Published : 27 May 2026, 05:28 PM
রাজধানীর মগবাজারে আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছয় নবজাতকের মৃত্যুতে সেখানে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
বুধবার সকালে হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড-২ এর সামনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে চলছে স্বজনদের আহাজারি।
মুন্সীগঞ্জ থেকে আসা মাসুকা তার তিন দিন বয়সী মৃত নাতনিকে কোলে জড়িয়ে নির্বাক বসে আছেন। পাশেই অচেতন অবস্থায় পড়ে আছেন তার পুত্রবধূ মীম।
মাসুকা বলেন, ভালো চিকিৎসার আশায় তারা মুন্সীগঞ্জ থেকে এই হাসপাতালে এসেছিলেন।
তিনি বলেন, “অত বড় হাসপাতাল। ভালোমন্দ হইলে তারা দায়িত্ব নিয়া করবো, এই আশায় আইছিলাম। টাকার কথা চিন্তা করি নাই।”
ভোরের বিভীষিকাময় মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে মাসুকা বলছিলেন, “হঠাৎ করেই ওয়ার্ডের সব নবজাতক একসঙ্গে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে।
“আমি ওরে (নাতনি) কোলে লইয়া দোয়া-দরুদ পইড়া ফুঁ দিলাম। তারপর একটু খাইয়া গেলাম ফজরে নামাজ পড়তে। নামাজরত অবস্থাতেই ছেলে ছুটে এসে ওর মৃত্যুর খবর দিল।”
তিনি বলেন, ওই সময় শিশুটির শরীর লালচে বর্ণ ধারণ করেছিল।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক আশরাফুল ইসলাম ছয় নবজাতকের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছেন।
মৃত এই শিশুদের মায়েরা হলে-নাজমা (যমজ সন্তান), মীম, ফারিয়া ও জান্নাত। এছাড়া হাবিবুর নামের এক ব্যক্তির একটি সন্তান মারা গেছে।
কোরবানির ঈদের আগের দিন সকালে আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর খবর পুরো বাংলাদেশকে নাড়িয়ে দেয়। খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান পুলিশ ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা।
মৃত শিশুগুলোর পরিবারের পক্ষ থেকে অবহেলার অভিযোগ আনা হলেও ঠিক কী কারণে শিশুগুলোর মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি কেউ।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেছে, ওয়ার্ডের ‘ডান পাশে’ থাকা নবজাতকরাই মূলত অজ্ঞাত এই দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে।
দায়িত্বরত নার্সদের দাবি, ঘটনার আগ পর্যন্ত সব বাচ্চাই একদম সুস্থ ও স্বাভাবিক ছিল।

হাসপাতাল মহাপরিচালক অধ্যাপক নাহিদ ইয়াসমিন বলেন, “এটি একটি ওটি পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ড। সকাল ৬টার দিকে ছয়টি শিশুকে এনআইসিইউতে নেওয়া হয়।”
হাসপাতালে দায়িত্বরত নার্স চন্দনা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ওই ওয়ার্ডের আরও ২-৩ জন নবজাতক জটিল অবস্থা নিয়ে পাঁচতলার এনআইসিইউতে ভর্তি আছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে একাধিক রোগীর স্বজন দাবি করেছেন, অন্তত ১১ জন নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে।
তাদের ভাষ্য, অনেক পরিবার বাচ্চা মারা যাওয়ার পর কারণ না জেনেই লাশ নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে। তারা হয়তো পরে সংবাদমাধ্যম থেকে জানতে পারবেন যে এটি স্বাভাবিক মৃত্যু ছিল না।
ঢাকা মহানগর পুলিশ-ডিএমপির রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, “এখন পর্যন্ত আমরা যেটা জেনেছি, ৬ জন শিশু ছিল এবং ৬ জনই মারা গেছে। কী কারণে মারা গেছে তার কারণ এখনও জানা যায়নি। আমাদের সিআইডি এক্সপার্ট টিম উপস্থিত আছে, তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানাবেন।”
এই ঘটনাকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ও অস্বাভাবিক’ হিসেবে বর্ণনা করে অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ওই ওয়ার্ডে ১১ জন মা ছিলেন। তাদের মধ্যে ৬ জন মা তাদের শিশুর সন্তানসহ ছিলেন। শিশুগুলোর বয়স একদিন থেকে তিন দিনের ভেতরে। আর বাকি পাঁচ শিশু এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল।
এদিন দুপুরে হাসপাতাল পরিদর্শনের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, “ভোরে এই রুমটিতে এসি জটিলতা অথবা যে কোনো কারণেই হোক ওখানের যে পরিবেশ একটি সাফোকেটিভ পরিবেশের মতো আমরা পেয়েছি। ওখানে আসলে এসি এমনভাবে ছিল যে, এসিটি বন্ধ করলে ওখানে আর ভেন্টিলেশনের কোনো ব্যবস্থা নেই।”
এ ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেছেন, আগামী তিন দিনের মধ্যে এই প্রতিবেদন দেবে।