Published : 15 Mar 2026, 11:14 PM
রাত তখন পৌনে ৯টা। বইমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মুক্তধারার স্টলে সাজিয়ে রাখা বই কার্টুনে রাখছিলেন কর্মীরা। ১৮ দিন ধরে যে জায়গাটি হয়ে উঠেছিল খুব চেনা, সেই জায়গাটি এবার ছেড়ে যাওয়ার পালা।
মুক্তধারার বিপণন কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ সেন চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দেখতে দেখতে তো মেলা শেষ হয়ে গেল। এবার মেলা ১৮ দিনের, লোকজনও কম এসেছে। তবে যারা এসেছেন, তারা আনন্দ নিয়ে মেলায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। স্বস্তিতে পছন্দের বই কিনেছেন।”
মুক্তধারার হাত ধরেই ১৯৭২ সালে সূচনা হয়েছিল এই মেলার। আর চলতি বছরের যে আয়োজন শুরু হয়েছিল ২৬ ফেব্রুয়ারি, তার পর্দা নামল রোববার রাতে।
এদিন মেলা শুরু হয় দুপুর ২টায় এবং চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। ইফতারের মেলায় আসেন অনেকে।
আবৃত্তিশিল্পী জহির রায়হান বলেন, “এবার মেলায় আসা হয়নি। সমাপনী দিনের শেষবেলায় আসা হল।”
বাতিঘরের স্টলের সামনে দেখা যায়, অনেক লোকের জটলা। তাদের কেউ কেউ বই কিনছেন।

কবি কাজী বর্ণাঢ্য এসেছিলেন সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা থেকে। তিনি বলেন, “এবার দুই দিন মেলায় এসেছি। বইমেলা তো আমাদের কত কত আনন্দ মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে আছে।”
এবারের বইমেলায় অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছিল কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটার। রাত সাড়ে ৮টায় ছিল তাদের শেষ পুতুলনাট্যের প্রদর্শনী। সেখানে দেখা যায়, নানা বয়সি মানুষের ভিড়।
সমাপনী দিনে মেলার তথ্যকেন্দ্রে নতুন বই জমা পড়েছে ২৩৬টি। সব মিলিয়ে এবারের মেলায় নতুন বই এসেছে ২ হাজার ৭টি।
বিকাল সাড়ে ৩টায় সমাপনী অনুষ্ঠানে দেওয়া স্বাগত বক্তব্যে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, “সকলের আন্তরিক সহযোগিতায় অমর একুশে বইমেলা
২০২৬ সফল করা সম্ভব হয়েছে। লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের সামষ্টিক উদযাপন আগামীর বইমেলা নতুনরূপে প্রত্যাশা জাগাবে আমরা এই আশাবাদ ব্যক্ত করতে পারি।”
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, “আমরা এমন একটি অন্তভুর্ক্তিমূলক ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ চাই যেখানে বৈচিত্র্যের মাঝেও ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে। একটি উন্নত জাতি গঠনের জন্য বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। এজন্য আমাদের সন্তানদের আবার বইয়ের জগতে নিয়ে যেতে হবে।
“সারাদেশে জেলা ও উপজেলায় পাঠাগার ও জ্ঞান প্রসারের জন্য আমাদের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।”
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, “যে বই পাঠককে মনের ভেতর থেকে জাগিয়ে তোলে, ন্যায়-অন্যায় বোধ জাগ্রত করে এবং রাষ্ট্র গঠনে ও উন্নত চিন্তা-চেতনা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে, সেটিই মানসম্পন্ন বই।
“একটি জাতির কল্যাণ ও ভবিষ্যৎ পাঠাভ্যাস দ্বারা নির্ণিত হয়। কাজেই পাঠকদের হাতে ভালো ও মানসম্পন্ন বই তুলে দেওয়ার জন্য আমাদের কাজ করতে হবে।”

বিক্রি আনুমানিক ১৭ কোটি টাকা
সমাপনী অনুষ্ঠানে মেলার প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’ এর সদস্য সচিব ড. মো. সেলিম রেজা।
সদস্য সচিবের প্রতিবেদনে বলা হয়, “বইমেলায় বাংলা একাডেমিসহ সকল প্রতিষ্ঠানের বই ২৫ শতাংশ কমিশনে বিক্রি হয়েছে।”
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বাংলা একাডেমি ১৪ মার্চ পর্যন্ত ১৭ দিনে ১৭,০৪,৬২৯ (১৭ লাখ ৪ হাজার ৬২৯) টাকার বই বিক্রি করেছে। বইমেলায় অংশগ্রহণকারী সর্বমোট ৫৮৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৪টি মিডিয়া ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান
৫৭০টি।
“২৬৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ১৭ দিনে তাদের মোট বিক্রির পরিমাণ ৮ কোটি টাকা। সেক্ষেত্রে গড় হিসাবে ৫৭০টি প্রতিষ্ঠানের বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৭ কোটি টাকা।”
গত বছর মাসব্যাপী বইমেলায় অংশ নেওয়া অর্ধেক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বিক্রির তথ্য দিয়ে মেলা কমিটি জানিয়েছিল, ২০ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রি মিলিয়ে আনুমানিক ৪০ কোটি টাকার বই বিক্রির তথ্য এক বিজ্ঞপ্তিতে তুলে ধরেছিল মেলা পরিচালনা কমিটি।

গত বছর বইমেলায় মোট ৭২১টি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে ১৮টি প্রতিষ্ঠান মিডিয়া ও স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক ছিল। বাকি ৭০৩টি ছিল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান।
সেই হিসাবে এবারের মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও কমেছে। ২৮ দিনের মেলা এবার ১৮ দিন হয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালে মেলায় বিক্রি হয়েছিল ৬০ কোটি টাকার বই। ২০২৩ সালে বিক্রি হয়েছিল ৪৭ কোটি টাকার বই।
এবার বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৫৮৪টি প্রতিষ্ঠানকে ১০৬৮ ইউনিটের স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানকে প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
এক ইউনিটের ২৮৭টি, দুই ইউনিটের ২২৫টি, তিন ইউনিটের ৪৬টি, চার ইউনিটের ২৭টি, পাঁচ ইউনিটের ২৯টি এবং ৬ ইউনিটের তিনটি স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়।

শিশুদের জন্য ৬৩টি প্রতিষ্ঠানকে ১১১টি ইউনিটের স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়।
লিটল ম্যাগাজিন চত্বরের অবস্থান ছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চের কাছে। এই চত্বরে ৯০টি লিটলম্যাগকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়।
বইমেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি পরিচালিত চিত্তরঞ্জন সাহা, মুনীর চৌধুরী, রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই, সরদার জয়েনউদ্দীন এবং শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার দেওয়া হয়।