Published : 11 Jan 2018, 05:10 PM
তাবলিগের দুই পক্ষকে নিয়ে বসেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
ইজতেমায় ‘যাচ্ছেন না’ মাওলানা সাদ, বৈঠকে বসছে তাবলিগের দুই পক্ষ
তাবলিগ কর্মীদের অন্তর্দ্বন্দ্বের বিক্ষোভে যানজটের ভোগান্তি
তাকে নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়া এই ইসলামিক সংঘের দুই পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার দুই ঘণ্টা বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্তের কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল।
তিনি বলেন, “উনি ইজতেমায় যাবেন না। সুবিধাজনক সময়ে তিনি বাংলাদেশ থেকে চলে যাবেন। দুপক্ষই এ সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে।”
বুধবার দুপুরে তাবলিগ জামাতের এক পক্ষের বিক্ষোভের মধ্যে ঢাকা পৌঁছানোর পর থেকে মাওলানা সাদ আছেন বাংলাদেশে তাবলিগের কার্যক্রমের মূল কেন্দ্র ঢাকার কাকরাইল মসজিদে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাদ যে কদিন বাংলাদেশে থাকবেন, কাকরাইল মসজিদেই থাকবেন বলে বৈঠকে ঠিক করা হয়েছে।
বাংলাদেশ তাবলিগের ১১ সদস্যের শুরা কমিটির দুজন বাদে সবাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। পাঁচজন উপদেষ্টার মধ্যে মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ ছাড়া বাকি চারজনও অংশ নেন বৈঠকে।
দীর্ঘ আলোচনার পর মাওলানা সাদের বিষয়ে ‘সর্বসম্মতভাবে’ ওই সিদ্ধান্ত হয় বলে জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, “আমরা সবাই জানি, বাংলাদেশ তাবলিগ জামাতের জন্য খ্যাত। সারা বিশ্ব হজের পরে এই জায়াগাটিতে সবাই একত্রিত হন। এই জামাত নিয়ে… আপনারা জানেন যে ভারতেও নিজাম উদ্দীন মারকাজ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল এবং এই বিতর্ক ধীরে ধীরে আমাদের দেশেও প্রবেশ করে।”

হেফাজতের দুই পক্ষকে নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক হয় মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে
ভারতের ইসলামি পণ্ডিত মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভি ১৯২০ এর দশকে তাবলিগ জামাত নামের এই সংস্কারবাদি আন্দোলনের সূচনা করেন। স্বেচ্ছাসেবামূলক এ আন্দালনের উদ্দেশ্য ইসলামের মৌলিক মূল্যবোধের প্রচার। বিতর্ক থেকে দূরে রাখতে এ সংগঠনকে রাজনীতি ও ফিকহ নিয়ে আলোচনা হয় না।
ভারতীয় উপমহাদেশের সুন্নি মতাবলম্বী মুসলমানদের বৃহত্তম এই ধর্মীয় সংঘের মূল কেন্দ্র বা মারকাজ দিল্লিতে। মাওলানা সাদ তাবলিগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা ইলিয়াসেরেই নাতি।
মাওলানা ইলিয়াছের মৃত্যুর পর তার ছেলে মাওলানা মোহাম্মদ ইউসুফ এবং তারপর মাওলানা ইনামুল হাসান তাবলিগ জামাতের আমিরের দায়িত্ব পালন করেন। মাওলানা ইনামুলের মৃত্যুর পর একক আমিরের বদলে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার দেওয়া হয় একটি শুরা কমিটির ওপর।
এই শুরা কমিটিতে সদস্য হিসেবে ছিলেন পাকিস্তান তাবলিগ জামাতের আমির হাজি আদুল ওয়াহহাব, মাওলানা ইনামুলের ছেলে মাওলানা জুবায়েরুল হাসান এবং মাওলানা ইউসুফের ছেলে মাওলানা সাদ।
মাওলানা জুবায়েরের মৃত্যুর পর মাওলানা সাদ আমিরের দায়িত্ব নেন এবং একক নেতৃত্বের নিয়ম ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু মাওলানা জুবায়েরের ছেলে মাওলানা জুহাইরুল হাসান তখন নেতৃত্বের দাবি নিয়ে সামনে আসেন এবং তার সমর্থকরা নতুন করে শুরা কমিটি গঠনের দাবি জানান। কিন্তু সাদ তা প্রত্যাখ্যান করলে বিরোধ বড় আকার ধারণ করে।
মাওলানা সাদ তাবলিগ জামাতের নিজামুদ্দিন মারকাযকে মক্কা-মদিনার পর ইসলামের সবচেয়ে বড় কর্তৃপক্ষ দাবি করে বক্তব্য দিলে দেওবন্দ মাদ্রাসার ইসলামি পণ্ডিতদের সঙ্গেও তার বিরোধ স্পষ্ট হয়। ইমামতি করে বা কোরআন শিখিয়ে বেতন নেওয়ারও সাদ সমালোচনা করেন, যা বিভক্তিকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
মাওলানা সাদের নেতৃত্ব নিয়ে বাংলাদেশেও তাবলিগ জামাতের বিভক্তি স্পষ্ট হয় গতবছর। বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের একটি অংশ টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমায় সাদের অংশগ্রহণের বিরোধিতার সোচ্চার হয়। কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামও সাদের আসার বিপক্ষে অবস্থান নেয়।

মাওলানা মোহাম্মদ সাদ কান্ধলভি
সন্ধ্যায় সাদবিরোধী একদল তাবলিগকর্মী কাকরাইল মসজিদের সামনে জড়ো হলে সেখান থেকে তাদের সরিয়ে দেয় পুলিশ। ওই মসজিদ ঘিরে অবস্থান নেয় পুলিশ, সকালে নিরাপত্তা আরও বাড়ানো হয়।
পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে ইংগিত দেওয়া হয়, মাওলানা সাদ শুক্রবার সকালে টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমার প্রথম ভাগে যোগ দিতে যাচ্ছেন না। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল মহাখালিতে এক অনুষ্ঠানে বলেন, মাওলানা সাদ বিশ্ব ইজতেমায় অংশগ্রহণ করবেন কি না, তা নির্ভর করবে তাবলিগ জামায়াতের মুরুব্বিদের সিদ্ধান্তের ওপর। সরকার শুধু আইন শৃঙ্খলার দিকটি দেখবে।
দ্বন্দ্ব নিরসনে তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষকে নিয়ে বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৩টা পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বৈঠকে বসেন মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল।
বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের শুরা সদস্য মাওলানা সৈয়দ ওয়াফিক, মাওলানা মো. নাসিম ও ইউনুস সিকদার এ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, যারা মাওলানা মোহাম্মদ সাদের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
এছাড়া তাবলীগ জামাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্তত ৪০ জন ‘আলেম’, পুলিশ মহাপরিদর্শক, র্যাব মহাপরিচালক, ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনারসহ পুলিশের বিভিন্ন শাখার ঊর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন এ আলোচনায়।
বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশ সরকার কিন্তু তাবলিগ জামাতে হস্তক্ষেপ করেনি, আগামীতেও করবে না। আমরা চাইছিলাম সবাই মিলে যেন ইজতেমা সুন্দরভাবে শেষ করা যায়। আগেও তাই হয়েছে, আগামীতেও হবে।”
বৈঠকে ‘সর্বসম্মতিক্রমে’ যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা সবাই মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলেও জানান কামাল।

কাকরাইল মসজিদের সামনে সাদবিরোধীদের বিক্ষোভ ঠেকাতে পুলিশের অবস্থান
ওই উপদেষ্টা কমিটির সদস্য কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড- বেফাকের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আল্লামা আব্দুল কুদ্দুছ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তাদের ওই কমিটির পাঁচ সদস্যই মনে করেন, মাওলানা সাদের ‘চলে যাওয়াই উচিৎ’।
এই কমিটির অপর সদস্যরা হলেন-মালিবাগ শারাইয়া মাদ্রাসার শাইখুল হাদিস আল্লামা আশরাফ আলী, যাত্রাবাড়ী জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া মাদ্রাসার মুহতামিম আল্লামা মাহমুদুল হাসান, শোলাকিয়া ঈদগাহের খতিব আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ ও মুফতি মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল মালেক।
মাওলানা সাদের বিরোধিতার কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এক কথায় বললে উনি কোরাআনের অপব্যাখ্যা দিচ্ছেন, বিষোদগার ছড়াচ্ছেন।”
মাওলানা সাদ গত কয়েক বছরও বাংলাদেশে ইজেতেমায় যোগ দিয়েছেন এবং ইমামতি করেছেন। তখন কেন আপত্তি তোলা হয়নি- এমন প্রশ্ন করা হয়েছিল মুফতি ফয়জুল্লাহকে।
জবাবে তিনি বলেন, “আগে থেকেই এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তাকে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে যাতে ভুল ব্যাখ্যা না করেন। দেওবন্দ মাদ্রাসা থেকেও তাকে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে। কিন্তু উনি তার অবস্থানে অনড়।”
শান্তি ও সম্প্রীতির বাণী প্রচারের জন্য সুপরিচিত তাবলিগ জামাতের কর্মীদের অনেকটা নজিরবিহীনভাবে রাজপথে বিক্ষোভে নামার পেছনে হেফাজতে ইসলামের ইন্ধন আছে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ বলেন, “ওলামায়ে কেরাম, যারা ইসলামী ধ্যান ধারণা ধারণ করেন- তারাই আন্দোলন করেছেন। এর সাথে হেফাজতের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।”