Published : 22 May 2026, 12:43 AM
প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর বর্জ্য দ্রুত অপসারণে আগাম প্রস্তুতি নিয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন।
গত বছর কোরবানি ঈদের সময় পশুর বর্জ্য ১২ ঘণ্টার মধ্যে অপসারণ করা হলেও এবার সে সময় ৮ ঘণ্টায় নামিয়ে আনতে চায় তারা। এ লক্ষ্যে এরইমধ্যে প্রস্তুতি ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
উভয় সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তারা জানান, পরিচ্ছন্ন নগরী নিশ্চিত করতে দুই সিটির পক্ষ থেকে হাজার হাজার পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও বিপুল যান-যন্ত্রপাতি মাঠে নামানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঈদের অন্তত দুদিন আগে এ বিষয়ে ‘সুস্পষ্ট পরিকল্পনা’ তুলে ধরা হবে।
আগামী ২৮ মে উদযাপিত হতে যাওয়া ঈদুল আজহায় গত কয়েক বছরের মতো এবারও ঢাকা মহানগরে গড়ে প্রায় ৭ লাখের মতো পশু কোরবানি করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাধারণত এ সময়ে অর্ধ লাখ টনের মতো বর্জ্য হয়ে থাকে মহানগরে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশ (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তথ্য বরছে, ২০২৩ সালে কোরবানির তিন দিনে নগরীতে ৪১ হাজার টন, ২০২৪ সালে ৩৯ হাজার টনের বেশি ও গেল বছর তিন দিনে ৫২ হাজার টন পশু বর্জ্য অপসারণ করা হয়।
এবারও বর্জ্যের পরিমাণ বাড়বে ধরেই আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
ডিএসসিসি কর্মকর্তারা বলছেন, ঈদের প্রথম দিনের মূল বর্জ্য ৮ ঘণ্টার মধ্যে অপসারণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
একই লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করে ডিএনসিসি কর্মকর্তারা বলেছেন, গত বছরের সফলতার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সমপরিমাণ বর্জ্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে অপসারণের প্রস্তুতি শেষ করা হয়েছে।
ডিএসসিসি প্রশাসক আব্দুস সালাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ঈদুল আজহায় কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সাধারণ সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত জনবল ও যানবাহন মোতায়েন করা হবে। ঈদের দিন দুপুর ১২টা থেকে পুরোদমে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম শুরু করে পরবর্তী আট ঘণ্টার মধ্যে প্রথম দিনের প্রধান বর্জ্য অপসারণ শেষ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
“এ জন্য ঈদের সময় স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণ যানবাহন এবং তিনগুণ শ্রমিক মাঠে কাজ করবে। যা থাকে তার দ্বিগুণ গাড়ি থাকবে, আর শ্রমিক থাকবে তিনগুণ। এবার লক্ষাধিকের বেশি পশু জবাই হবে ধরে নিয়ে এবং গতবারের তুলনায় বেশি বর্জ্য হবে ধরে নিয়েই আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি।”
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিশদ বিবরণ দিয়ে ডিএসসিসি প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মাহাবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, “তিন দিনের বিশেষ অভিযানে বর্জ্য অপসারণে প্রায় ২ হাজার ৮০টি যানবাহন মাঠে নামানো হবে। এর মধ্যে ড্রাম ট্রাক, কম্প্যাক্টর, কন্টেইনার ক্যারিয়ার, পেলোডার, টায়ারড ডোজারসহ বিভিন্ন ধরনের আধুনিক যান-যন্ত্রপাতি থাকবে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে কাজের তদারকির জন্য আলাদা গাড়ির ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে।
“পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে সর্বমোট ১২ হাজার ৮৫৩ জন জনবল নিয়োজিত থাকবেন। এর মধ্যে সিটি করপোরেশনের নিজস্ব কর্মী রয়েছেন সাড়ে ৬ হাজারের বেশি। বাকি অংশ বেসরকারি বর্জ্য সংগ্রহকারী (পিসিএসপি ও অন্যান্য ভেন্ডর) এবং সহযোগী জনবল থেকে যুক্ত করা হবে।”
ডিএসসিসি এলাকার ১১টি কোরবানির পশুর হাটকে কেন্দ্র করে বিশেষ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও তথ্য দেন তিনি।
প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা বলছেন, “পশুর রক্ত ও বর্জ্য পরিষ্কার করতে ডিএসসিসির পক্ষ থেকে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগ, ৪৫ টন ব্লিচিং পাউডার এবং ২০৭ গ্যালন স্যাভলন কোরবানিদাতাদের সরবরাহ করা হচ্ছে। বেশিরভাগ মানুষ বাসার নিচে বা রাস্তায় কোরবানি দেন। তাদের নির্দিষ্ট স্থানে আনার চেষ্টা হিসেবে প্রতিটি ওয়ার্ডে ৪ থেকে ৫টি সুনির্দিষ্ট কোরবানির স্থান নির্ধারণ, অস্থায়ী শেড ও পরিচ্ছন্নতা সামগ্রী দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
“সার্বিক কার্যক্রমের নজরদারির জন্য প্রতিটি হাটে আলাদা কমিটি, জোনভিত্তিক ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং কন্ট্রোল রুম থাকবে। এছাড়া কেন্দ্রীয়ভাবে নগর ভবন থেকে পুরো বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম সরাসরি তদারকি করা হবে।”

এদিকে ডিএনসিসিও বিগত বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে তাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্য বিভাগের কার্যক্রম সাজিয়েছে। করপোরেশনের জনসংযোগ বিভাগের তথ্যে বলা হয়, ২০২৫ সালের ঈদুল আজহায় তিন দিনে মোট ২০ হাজার ৮৮৯ টন বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ঈদের দিন ১০ হাজার ৬১৬ টন, দ্বিতীয় দিন ৭ হাজার ৩৫৩ টন এবং তৃতীয় দিন ২ হাজার ৯২২ টন বর্জ্য অপসারণ হয়। এবারও সমপরিমাণ বর্জ্য হতে পারে ধরে দ্রুত তা অপসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এরইমধ্যে ডিএনসিসি এলাকায় বর্জ্য সংরক্ষণের জন্য নাগরিকদের মধ্যে ১৬ লাখ ৩০ হাজার পিস পলিব্যাগ বিতরণ করা হচ্ছে। এছাড়া পশুর রক্ত অপসারণের পর জীবাণুনাশক হিসেবে ছিটানোর জন্য ২৫ কেজি ওজনের ৩৬০০ বস্তা ব্লিচিং পাউডার বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
দ্রুত বর্জ্য সরাতে প্রস্তুত রাখা হয়েছে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ট্রাক, পে-লোডার, ডাম্পার ও পানির গাড়িসহ অন্যান্য যান-যন্ত্রপাতি। এর মধ্যে নিজস্ব পরিবহনের সংখ্যা ২৬১টি এবং ভাড়ায় সংগৃহীত ৪০৫টি যানবাহন রয়েছে। এছাড়া বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ২৬টি ওয়ার্ডে আরও ৮৬টি পরিবহন নিয়োজিত থাকবে।
ডিএনসিসি কর্মকর্তারা বলছেন, ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ ৪টি প্রধান কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
১. ৫৪টি ওয়ার্ডের জন্য ১০০০ জন মাংস প্রস্তুতকারী নির্বাচন করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
২. মসজিদের ইমামদের মাধ্যমে খুতবায় সচেতনতামূলক আলোচনা, জনসচেতনতামূলক র্যালি, টেলিভিশন, রেডিও, পত্রিকা এবং মাইকিংয়ের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার কার্যক্রম চালানো।
৩. কোরবানির তিন দিন আগে থেকে ১০টি জোনে ১০টি মনিটরিং টিম গঠন ও কন্ট্রোল রুম স্থাপন।
৪. কোরবানির একদিন আগে পশু জবাইয়ের স্থান ও ল্যান্ডফিল সম্পূর্ণ প্রস্তুত রাখা।
পশুর হাটগুলো ইজারার শর্ত প্রতিপালন করছে কিনা তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য বিশেষ তদারকি দল কাজ করবে বলেও তথ্য দিয়েছে ডিএনসিসি।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি কোরবানির পশুর হাট ও কোরবানিদাতাদের সহায়তার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে ডিএনসিসির স্বাস্থ্য বিভাগ। পশুর হাট তদারকিতে ভেটেরিনারি শাখার ১০ জন কর্মকর্তা, ২ জন জবাইখানা পরিদর্শক এবং ১৮ জন জবাইকারী, সিলম্যান ও ক্লিনার সার্বক্ষণিকভাবে দায়িত্ব পালন করবেন।
এছাড়া প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সহায়তায় প্রতিটি অস্থায়ী হাটে একটি করে এবং গাবতলী স্থায়ী পশুর হাটে দুটি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ায় নিয়োজিত থাকবে।
নগরবাসীকে কোরবানি সংক্রান্ত বিষয়ে ধর্মীয় ও কারিগরি সহযোগিতা দিতে ১০টি অঞ্চলের প্রতিটি থেকে ১০০ জন করে মোট এক হাজার ইমাম ও কসাইকে আঞ্চলিক কার্যালয় বা স্থানীয় কমিউনিটি সেন্টারে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমডোর মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রশাসক আমাদের গাইডলাইন দিয়েছেন। সেই অনুযায়ী আমরা সব কাজ সফলভাবে শেষ করতে পারবো বলে আশা করছি।”