Published : 18 Feb 2026, 04:51 PM
ইন্টারনেট বন্ধ রেখে হত্যার চিত্র আড়াল করার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়েছে।
বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে দুই সদস্যের বেঞ্চে প্রধান কৌঁসুলির সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিচার কাজ শুরু হয়। বেঞ্চের অপর বিচারক ছিলেন মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি শুনানির পরবর্তী দিন দিয়েছেন বিচারক।
প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, “এই মামলায় তারা দুই জন আসামির বিরুদ্ধে যে অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন এবং যে প্রমাণাদি উপস্থাপন করবেন তা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করবে, এই হত্যাযজ্ঞ ছিল পূর্বপরিকল্পিত, পদ্ধতিগত, লক্ষ্যভিত্তিক এবং ব্যাপক মাত্রায় সংঘটিত।
“এটি ছিল রাষ্ট্রযন্ত্র, রাজনৈতিক দলীয় ক্যাডার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনিক কাঠামোর সমন্বয়ে পরিচালিত একটি অপরাধী নেটওয়ার্কের ফল। এই অপরাধের লক্ষ্য ছিল একটাই, সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধ করা, ভয়ের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা এবং ন্যায়সঙ্গত দাবি উত্থাপনকারী ছাত্র-জনতাকে নির্মূল করা। এই অপরাধ কেবল কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়নি; এটি একটি জাতির স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ ও অস্তিত্বের ওপর সরাসরি আঘাত।”
তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের বরাতে তাজুল বলেন, আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আসামীদ্বয়সহ সরকারের শীর্ষ মহল অনলাইনে ও অফলাইনে ধারাবাহিক বৈঠকের মাধ্যমে আন্দোলন দমনের নীলনকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করেন।
“যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের, সরাসরি গুলি চালানোর, 'শুট অ্যাট সাইট' নির্দেশনার, ইন্টারনেট বন্ধ করে যোগাগোদ বিচ্ছিন্ন করা, হেলিকপ্টার থেকে গুলি বর্ষণের এবং গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের নির্মূল করার।”
তিনি বলেন, “২০২৪ সালের ১৪ জুলাই সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রকাশ্য উসকানিমূলক বক্তব্য, যেখানে আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে আখ্যায়িত করা হয়, এই সহিংসতার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এর পরপরই শান্তিপূর্ণ ছাত্রসমাবেশের বিরুদ্ধে পুলিশি সহায়তায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের উপর হামলা চালায়। ১৫ ও ১৬ জুলাই থেকে শুরু করে ১৯ জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে যে হত্যাযজ্ঞ চলে, রংপুরে আবু সাঈদ, ঢাকায়, চট্টগ্রামে, মিরপুর, যাত্রাবাড়ি, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, রামপুরা, বাড্ডা, খিলগাও, হাতিরঝিল, গুলশানসহ একের পর এক স্থানে গুলি করে ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হয়।
“শেখ হাসিনা, সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয় এবং জুনাইদ আহমেদ পলক জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে, আন্দোলনকারীদের নিজেদের মধ্যকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে তাদেরকে শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ বল প্রয়োগের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের আটক, নির্যাতন ও হত্যার নির্দেশ কার্যকর করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার জন্য প্রথমে মোবাইল ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে ও পরে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করেন।”
তাজুল আরও বলেন, “ইন্টারনেট বন্ধ সংক্রান্তে মিথ্যা বিবৃতি প্রদান করে এবং পরবর্তীতে ব্রডব্যান্ডসহ সকল ধরনের ইন্টারনেট সেবা এবং ফেইসবুক, টিকটক, হোয়াটসঅ্যাপ এবং বেশ কয়েকটি অ্যাপস (ক্যাশ সার্ভারসহ) বন্ধ করে দিয়ে বাংলাদেশ সহ বিশ্ববাসীর কাছে জুলাই আন্দোলন চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ভয়াবহ চিত্র আড়াল করে সারাদেশে সংঘটিত হত্যা, হত্যা প্রচেষ্টাসহ নির্যাতন এবং অন্যান্য অপরাধ সংঘটন করেছেন।
“ইন্টারনেট বন্ধের যড়যন্ত্র ও সিদ্ধান্ত আসত আসামি সজীব ওয়াজেদ জয়ের কাছ থেকে। তিনি তার মা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে পরামর্শ করে ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন এবং তা আসামি জুনাইদ আহমেদ পলক বাস্তবায়ন করেন।”
২০২৪ সালের ২৩ জুলাই সালমান এফ রহমানের সঙ্গে জুনাইদ আহমেদ পলকের কথোপকথন উদ্ধৃত করেন তাজুল, “কতটুকু অঘটন ঘটতে পারে সেটার একটা বার্তা আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আমাদের পরিষ্কার ভাবে দেওয়া উচিৎ এবং সেটা কালকে অ্যাডভাইজার মহোদয়ের সাথে আলোচনা করছি, উনি তো সবগুলো টেকনোলজি সম্পর্কে একদম লেটেস্ট সবকিছু জানেন, তো সেটা জেনে উনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলেছেন। আমি কালকে রাতে রিকোয়েস্ট করেছিলাম, উনি কথা বলেছেন। তখন আমাকে বলছে যে, তুমি লিস্ট পাঠাও কোন কোনটা আপাতত তুমি চাচ্ছো ব্লক রেখে আমাদের পসিবলটা করার। আমি লিস্ট পাঠিয়েছি, উনি ৮টা অ্যাপ্রুভ করে দিয়েছেন। এখন উনি বলেছেন তুমি রেডি থাকো তোমার পসিবল সবকিছু সক্ষমতা নিয়ে, যখন মা বলেন সিগন্যাল ইয়েস, তখন ওপেন, যখন বলবে নো, তখন ব্লক, এই বন্ধ।”
এই মামলায় তদন্ত শুরু হয় ২০২৪ সালের ১৪ অগাস্ট। তদন্ত শেষ হওয়ার পর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয় ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর। এ বছরের ২১ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-১ দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে।
রাষ্ট্রপক্ষ এই মামলায় ৩২ জনের তালিকা সম্বলিত সাক্ষীর জবানবন্দি দাখিল করেছে, যাদের মধ্যে রয়েছেন আহত ভিকটিম, নিহতদের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ও স্বজন, তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, বিটিআরসি কর্মকর্তা, টেলিযোগাযোগ কর্মকর্তা, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, বিশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা। পাশাপাশি দালিলিক ও প্রযুক্তিগত প্রমাণ, জব্দ তালিকা, আলামত, এবং বিশেষজ্ঞ মতামতও দাখিল করা হয়।
এই ট্রাইব্যুনালের ন্যায় বিচারের মাধ্যমে ইতিহাসের পাতায় সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে বলে তাজুল আশাবাদ ব্যক্ত করেন।