Published : 14 Jan 2026, 10:10 PM
আর্থিক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতির জন্য আলোচিত প্রশান্ত কুমার হালদারের (পি কে হালদার) বিরুদ্ধে ‘ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে ৪৩৪ কোটি টাকা আত্মসাতের’ অভিযোগে আরও ১২টি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক।
এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড থেকে ভুয়া ও নামসর্বস্ব ১২ প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়ে ‘আত্মসাৎ’ করার এসব মামলায় গ্লোবাল ইসলামী (সাবেক এনআরবি গ্লোবাল) ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক পি কে হালদার ছাড়া আরও ৩৪ জনকে আসামি করা হয়েছে।
বুধবার দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আক্তার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, সংস্থার সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা–১ এ ১২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলা মঙ্গলবার দায়ের করা হয়।
মামলাগুলোর মধ্যে দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মশিউর রহমান দুটি মামলার এবং উপসহকারী পরিচালক মো. ইমরান আকন বাকি ১০টি মামলার বাদী হিসেবে রয়েছেন।
অনুসন্ধানের বরাতে দুদক বলেছে, ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ১২টি প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ অনুমোদন করানো হয়। পরে অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তব কোনো ‘ব্যবসায়িক কার্যক্রম ছিল না’। ‘ভুয়া কাগজপত্র’ তৈরি করে ঋণ গ্রহণ করা হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঋণের বিপরীতে কোনো কিস্তি ‘পরিশোধ করা হয়নি’। কোথাও কোথাও মাত্র এক বা দুটি কিস্তি পরিশোধের নজির মিলেছে। এরপরও কোনো আপত্তি ছাড়াই এসব ঋণ বোর্ড সভায় পুনঃতফসিল (রিসিডিউল) করা হয়।
দুদকের তথ্যমতে, প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান কার্যালয়ের যে ঠিকানা নথিতে দেখানো হয়েছিল, সেখানে গিয়ে কোনো ব্যবসার অস্তিত্ব ‘পাওয়া যায়নি’। এমনকি যেসব প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো ছিল সম্পূর্ণ নতুন এবং ঋণ অনুমোদনের সময় তাদের কোনো কার্যকর ‘ব্যবসা পরিচালনার প্রমাণও ছিল না’।
এই ‘অনিয়মের’ মাধ্যমে ১২টি প্রতিষ্ঠানের নামে মোট ৪৩৩ কোটি ৯৬ লাখ ১৮ হাজার ৯ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে। বর্তমানে এসব ঋণের সুদসহ মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫৩১ কোটি ৮ লাখ ৬৯ হাজার ৯ টাকায়।
মামলার বিবরণী অনুযায়ী, যেসব প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ দেখিয়ে অর্থ ‘আত্মসাতের’ অভিযোগ উঠেছে, তার মধ্যে আরিয়ান কেমিক্যালস লিমিটেডের নামে রয়েছে ৫৩ কোটি ৭ লাখ ৩১ হাজার ৮০৫ টাকা। সুদ যোগ হয়ে এই অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৬৭ কোটি ৪৪ লাখ ৩৮ হাজার ৮৫৮ টাকা।
মীম ট্রেডিং কর্পোরেশনের নামে ঋণ দেখানো হয়েছে ৫ কোটি ৮৩ লাখ ৪৪ হাজার টাকা, যা সুদসহ বেড়ে হয়েছে ৬ কোটি ৯১ লাখ ৬২ হাজার ৩০৫ টাকা। কনিকা এন্টারপ্রাইজের নামে প্রায় ৪৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকার ঋণ দেখানো হয়েছে, সুদসহ যার পরিমাণ ৫৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকার বেশি।
বিআর ইন্টারন্যাশনালের নামে ৫২ কোটি ৫৫ লাখ টাকার ঋণ দেখানো হয়েছে, যা সুদসহ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। দ্রিনান অ্যাপারেলস লিমিটেডের নামে প্রায় ৪০ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ঋণ দেখানো হয়েছে, সুদসহ যার পরিমাণ ৫২ কোটি ৩৪ লাখ টাকার বেশি। জি অ্যান্ড জি এন্টারপ্রাইজের নামে দেখানো ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, সুদসহ যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৭ কোটি ৫২ লাখ টাকার বেশি।
উইনটেল কর্পোরেশন লিমিটেডের নামে প্রায় ৪০ কোটি ২০ লাখ টাকা ঋণ দেখানো হয়েছে, সুদ যোগ হয়ে যা হয়েছে ৫৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আনান কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের নামে ঋণ দেখানো হয়েছে ৩৬ কোটি ৫ লাখ টাকা, সুদসহ যার পরিমাণ প্রায় ৪৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এমএসটি ফার্মা অ্যান্ড হেলথ কেয়ার লিমিটেডের নামে ২৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকার ঋণ দেখানো হয়েছে, সুদসহ যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।
নিউটেক এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের নামে ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা ঋণ দেখানো হয়েছে, যা সুদসহ বেড়ে হয়েছে ৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকার বেশি। আমান টেক্স ইউনিট-২ লিমিটেডের নামে ঋণ দেখানো হয়েছে ৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, সুদসহ যার পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। আর মেসার্স সানসাইন সার্ভিসেসের নামে ২১ কোটি ৯৫ লাখ টাকার ঋণ দেখানো হয়েছে, সুদসহ যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।
মামলায় পিকে হালদারের পাশাপাশি এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও একাধিক সাবেক পরিচালককে আসামি করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঋণগ্রহীতা হিসেবে দেখানো প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও আসামির তালিকায় রয়েছেন।
তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তারা হলেন, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান মো. ছিদ্দিকুর রহমান, মাহফুজা রহমান বেবী, মোহাম্মদ আব্দুল হাফিজ ও আব্দুল মোতালিব আহমেদ এবং সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাসেল শাহরিয়ার ও মো. মফিজ উদ্দিন চৌধুরী।
প্রতিষ্ঠানটির সাবেক পরিচালক হিসেবে আসামি করা হয়েছে মো. জাহাঙ্গীর আলম, মো. নুরুল হক গাজী, মো. আবুল শাহজাহান, অঞ্জন কুমার রায়, কাজী মাহজাবিন মমতাজ, সোমা ঘোষ, মো. মোস্তাইন বিল্লাহ, অরুন কুমার কুন্ডু, উদ্ধব মল্লিক, মো. আতাহারুল ইসলাম, প্রদীপ কুমার নন্দী, বীরেন্দ্র কুমার সোম, অনিতা কর, মো. মোস্তফা ও মোস্তফা আমিনুর রশীদকে।
একই সঙ্গে আনান কেমিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের পরিচালক হিসেবে উজ্জল কুমার নন্দীর নামও এজাহারে রয়েছে।
এছাড়া আরিয়ান কেমিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওমর শরীফ, নিউটেক এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাসু দেব ব্যানার্জী, মেসার্স সানসাইন সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাসিন বিন তানজীর, মীম ট্রেডিং কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওমর ফারুক, আমান টেক্স ইউনিট–২-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম, বিআর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক উৎপল মজুমদারের নাম রয়েছে আসামির তালিকায়।
এছাড়া উইনটেন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুকুমার সাহা, কনিকা এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রামপ্রসাদ রায়, জি অ্যান্ড জি এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোপাল চন্দ্র গাঙ্গুলী, জেডএ ট্রেডিং ও দ্রিনান অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু রাজীব মারুফ, এমএসটি ফার্মা অ্যান্ড হেলথ কেয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অমল চন্দ্র দাস এবং আনান কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রিতীশ কুমার হালদারকেও আসামি করা হয়েছে।
পি কে হালদার নামে-বেনামে পিপলস লিজিংসহ নানা আর্থিক প্রতিষ্ঠান খুলে হাজার কোটি টাকা লোপাট করে বিদেশে পালিয়ে যান বলে ২০২০ সালের শুরুতে খবর আসে।
এরপর দুদক তদন্তে নেমে পি কে হালদার ও তার সহযোগীদের ৩৪টি মামলা করে। ২০২২ সালের মে মাসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তাকে গ্রেপ্তারের খবর আসে। পরের বছর ৮ অক্টোবর প্রথম মামলায় তার ২২ বছরের কারাদণ্ডের রায় আসে।