Published : 17 Jun 2026, 09:37 PM
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গণশুনানিতে হাজির হয়ে প্রশাসকের কাছে একটি ‘স্পিড ব্রেকার’ চেয়েছেন ঢাকা ৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান হামিদ।
তবে দক্ষিণ সিটির অঞ্চল-৩ ও অঞ্চল-৪ এর বাসিন্দারা মশার উপদ্রবকে প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নত করে দ্রুত এর সমাধান দাবি করেছেন।
চাঁদাবাজি, জলাবদ্ধতা, নাগরিক সনদ পেতে ভোগান্তি, অবৈধ দখল, খেলার মাঠের সংকট ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার দুরাবস্থাসহ নানা সমস্যা উঠে এসেছে নাগরিকদের কথায়।
এসব অভিযোগ শুনে দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আবদুস সালাম।
বুধবার বিকেলে রাজধানীর লালবাগের মির্জা আবুতালিব শায়েস্তা খাঁন কমিউনিটি সেন্টারে এই গণশুনানির আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন ওয়ার্ডের বাসিন্দারা সেখানে তাদের এলাকার সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
৩০ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. ইলিয়াস তার এলাকার বেহাল সড়কের কথা তুলে ধরে বলেন, ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে এলাকাবাসীকে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
২৭ নম্বর ওয়ার্ডের এক বাসিন্দা বলেন, অল্প বৃষ্টিতেই দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে।
কালুনগর খালে ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে ২২ নম্বর ওয়ার্ডে মশার উপদ্রব তৈরি হওয়ার কথা বলেন স্থানীয় একজন বাসিন্দা।
তিনি বলেন, হাজারীবাগ থেকে বেড়িবাঁধ পর্যন্ত সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, এলাকায় চাঁদাবাজির ঘটনাও রয়েছে। রাস্তার পাশের অবৈধ স্থাপনাও উচ্ছেদ করা দরকার।

৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের এক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, তার এলাকায় ফুটপাত দখল করে অবৈধ দোকান বসানো হয়েছে। এসব দোকানের বর্জ্যে ড্রেন বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।
২৯ নম্বর ওয়ার্ডের একাধিক বাসিন্দা খেলার মাঠের অভাব, ওয়াসার পানির সঙ্গে ড্রেনের পানি মিশে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হওয়া, মশার উপদ্রব এবং হাজী রহিম বক্স লেন এলাকায় জলাবদ্ধতার সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
একই ধরনের অভিযোগ করেন ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের এক বাসিন্দাও।
কামরাঙ্গীরচরের এক বাসিন্দা বলেন, তার এলাকায় পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। সামান্য বৃষ্টিতেই কয়েকদিন পানি জমে থাকে।
তিনি বলেন, ইসলামনগর, ব্যাটারিঘাট ও রসুলপুর এলাকায় খালে যুক্ত স্যুয়ারেজ লাইনগুলো বন্ধ হয়ে আছে। অপরিষ্কার খাল ও জমে থাকা পানির কারণে মশার উপদ্রব বেড়েছে। পাশাপাশি মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের সমস্যাও রয়েছে।
১৪ নম্বর ওয়ার্ডের এক বাসিন্দা নাগরিক সনদ পেতে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, হাজারীবাগে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।
এসব সমস্যার কথা শুনে ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকতা এয়ার কমডোর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, "খাল ভরাট নিয়ে যে অভিযোগগুলো এসেছে, সেগুলো পরিষ্কার করতে কালকেই লোক পাঠাব।
"তবে খালগুলো পরিষ্কার করার পরে এক সপ্তাহের মধ্যে আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে। ময়লা ফেলে ভরাট করে ফেলা হয়। এ বিষয়ে স্থানীয়দের দায়িত্ব নিতে হবে, সচেতন হতে হবে।"
এ সময় ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান বলেন, প্রতিটি ওয়ার্ডে তিন দিন পরপর মশার ওষুধ ছিটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
"মশার ওষুধ বিষাক্ত। এর ফলে (কর্মীদের) অনেকে মারা গেছেন। অনেকে আবসরে গেছেন। তাই বড় ওয়ার্ডগুলোতে জনবল সংকটের কারণে সমস্যা হচ্ছে।"
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা ৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান হামিদ।
স্পিড ব্রেকার নির্মাণের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, "আমি কয়েকটা দাবি জানাব। এর মধ্যে রয়েছে তাঁতিবাজার এলাকায় রাস্তার মাঝখানে একটা স্পিড ব্রেকার লাগবে। কারণ ওখানে গাড়ি অনেক স্পিডে যায়। এটা ওই এলাকার ব্যবসায়ীদের দাবি।"
গ্যাসের পাইপ লাইন লিকেজের সমস্যা তুলে ধরে এমপি বলেন, “আমাদের গ্যাসের পাইপ লাইনে দিয়ে গ্যাস বের হচ্ছে। কালকে আমার ৩১ নাম্বার ওয়ার্ডে তিন চার জায়গা লিকেজ ছিল। দুইটা সারিয়েছে। আরো তিনটা কালকে দেখা গেল। লিকেজ পাওয়া যাচ্ছে কারণ অনেক পুরান লাইন।
"এগুলো অনেক সময় বিস্ফোরণ হতে পারে। আমি কাইন্ডলি প্রশাসককে বলব এই সমস্যা দ্রুত সমাধান করেন।"
গণশুনানিতে ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, বাজেটের সীমাবদ্ধতা থাকলেও কিছু মৌলিক সেবা কোনোভাবেই বন্ধ রাখা যাবে না।
“বর্জ্য অপসারণের ক্ষেত্রে বাজেটের দোহাই দিয়ে পার পাওয়া যাবে না। যেখানে খুঁটি আছে, সেখানে সড়কবাতি জ্বলতে হবে।”
বর্জ্য অপসারণ, সড়কবাতি সচল রাখা, মশা নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
মশা নিয়ন্ত্রণে নাগরিক সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসক বলেন, “মশা নির্মূল করা যাবে না। নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। শুধু ওষুধ ছিটিয়ে মশা দমন সম্ভব নয়। মশার ডিম ও লার্ভা ধ্বংস করতে হবে।
“এজন্য বাসাবাড়ি ও আশপাশের এলাকায় পানি জমতে দেওয়া যাবে না এবং যেখানে-সেখানে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে।”
বুড়িগঙ্গা নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধে স্থানীয়দের সহযোগিতা চেয়ে আবদুস সালাম বলেন, “শুধু সিটি করপোরেশনের পক্ষে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে।”
নাগরিক সেবা বিষয়ে তিনি বলেন, বৈধ কাগজপত্র থাকলে নাগরিক সনদ, জন্মনিবন্ধন সনদ ও ওয়ারিশ সনদ পেতে কোনো ধরনের হয়রানি হওয়া ‘উচিত নয়’।
তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত সেবা দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন, “নাগরিক সনদ, জন্মনিবন্ধন ও ওয়ারিশ সনদ—এই তিনটি সেবা চাহিবা মাত্র দিতে হবে, যদি আবেদনটি আইনগতভাবে সঠিক হয়।”
অবৈধ দখল, খাল দূষণ, ফুটপাত দখল, অবৈধ দোকানপাট এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে এলাকাভিত্তিক পঞ্চায়েত গড়ে তোলার আহ্বান জানান প্রশাসক।
তিনি বলেন, “সিটি করপোরেশন উচ্ছেদ অভিযান চালাতে পারে, কিন্তু পুনরায় দখল রোধে স্থানীয় জনগণের সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। এলকায় এলাকায় পঞ্চায়েত গড়ে তুলতে হবে। "