Published : 08 Dec 2025, 07:21 PM
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য অধিগ্রহণ করা জমিতে বানানো ফ্ল্যাট ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ করে ‘নিজেদের জন্য’ বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগে সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং ১৩ জন সাবেক সচিবের বিরুদ্ধে মামলা করতে যাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সোমবার দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন সাংবাদিকদের এ মামলা অনুমোদনের তথ্য দেন।
রাজধানীর উত্তরার দিয়া বাড়িতে নির্মাণ করা এসব ফ্ল্যাটের বিষয়ে দুদক ‘এনফোর্সমেন্ট’ অভিযান চালিয়ে ও অনুসন্ধান করে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা বলেছে।
সংস্থার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, অনুসন্ধান দলের প্রতিবেদন অনুমোদন করে সম্প্রতি কমিশন যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে তাদের নামে মামলা করার সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে।
ওবায়দুল কাদের ছাড়াও যাদেরকে এ মামলায় আসামি করা হতে পারে তারা হলেন- সেতু বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সাবেক সচিব মো. নজরুল ইসলাম, জননিরাপত্তা বিভাগের সাবেক সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দীন, সাবেক মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস, সাবেক ভূমি সচিব মো. আবদুল জলিল, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব জাফর আহমেদ খান, সাবেক অর্থ সচিব ও সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী, সাবেক আইন সচিব মোহাম্মদ শহিদুল হক, পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সদস্য (সচিব) জুয়েনা আজিজ, সাবেক রেল সচিব মো. মোফাজ্জল হোসেন, ইআরডির সাবেক সচিব কাজী শফিকুল আজম, সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব আখতার হোসেন ভূঁইয়া এবং এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ও আইআরডির সাবেক সচিব আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম।
দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, কমিশনের অনুমোদনের পর তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭–এর ৫(২) ধারায় অভিযোগ এনে মামলা করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সংবাদপত্রে এ বিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশের পর এ নিয়ে অভিযান চালায় দুদক। অভিযানে প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার পর অনুসন্ধানে নামে সংস্থাটি।
অনুসন্ধান প্রতিবেদনে দুদক বলছে, তারা ‘অসৎ উদ্দেশ্যে আর্থিকভাবে লাভবান’ হওয়ার আশায় ‘ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের’ মাধ্যমে নিয়মবহির্ভূতভাবে এসব ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিয়েছেন।
বিমানবন্দরের কাছে কাওলা থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালীতে গিয়ে শেষ হবে প্রায় ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। ২০১০ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের আংশিক চালু হয়েছে। প্রকল্পের কাজ এখনও চলছে।
এ প্রকল্পে অধিগ্রহণ করা জমির মালিকদের ‘পুনর্বাসনের’ জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণ করার আলাদা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানের বরাতে সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের ১০৬ ও ১০৭তম পর্ষদ সভায় উপস্থিত সদস্যরা ‘বেআইনিভাবে’ প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেন। ওই সভায় ‘বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও প্রকল্পের স্থায়ী কর্মচারীদের জন্য নির্মিতব্য ফ্ল্যাট দীর্ঘমেয়াদি লিজ প্রদান সংক্রান্ত নীতিমালা–২০১৮’ অনুমোদন করা হয়।
“অথচ ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পিপিপি প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য ৪০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল এবং গেজেটেও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনকে অধিগ্রহণের উদ্দেশ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু অধিগ্রহণ করা সেই জমি গেজেটের উদ্দেশ্য উপেক্ষা করে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ৯৯ বছরের ইজারায় স্থায়ী আবাসন নির্মাণে ব্যবহার করা হয়, যা আইনবহির্ভূত।”
প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন ২০১৭–এর ১৯(১) ধারায় ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও সেতু কর্তৃপক্ষ কোনো অনুমোদন নেয়নি।
“সেতু কর্তৃপক্ষের নিজস্ব আইনেও এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণের কোনো ক্ষমতা নেই, যা দুদকের মতে একান্ত ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার।”
এছাড়া সরকারি আইন বা নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে গেজেট প্রকাশ বাধ্যতামূলক হলেও ‘দীর্ঘমেয়াদি লিজ নীতিমালা–২০১৮’ গেজেটে প্রকাশ না করেই অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করা হয়, যা আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
‘ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জমিতে সচিবদের সস্তায় ফ্ল্যাট’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রথম আলেঅ গত ১৪ জুন প্রকাশ করে। এরপর দুদক এ বিষয়ে ‘এনফোর্সমেন্ট’ অভিযান চালিয়ে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা জানায়।