলেন, “পার্কটি ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সিটি করপোরেশনকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চুক্তির বিভিন্ন শর্ত ভঙ্গ করা হয়েছে বলে রাজউকের নজরে আসে। আমাদের নথিতে এখনো পার্কটির নাম ‘গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক’ হিসেবেই আছে। যদি নাম পরিবর্তন করা হয়ে থাকে, সেটি আমাকে জানানো হয়নি।”
তিনি বলেন, “এটি একটি স্পর্শকাতর বিষয়। জাতীয় নেতাকে ঘিরে বিষয়টি 'বড়' করতে চাই না। আমরা সবাইকে নিয়ে এটি সমাধান করব।”

কী বলছে গুলশান ইয়ুথ ক্লাব?
নতুন সাইনবোর্ডে পার্কটির পরিচালনার দায়িত্বে গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের নাম থাকলেও ক্লাবের সভাপতি ওয়াহিদুজ্জামান তমাল এ বিষয়ে অজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, “মিড সেভেন্টিস থেকে এখানে আমাদের ক্লাব। আমরা আমাদের মত খেলাধুলা করি। নাম পরিবর্তন প্রসঙ্গে কিছু জানি না। প্রথমে আমাদের ডিএনসিসির সাথে চুক্তি ছিল, পরে আমরা রাজউকের সাথে আরেকটি চুক্তি করি।”
ক্লাবের সভাপতি নাম বদল নিয়ে অজ্ঞতা প্রকাশ করলেও ক্লাবের অফিস সেক্রেটারি মিজানুর রহমানকে উদ্ধৃত করে সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজউকের অনুমতিতেই তারা নতুন সাইনবোর্ড লাগিয়েছেন।
আবার গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কাছে দাবি করেছেন, রাজউকই নাম পরিবর্তনের কাজটি করেছে।

সোহেল তাজের ক্ষোভ
পার্কের নামফলক অপসারণের ঘটনায় হতাশ ও ক্ষুব্ধ তানজিম আহমদ সোহেল তাজ বলেন, “সরকারের কাছে আমার অনুরোধ থাকবে, তাজউদ্দীন আহমদের যেসব স্মৃতি ও নাম রয়েছে, সব মুছে ফেলতে। তিনি দেশের মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে অবদান রেখেছেন। বাংলাদেশ যদি নিজের অতীত, ইতিহাস ও সত্তাকে ভুলে যেতে চায়, তাহলে ভবিষ্যৎ অন্ধকারই হবে।”
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একটি উদ্যোগের কথা স্মারণ করে তিনি বলেন, “আমাদের সাতমসজিদ রোডের বাসার সামনে একটি আমগাছ ছিল। রাস্তা সম্প্রসারণের সময় সব গাছ কাটার সিদ্ধান্ত হলেও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেই গাছটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। কারণ, তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এবং আমার বাবাকে শ্রদ্ধা করতেন। সেই স্মৃতি ধরে রাখতেই গাছটি রক্ষা করা হয়েছিল।”
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “এখন তারই সন্তান প্রধানমন্ত্রী, আর তার সময় যদি এ ধরনের ঘটনা ঘটে, সেটা আমার কাছে আশ্চর্যজনক লাগে। আমি আশা করব, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একজন মহান মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস সংরক্ষণে সজাগ থাকবেন এবং কোনো শক্তি যেন এই ইতিহাস বিকৃত করতে না পারে, সেদিকে নজর রাখবেন।”
তাজউদ্দীন আহমদের নাম ‘ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়’ মন্তব্য করে তার ছেলে বলেন, “এটা কোনো দলের দায়িত্ব ছিল না, এটা ছিল রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যে জাতি নিজের সত্তা, ইতিহাস ও উৎস সম্পর্কে অবহিত না, তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। মুক্তিযুদ্ধ ছিল আমাদের গর্ব ও অনুপ্রেরণার জায়গা, কিন্তু আমরা সেটাকেই ভুলে গেছি। এটাই বাংলাদেশের ট্র্যাজেডি।”

যেভাবে নামকরণ হয়েছিল
গুলশান মডেল টাউনের নকশা অনুযায়ী, ৮ দশমিক ৮৭ একর আয়তনের পার্কটির অবস্থান গুলশান ২ নম্বরের ১৩০-এ প্লটে।
রাজউকের মালিকানায় থাকা পার্কটির নাম ছিল ‘গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক। পরে পার্কটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে হস্তান্তর করা হয় সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) স্থাপত্য বিভাগকে দিয়ে পার্কের নকশা করানো হয় এবং তাতে ডিএনসিসির সাড়ে আট কোটি টাকা খরচ হয়।
২০২০ সালে পার্কটির নতুন নাম হয় ‘শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্ক’। পার্কের ৫ দশমিক ৫৪ একর জায়গা অনেক দিন ধরে গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের দখলে। উন্নয়ন-সংস্কারের পর পার্কের বাকি ৩ দশমিক ৩৩ একর অংশ ২০২২ সালের ১৯ ডিসেম্বর সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেন তৎকালীন মেয়র আতিকুল ইসলাম।
পুরো পার্কের ব্যবস্থাপনা-রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ২০২৪ সালের শুরুতে উত্তর সিটি করপোরেশন ও গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের মধ্যে তিন বছরের একটি চুক্তি হয়। তাতে পুরো পার্কের নিয়ন্ত্রণ ক্লাবটির হাতে চলে যায়।
ক্লাবের তত্ত্বাবধানে পার্কে ‘বেআইনিভাবে’ অবকাঠামো বানানোর অভিযোগ ওই বছর মে মাসে প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজন করে স্থানীয় বাসিন্দাসহ বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন।
রাজউক সে সময় বলেছিল, পার্কের দায়িত্ব তৃতীয় কোনো পক্ষকে দিয়ে চুক্তি লঙ্ঘন করেছে উত্তর সিটি করপোরেশন।
গুলশান ইয়ুথ ক্লাব এখন বলছে, তারা রাজউকের সঙ্গেই পরে আলাদা চুক্তি করে পার্কের ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছে।