Published : 24 Apr 2026, 01:50 PM
দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ শিল্প দুর্ঘটনা সাভারের রানা প্লাজা ধসের দুই মামলায় বিচার শেষ হয়নি ১৩ বছরেও। তবে হত্যা মামলার বিচারে সম্প্রতি গতি এসেছে। আর ইমরাত নির্মাণ আইনের মামলায় অভিযোগ গঠনের পর সাক্ষ্যগ্রহণই শুরু হয়নি।
হত্যা মামলায় ৫৯৪ জনকে সাক্ষীর মধ্যে ৯৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। তবে কবে এ মামলার বিচার শেষ হতে পারে, সে বিষয়ে কিছু বলতে পারছেন না রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী।
উচ্চ আদালতের আদেশে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে ছিল ইমারত বিধি না মেনে ভবন তৈরির মামলার কার্যক্রম। স্থগিতাদেশের মেয়াদ পেরিয়ে গেলেও সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে কেউ সাক্ষ্য দিতে আসছে না।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভার বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন ১০ তলা রানা প্লাজা ভবন ধসে পড়ে। ওই ভবনে থাকা কয়েকটি পোশাক কারখানার ৫ হাজারের মতো শ্রমিক তার নিচে চাপা পড়েন।
কয়েকদিনের উদ্ধার তৎপরতায় ১ হাজার ১৩৬ জনের লাশ তুলে আনা হয়। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ২ হাজার ৪৩৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। তার মধ্যে প্রায় দুই হাজার শ্রমিক আহত ও পঙ্গু হন।
এ শিল্প দুর্ঘটনার পাঁচদিন পর ২৯ এপ্রিল ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পথে সোহেল রানাকে যশোরের বেনাপোল থেকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
রানা প্লাজা ধসের পরপর বেশ কয়েকটি মামলা হলেও হত্যা ও ইমারত বিধির মামলা দুটিই মূল মামলা। দুই মামলায় ভবন মালিক সোহেল রানা কারাগারে থাকলেও অধিকাংশ আসামি জামিনে বা পলাতক রয়েছেন।
মামলা দায়েরের দুই বছরের বেশি সময় পর ২০১৫ সালের ১ জুন তদন্ত শেষে দুটি অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার বিজয় কৃষ্ণ কর।
এর একটিতে পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগে ভবন মালিক সোহেল রানা, তার বাবা-মা এবং তৎকালীন সাভার পৌরসভার মেয়র ও কমিশনারসহ ৪১ জনকে আসামি করা হয়।
আর ইমারত বিধি না মেনে রানা প্লাজা নির্মাণের অভিযোগে অপর অভিযোগপত্রে সোহেল রানাসহ ১৮ জনকে আসামি করা হয়।

দুই অভিযোগপত্রে মোট আসামি ছিলেন ৪২ জন। এর মধ্যে সোহেল রানাসহ ১৭ জন দুটি মামলারই আসামি। আসামিদের মধ্যে চারজন ইতোমধ্যে মারা গেছেন।
মামলা সম্পর্কে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পিপি ফয়সাল মাহমুদ বলেন, “শেখ হাসিনার আমলে এই ট্রাজেডিকে পুঁজি করে তারা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করেছে। তাদের সদিচ্ছার অভাবে এই মামলার বিচার এগোয়নি।
“দিনের পর দিন পার হলেও রাষ্ট্রপক্ষ বা সরকারের পক্ষ থেকে মামলা শেষ করতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তবে আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর মামলাটি নিষ্পত্তিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়। হত্যা মামলায় বিচার দ্রুত গতিতে চলছে। আশা করা যায়, এই বছরের মধ্যে হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়া শেষে রায় ঘোষণা হবে।”
আসামি সোহেল রানার আইনজীবী মাসুদ খান খোকন বলেন, “মামলার সাক্ষী তো শেষ হচ্ছে না। রানা ১৩ বছর ধরে বিনা বিচারে কারাগারে রয়েছেন।
“যদি তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে খালাস পান, তাহলে এই ১৩ বছর কে তাকে ফিরিয়ে দেবে?”
তিনি বলেন, “রাষ্ট্রপক্ষ এখন পর্যন্ত সাক্ষ্যপ্রমাণে রানার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো অভিযোগ আনতে পারেননি। মামলার বিচারে দীর্ঘসূত্রিতায় আসামি রানা ন্যায়বিচার পাচ্ছেন না।
“আমরা চাই, এ মামলার বিচার দ্রুত শেষ হোক। ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হোক। সাক্ষ্য প্রমাণে আসামি রানা নির্দোষ প্রমাণিত হলে খালাস পাবেন, নাহলে সাজা হবে—এটায় চিরাচরিত বিষয়।”

হত্যা মামলা দ্রুত শেষের আশা
রানা প্লাজা ধসের পরদিন অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে একটি মামলা করেন সাভার থানার এসআই আলী আশরাফ। ওই মামলায় সোহেল রানাসহ ২১ জনকে আসামি করা হয়।
এ ছাড়া রানা প্লাজা ধসে নিহত হওয়ার ঘটনাকে ‘হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করে আদালতে আরেকটি মামলা করেন পোশাক শ্রমিক জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী শিউলি আক্তার।
আদালতের নির্দেশে একে অবহেলাজনিত মৃত্যু মামলার সঙ্গে একীভূত করে তদন্ত করে সিআইডি। আদালতে দায়ের করা হত্যা মামলার বাদী শিউলি আক্তার পুলিশের মামলার সাক্ষী। এ মামলায় মোট ৫৯৪ জনকে সাক্ষী করা হয়।
২০১৬ সালের ১৮ জুলাই ঢাকার তৎকালীন জেলা ও দায়রা জজ এস এম কুদ্দুস জামান ৪১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে হত্যা মামলার বিচার শুরুর আদেশ দেন।
এ মামলায় অভিযুক্ত ৪১ আসামির মধ্যে বর্তমানে কারাগারে আছেন কেবল ভবন মালিক সোহেল রানা। আসামিদের মধ্যে রানার বাবা আব্দুল খালেক, মা মর্জিনা বেগম, আবু বকর সিদ্দিক ও আসামি আবুল হোসেন জামিনে থাকা অবস্থায় মারা গেছেন।

অভিযোগ গঠনের পরপর সাভার পৌরসভার তৎকালীন মেয়র রেফায়েত উল্লাহ এবং তৎকালীন কাউন্সিলর মোহাম্মদ আলী খানসহ আটজন মামলা বাতিল চেয়ে উচ্চ আদালতে আবেদন করেন। তাদের আবেদনে হাই কোর্ট মামলার কার্যক্রম স্থগিত করে রুল জারি করে।
উচ্চ আদালতের ওই স্থগিতাদেশে আটকে যায় মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া। স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হলে ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ এ এইচ এম হাবিবুর রহমান ভূঁইয়ার আদালতে এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।
বর্তমানে ঢাকার অষ্টম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মুহাম্মদ মুনির হোসাঈনের আদালতে মামলাটি বিচারাধীন। এ মামলায় মোট ৫৯৪ জনকে সাক্ষীর মধ্যে ১৪৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে।
মামলাটি এর আগে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন ছিল। বিচার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর মামলাটি ঢাকার অষ্টম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়। এই আদালতে আসার পর গত পাঁচ মাসে পাঁচ ধার্য দিনে ৫১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে।
সবশেষ সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ৩০ মার্চ ৮ জন সাক্ষ্য দেন। আগামী ৩০ এপ্রিল সাক্ষ্যগ্রহণের পরবর্তী দিন রাখার কথা জানিয়েছেন আদালতের বেঞ্চ সহকারী রিয়াজুল ইসলাম সজিব।
তিনি বলেন, “৫০ জন সাক্ষীকে সাক্ষ্য দিতে অজামিনযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। তাদের সাক্ষ্য দিতে আদালত থেকে সমন পাঠানো হয়েছে।”
আদালতের অতিরিক্ত পিপি ফয়সাল মাহমুদ বলেন, “এখন পর্যন্ত হত্যা মামলাটিতে মোট ৫৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৪৫ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। চলতি মাসের ৩০ তারিখ আবারও সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য আছে। ওইদিন আসা করা যায় গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের অনেকেই সাক্ষ্য দেবেন।”

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “মামলাটিতে ইতোমধ্যে যাদের সাক্ষ্য শেষ হয়েছে, তাদের অধিকাংশ ভুক্তভোগীদের আত্মীয়স্বজন। আবার কিছু আছে পুলিশ কর্মকর্তা।
“আমরা রানা প্লাজার সংশ্লিষ্ট কিছু ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তারদের সাক্ষ্যগ্রহণ নিতে পারলেই আশা করা যায় এবছরের মধ্যে রায় পাব।”
ইমারত বিধির মামলায় ‘মিলছে না সাক্ষী’
রানা প্লাজা ধসের পর ইমারত নির্মাণ আইন না মেনে ভবন নির্মাণ করায় রাজউকের কর্মকর্তা মো. হেলাল উদ্দিন সাভার থানায় মামলা করেন।
২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার বিজয় কৃষ্ণ কর ভবনের মালিক সোহেল রানাসহ ১৮ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
এরপর ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম মোস্তাফিজুর রহমান ২০১৬ সালের ১৪ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন।
অভিযোগ গঠনের ওই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে কয়েকজন আসামি ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করেন। যার মধ্যে নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বজলুস সামাদ এবং সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানের রিভিশন আবেদন নামঞ্জুর হয়।
অন্যদিকে ফ্যান্টম অ্যাপারেলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আমিনুল ইসলামের রিভিশন মঞ্জুর করে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

এছাড়া ২০২১ সালের ৭ নভেম্বর আসামি রেফায়েত উল্লাহার আবেদনে তার ক্ষেত্রে মামলার কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ দেয় হাই কোর্ট। ছয় মাসের সেই স্থগিতাদেশের মেয়াদ অনেক আগে শেষ হয়ে যাওয়ার পর মামলাটি বর্তমানে সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে।
মামলাটি ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম মাহবুবুর রহমানের আদালতে গত ২০ এপ্রিল সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ছিল। তবে ওইদিন কেউ সাক্ষ্য দিতে আদালতে আসেনি। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণের পরবর্তী দিন রাখা হয়েছে।
আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর ইশতিয়াক হোসেন জিপু বলেন, “মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ধার্য রয়েছে। আদালত থেকে আসামিদের সাক্ষ্য দিতে সমন পাঠানো হয়। তবে তারা সাক্ষী দিতে আসছেন না। একারণে সাক্ষ্য গ্রহণ হচ্ছে না।”
মামলার ৪১ আসামির মধ্যে রানা কারাগারে রয়েছে। পলাতক রয়েছে ১১ আসামি। রানার বাবা আব্দুল খালেক, মা মর্জিনা বেগম, আবু বকর সিদ্দিক ও আবুল হাসান মারা গেছেন।
সাভারের সাবেক পৌর মেয়র রেফাত উল্লাহ, সাভার পৌরসভার সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, সাভার পৌরসভার নগর পরিকল্পনাবিদ ফারজানা ইসলাম, ইথার টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান ওরফে আনিসুজ্জামান, শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া, মনোয়ার হোসেন বিপ্লব, শফিকুল ইসলাম জনি, রেজাউল ইসলাম, নান্টু কন্ট্রাকটার, আবদুস সামাদ, অনিল দাস পলাতক রয়েছে।

আর জামিনে রয়েছেন প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, সাইট ইঞ্জিনিয়ার সরোয়ার কামাল, ইমারত পরিদর্শক আওলাদ হোসেন, কাউন্সিলর মোহাম্মাদ আলী খান, উপ-সহকারী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান রাসেল, নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেডের চেয়ারম্যান বজলুস সামাদ আদনান, নিউ ওয়েভ স্টাইপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুর রহমান তাপস, আমিনুল ইসলাম, মো. মধু, মো. শাহ আলম ওরফে মিঠু, সাভার পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কমকর্তা উত্তম কুমার রায়, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের সাবেক উপ-প্রধান পরিদর্শক মো. আব্দুস সামাদ, উপ-প্রধান পরিদর্শক বেলায়েত হোসেন, পরিদর্শক প্রকৌশল মো. ইউসুফ আলী, পরিদর্শক প্রকৌশল মো. মহিদুল ইসলাম, ইথার টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জান্নাতুল ফেরদৌস, আতাউর রহমান, মো. আব্দুস সালাম, বিদ্যুৎ মিয়া ও সৈয়দ শফি।
আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর ইশতিয়াক হোসেন জিপু বলেন, “সাক্ষ্য গ্রহণ করতে আমরা রাষ্ট্রপক্ষ থেকে প্রস্তুত রয়েছি। সাক্ষী হাজির হলে মামলার বিচার দ্রুত শেষ করতে পারব।”