Published : 27 May 2026, 06:42 PM
রাজধানীর মগবাজারে আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে এক রাতে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় ‘গভীর দুঃখ ও শোক’ প্রকাশ করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
তবে হাসপাতালের সেবার মান, ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ নিয়ে অভিভাবকদের নানা অভিযোগের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের স্পষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারেননি আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ডা. নাহিদ ইয়াসমিন।
কোরবানির ঈদের আগের দিন সকালে আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর খবর পুরো বাংলাদেশকে নাড়িয়ে দেয়। খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান পুলিশ ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা।
ঘটনাস্থল ঘুরে দেখে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “ভোরে এই রুমটিতে এসি জটিলতা অথবা যে কোনো কারণেই হোক ওখানের যে পরিবেশ একটি সাফোকেটিভ পরিবেশের মতো আমরা পেয়েছি। ওখানে আসলে এসি এমনভাবে ছিল যে, এসিটি বন্ধ করলে ওখানে আর ভেন্টিলেশনের কোনো ব্যবস্থা নেই।”
মারা যাওয়া শিশুদের অভিভাবকরাও নানা অভিযোগের কথা সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন।

পরে আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ে এসে ডা. নাহিদ ইয়াসমিন বলেন, "আমি একজন মা হিসেবে বলতে চাই এর এর চেয়ে বড় ব্যথা বা পেইন আর কিছু হতে পারে না। যেই বাচ্চাগুলো মারা গেছে, তাদের বাবা-মার কষ্ট আমরা ফেরত দিতে পারব না। কিন্তু যেন এই ধরনের ঘটনা এখানে অন্য কোথাও যেন না হয়, এটা অবশ্যই আমাদের তদন্ত করতে হবে।”
তিনি বলেন, মঙ্গলবার রাতে পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে ১১ জন রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাদের ছয়টি বাচ্চাও সেখানে ছিল। বাকি পাঁচটি বাচ্চা ছিল এনআইসিইউতে।
“হঠাৎ করে আমরা খবর পেয়েছি, যে তাদের (পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে থাকা ছয় শিশুর) শ্বাসকষ্ট হয়েছে এবং (ভোর) ৬টার সময় তাদেরকে এনআইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং এনআইসিইউতে নেওয়ার পরে, দুই বাচ্চাকে মৃত পাওয়া গেছে আর বাকি চারটা বাচ্চা ভেরি ক্রিটিক্যাল অবস্থায় ছিল। তাদেরকে ভেন্টিলেটরে দেওয়া হয়েছে।
“আমাদের নিওনেটাল আইসিইউতে ডাক্তাররা আছে, তারা অনেক চেষ্টা করেছে, রক্ষা করতে... মোট বাচ্চা ছয়টা মারা গেছে।”
এ সময় একজন সাংবাদিক আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, সেখানে ১১ জন প্রসূতী ছিলেন, তাদের ১১ জন বাচ্চা ছিল।
উত্তরে ডা. নাহিদ বলেন, “না, ১১টা রোগী ছিল, ছয়টা বাচ্চা ছিল, বাকি মায়েদের বাচ্চা আগে থেকেই কোনো না কোনো কারণে এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল। তারা খুব ভালো অবস্থায় আছে।”
অভিভাবকদের অভিযোগ, শিশুগুলো যখন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঠিকমত তদারকি করেনি, অভিভাবকদের ডাকতেও যায়নি।
এ বিষয়টি তুলে ধরে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করলে ডা. নাহিদ বলেন, “উনারা তো অনেক কথাই বলছেন। এত দ্রুত ঘটনাটা ঘটেছে যে আমরা আসলে কোনো কিছু দেখার সুযোগই পাইনি। খুব দ্রুত লোকগুলো এবং নার্সরাসহ সবাই মিলে এই নিওনেটাল আইসিইউতে বাচ্চাদেরকে নিয়ে গিয়েছে, ভেন্টিলেটরে দিয়েছে, ডাক্তাররা চেষ্টা করেছে। বাচ্চাদের এত বেশি শ্বাসকষ্ট ছিল যে বাচ্চাদের বাঁচানো যায়নি।”

একজন সাংবাদিক এ সময় বলেন, “অভিভাবকদের অভিযোগ—এই ছয়টা বাচ্চাকে হত্যা করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণেই এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।”
ডা. নাহিদ বলেন, “এই ধরনের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করছি এবং আমরা অত্যন্ত দুঃখিত এবং ব্যথিত। এর চেয়ে বড় ব্যথা, আমি একজন মা হিসেবে বলতে চাই, এর এর চেয়ে বড় ব্যথা বা পেইন আর কিছু হতে পারে না। যেই বাচ্চাগুলো মারা গেছে, তাদের বাবা-মার কষ্ট আমরা ফেরত দিতে পারব না। কিন্তু যেন এই ধরনের ঘটনা এখানে অন্য কোথাও যেন না হয়, এটা অবশ্যই আমাদের তদন্ত করতে হবে।”
আরেকজন সাংবাদিক বলেন, “শুধুমাত্র অবহেলার কারণেই? এটা আসলে কী কারণে হয়েছে?”
জবাবে আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক বলেন, “এটা আমাদের তদন্ত করে দেখতে হবে। কারণ, আমরা এখন পর্যন্ত তদন্ত করার কোনো সুযোগই পাইনি। আমাদের আইনি বিশেষজ্ঞ যারা আছেন এবং বিভিন্ন সেক্টর থেকে অনেকেই এসেছেন, ডিজি হেলথ থেকে এসেছেন, আমাদের ডিজি স্যার এসেছেন, প্রশাসনের অনেকেই এসেছেন, সবাই কিন্তু এটা তদন্ত করে বের করবে যে কী কারণে হল।
“একসাথে ছয়টা বাচ্চা মারা যাওয়ার ঘটনা, আদ-দ্বীন হসপিটালে বিগত সময়ে কখনোই এটা হয় নাই। এই হসপিটাল ১৯৯৭ সাল থেকে আমরা কাজ করছি এবং আমরা প্রচুর ডেলিভারি করে থাকি এবং এই ডেলিভারিও কোনো রকম কোনো সমস্যা ছাড়া হয়েছে।”
একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, “আমরা এসি লিকেজের কথা শুনেছি, আপনারা কি এটা...।”
জবাবে ডা. নাহিদ বলেন, “এসি আমরা সব সময়ই চেক করি। এসি লিকেজ ছিল কি না, এই বিষয়টাতো এখনও তদন্ত করে বের করতে হবে। আমাদেরকে সুযোগ দিতে হবে। ফরেনসিক টিম এসেছে, তারা এই বিষয়টা দেখছে।”
কোনো কোনো অভিভাবক তথ্য গোপনের অভিযোগ করছেন, সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ডা. নাহিদ বলেন, “না না না, এখানে শুধু ছয়টা বাচ্চাই মারা গেছে। আমি কনফিডেন্টলি বলতে পারি এখানে শুধুমাত্র ছয়টা বাচ্চাই মারা গেছে। আর বাকি পাঁচটা শিশু ভালো আছে। ওই যে তারা এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন আছে।”
এক সাংবাদিক প্রশ্ন করতে গিয়ে বলেন, “সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল রাত ১২টা থেকে একটা শিশুর সাফোকেশনে মারা গেছে। কতটা সময়ে একটা শিশু ছটফট করলে সে মারা যায়? অবহেলার কোনো বিষয় আছে কি না একটু বলবেন?”
জবাবে আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক বলেন, “এই বিষয়ে আমি যেটা বলতে চাই, ৩টার পরে, রাত ৩টার পরে একটা বাচ্চার শ্বাসকষ্ট মনে হওয়ায় তাকে এনআইসিইউতে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে এবং নিওনেটোলজিস্ট যারা আছেন, তারা দেখে বলেছেন যে না, বাচ্চার ভাইটাল সাইন সবকিছু ভালো আছে। তখন কিন্তু তাকে আবার ওয়ার্ডে নিয়ে আসছে।
“আসলে বাচ্চাগুলো অসুস্থ হয়েছে ৬টার দিক থেকে। ৬টার সময় একসাথে ছয়টা বাচ্চা, তখনই কিন্তু দু-তিন লোকজন এবং নার্সসহ সবাই মিলেই এনআইসিইউতেই নিয়ে গেছে।”

ভোরে শিশুগুলোর মৃত্যুর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো ব্রিফ না করায় যে অভিযোগ উঠেছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন করলে ডা. নাহিদ বলেন, “অভিযোগ করতে পারে, কিন্তু এখানে কোনো ধরনের… আমরা নিজেরাই তো জানি না, আমাদেরকে তো তদন্ত করে বের করতে হবে কেন হল।"
এদিকে আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে বলেছে, “আজ বুধবার ৬টি শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় কর্তৃপক্ষ গভীর দুঃখ ও শোক প্রকাশ করছে। আকস্মিক এ ঘটনায় আমরা গভীরভাবে মর্মাহত।
“ঘটনার প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২৬ মে ২০২৬ দিবাগত রাত ২টার দিকে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড-২ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রগুলো চালু থাকলেও একাধিক নবজাতক শিশুর মায়েরা সেগুলো বন্ধ করার জন্য বলেন। এক পর্যায়ে কর্তব্যরত নার্সরা সেগুলো বন্ধ করে দেন।
“রাত ৩টার দিকে আবার এসি চালু করা হয়। এরপর রাত ৪টার দিকে একজন বাচ্চা অস্বাভাবিকভাবে কান্না করতে থাকলে দ্রুত নবজাতক শিশুর পরিচর্যা কেন্দ্র এনআইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়। পর্যায়ক্রমে অন্য ৫ জন বাচ্চাকেও দ্রুত সময়ের মধ্যে এনআইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়।”
বিবৃতিতে বলা হয়, “সকাল ৬টার সময় প্রথম বাচ্চা মারা যায় এবং সকাল ৬টা থেকে ৯টার মধ্যে অন্য ৫ নবজাতক শিশু মারা যায়।”
ওই ওয়ার্ডে রাতের বেলা তিনজন নার্স দায়িত্বে ছিলেন জানিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, “ঘটনা ঘটার সাথে সাথে হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন সকল দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য হাসপাতালে অবস্থান করছেন।
“এ ধরনের মর্মান্তিক ও দুঃখজনক দুর্ঘটনা কেন ঘটল সে বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সার্বিকভাবে সহযোগিতা করছেন।”
আদ-দ্বীন কর্তৃপক্ষও অভ্যন্তরীণভাবে এ ঘটনার তদন্ত করছে জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, “ঘটনায় কারও গাফিলতি কিংবা ত্রুটি চিহ্নিত হলে অবশ্যই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
আরো পড়ুন
আদ-দ্বীনে ৬ শিশুর মৃত্যু: ‘ভালোমন্দ হইলে তারা দায়িত্ব নিয়া করবো, এই আশায় আইছিলাম’
আদ-দ্বীনে ৬ শিশুর মৃত্যু: কক্ষের পরিবেশ ছিল ‘সাফোকেটিভ’, বললেন স্বাস্থ্যের ডিজি