Published : 23 Feb 2026, 07:10 PM
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেসব অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো পর্যালোচনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, “আমরা ভেরিভিকেশন করব। যথাযথ হয়েছে কি না… আশা করি এ কাজটা খুব দ্রুততার সাথে করতে পরব।”
সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন দপ্তর ও সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে সাংবাদিদের এ কথা বলেন মন্ত্রী।
লাইসেন্সধারী কারা, যথাযথ প্রক্রিয়ায় লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে কি না, তারা লাইসেন্স পাওয়ার উপযুক্ত কি না–আইন অনুসারে সে গুলো সবই যাচাই বাছাই করা হবে বলে জানান তিনি।
“এটা যাচাই করার পর কী পরিমাণ লাইসেন্সের যোগ্যতা আছে, তাদের লাইসেন্স আমরা বহাল রাখব। আবার দেখা যাবে যাদের দেওয়া ঠিক হয়নি, যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বন করেনি, তারা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করার উদ্দেশ্যে পেয়েছে, সে বিবেচনায় তাদের বাতিল করা হবে। একই সাথে সেই লাইসেন্সের অধীনে কোনো অস্ত্র থাকলে তা বাজেয়াপ্ত হবে।”
সোমবারই এ বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করা হবে বলে জানান সালাউদ্দিন আহমেদ।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমানে কতগুলো লাইসেন্স, কতগুলো লাইসেন্সধারী অস্ত্র আছে, তার পরিসংখ্যান তৈরি করতে মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন দপ্তরের প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকের সূত্র ধরে মন্ত্রী বলেন, “দপ্তরের সমস্যা সম্পর্কে অবহিত হলাম। প্রত্যেক দপ্তরের প্রধানদের সাথে আবার আলাদা আলাদা কথা বলব। আজকে যে আলোচনা হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
তিনি বলেন, “বর্তমান সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন করা। জনগণকে শান্তি- স্বস্তি দেওয়া। জন প্রত্যাশা অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জনগণের বন্ধুতে পরিণত করা। সেই লক্ষ্যে কয়েকটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি আমরা।”
জমা না পড়া ১০ হাজার অস্ত্র ‘অবৈধ হয়ে গেছে’
নির্বাচনের আগে সদ্য বিদায়ী অন্তবর্তী সরকার বৈধ অস্ত্র জমা দেওয়ার যে নির্দেশ দিয়েছিল, তাতে ১০ হাজারের বেশি অস্ত্র জমা পড়েনি বলে তথ্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “এসবস অস্ত্র আইনানুগভাবে অবৈধ হয়ে গেছে। সেগুলো উদ্ধারের ব্যবস্থা করতে হবে। সেগুলোর ব্যাপারে মামলাও করা যেতে পারে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় কতগুলো মামলা হয়েছে দেখে এগুলো আমরা রেগুলার করবে।”
পুলিশ নিয়োগ হচ্ছে
পুলিশের সব পর্যায়েই যে জনবলের অভাব আছে, সে কথা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “২ হাজার ৭০১ জন কনস্টেবলের পদ খালি আছে, তা জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
পাসপোর্ট ভোগান্তি দূর করতে এজেন্ট নিয়োগ?
পাসপোর্ট নিয়ে জনগণের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় অভিযোগ আসে, সে কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, "ইদানিং অবশ্য কম। যেটা ই-পাসপোর্ট হয়ে যাওয়ার পরে। তবে জনগণের অধিকাংশই অনলাইনে আবেদন করতে অভ্যস্ত নয়। সেজন্য কারো কারো সহযোগিতা নিতে হয়। যারা সহায়ক হিসাবে এ কাজগুলো করেন–এটাও একটা পেশার সৃষ্টি হয়েছে।”
তবে পাসপোর্ট অফিসের কিছু লোকজন তাদের যোগসাজশে ‘জনগণের ভোগান্তির সৃষ্টি করে’–এমন অভিযোগ পাওয়ার কথাও স্বরাষ্ট মন্ত্রী বলেন।
সেজন্য বৈধ এজেন্ট নিয়োগের পরিকল্পনা জানিয়ে তিনি বলেন, “এটা পরীক্ষামূলকভাবে দেখতে পারি। আগে ঢাকা এবং বিভিন্ন বিভাগের পাসপোর্ট অফিসগুলোতে পরীক্ষা করে আমরা যদি সেটা চালু করি, তাহলে ভবিষ্যতে সারা দেশে চালু করতে পরব।”
এর যৌক্তিকতা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, “এটা করলে তাদের (এজেন্ট) একটি নম্বর থাকবে। সেটার কারণে তাকে শনাক্ত করা যাবে। অনিয়ম হলে তাদের অ্যাকাউন্টটেবল করা যায়। ধরা যায়। কিছু কর্মস্থান সৃষ্টি হয়, জনগণের জন্য একটা সার্ভিস চার্জ ঠিক করে দিলে সুবিধা হয়।”
এসপি বদলিতে লটারি নয়
পুলিশ বাহিনীকে ‘চেইন অব কমান্ড’ মানার নির্দেশ দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “নির্বাচনের আগে লটারির মাধ্যমে পুলিশের এসপি বদলি হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। সে জায়গায় অনেক ক্ষেত্রে এমন হয়েছে যে যেখানে যার নিয়োগ হওয়ার কথা না, বা হলে সার্ভিসটা দিতে পারবে না… এগুলো অনেকটা যাচাই বাছাই করে দিতে হয়।”
তিনি বলেন, দায়িত্ব বণ্টনের সময় সার্ভিস রেকর্ড দেখতে হয়, বড় জেলা ছোট জেলা বিবেচনায় নিতে হয়। সেসময় এসব বিবেচনা করা হয়নি।
“এই লাটারিটাও স্বচ্ছ হয়েছে বলে মনে করি না। যাচাই করে ডিপার্টমেন্ট যাকে যেখানে দেওয়ার উপযুক্ত মনে করবে, সেখানে দেওয়ার জন্য আজ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
৫ অগাস্টের পরের মামলা যাচাই করা হবে
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর যে শতশত মামলা হয়েছে, তার সবই যে সঠিক ছিল না, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তা স্বীকার করে নেন।
তিনি বলেন, “কিছু সুবিধাবাদী মানুষ এগুলো সুযোগ নিয়ে ভোগান্তির সৃষ্টির জন্য অনেককে আসামি করেছে, যারা সেখানে জড়িত থাকার প্রশ্নই আসে না। বড় বড় ব্যবসায়ী, অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তি, সমাজের বিশিষ্ট ব্যাক্তিদের আসামি করা হয়েছে।
“অনেক মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলা হয়েছে, এটা আমরা পরীক্ষা নিরীক্ষা করার জন্য বলেছি। তারা যেন ভোগান্তিতে না পড়ে।”
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, “অনেক সময় পলিটিক্যাল বা সমাজের কিছু মদদ আছে। পুলিশও যেন হয়রানি না করে সেটাও দেখা হবে।”
‘প্রটোকল’ সবাই পাবে না
জেলার পুলিশ সুপার অনেক সময় রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন ব্যক্তিকে নিরাপত্তা দিতে বাধ্য হন, সেটা যেন না করা হয়, সে ব্যাপারে কঠোর নির্দেশ দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “বিধির বাইরে কোনো প্রটোকল পুলিশ সুপাররা দেবেন না।”
জেলা কোটা দেখিয়ে কনস্টেবল নিয়োগ: ‘যাচাই হবে’
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ‘স্থায়ী ঠিকানা জালিয়াতি করে’ কনস্টেবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “সেগুলো তদন্ত করে বিবেচনায় নিতে বলা হয়েছে। আবার কারো উপর যেন জুলুম না হয়, সেটাও বলা হয়েছে।”
মন্ত্রী বলেন, এসব বিষয়ে ‘প্রশ্রয় দিলে’ ভবিষ্যতে যেসব নিয়োগ হবে, সেগুলোও প্রশ্নের সম্মুখীন হবে।
‘ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা’
এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, “পুলিশ জনগণের বন্ধু। এ বাহিনীকে বাস্তবে জনগণের বন্ধু হিসাবে পরিণত করতে কাজ করা হচ্ছে।”
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ‘রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে’ এ প্রতিষ্ঠান ‘ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে’ বলে মন্তব্য করেন সালাউদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, “এটা মাথায় রেখে আমরা পুলিশের সংস্কার করতে চাই। এই ব্যবস্থাকে সংস্কার করতে চাই। প্রকৃতপক্ষে তাদের মনোবলকে বাড়ানোর জন্য যে কাজটা করা যায়, আমরা সে কাজটি করছি।
“ফ্যাসিবাদের কারণে শুধু পুলিশ নয়, এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই যেটা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়নি। একটা ধ্বংসস্তূপ থেকে আমরা উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি।”
উপদেষ্টার অস্ত্র নেওয়া
অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টা নির্ধারিত বয়স হওয়ার আগেই অস্ত্রের লাইসেন্স নিয়েছিলেন, সে বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন একজন সাংবাদিক।
জবাবে তিনি বলেন, “এগুলোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাকে কোন বিবেচনায় লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, সেটা সামাজিক নিরাপত্তা, সামাজিক অবস্থান, এগুলো বিবেচনায় নিতে হবে। তৎকালীন উপদেষ্টা তার বয়সটা বিবেচনা না রেখে সামাজিক গুরুত্ব এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয়টি চিন্তা করে দেওয়া হয়েছে কি না, এগুলো বিবেচনায় নিতে হবে।“
বিডিআর বিদ্রোহের নতুন তদন্ত হবে
বিডিআর বিদ্রোহ নিয়ে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, "আমরা এটার জন্য আরেকটা তদন্ত কমিশন গঠন করার কথা বলেছি, আমাদের প্রতিশ্রুতি আছে। আমাদের ইশতেহারের মধ্যেও আছে। পুনঃতদন্ত বা কমিশন গঠন করে ন্যায়বিচারের জন্য… ।”
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি আশ্বাস দেন, “পুলিশের যারা পদবঞ্চিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে, তারা অবশ্যই ন্যায়বিচার পাবে।”