Published : 03 Nov 2025, 08:47 AM
কোন প্রাণী তা চিনতে না পেরে গ্রামবাসী পিটিয়ে আহত করেছিল; সময়মত উদ্ধার না হলে হয়ত মরেই যেত। নতুন জীবন পাওয়ার পর তার ঠাঁই হয়েছে বনে। এখন বাংলাদেশে রেডিও ট্রান্সমিটার বসানো প্রথম চীনা বনরুই এটি।
এই বনরুইটিকে ঘিরে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন প্রাণী সংরক্ষণবিদরা। তারা বলছেন, আগামী দেড় বছর এই রেডিও ট্রান্সমিটার থেকে বনরুই সম্পর্কে অনেক তথ্য জানা যাবে, যা এই প্রজাতির জীবনযাত্রা, সংখ্যা নির্ধারণ ও সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
শনিবার মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে অবমুক্ত করা হয় অতি বিপন্ন প্রজাতির চীনা বনরুইটিকে। তার আগে এর শরীরে বসানো হয়েছে রেডিও ট্রান্সমিটার।
সীমান্তবর্তী পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলা থেকে মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়ার দূরত্ব প্রায় সাড়ে পাঁচশ কিলোমিটার। ঘটনাচক্রে এই দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে বনে ঠাঁই পেয়েছে বনরুইটি।
এর শরীরে বসানো রেডিও ট্রান্সমিটার জানান দেবে, বুনো পরিবেশে বনরুইটি কীভাবে অভিযোজন ঘটাচ্ছে আর কতটা পথ পাড়ি দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত বনরুই। বাংলাদেশে যে তিন প্রজাতির বনরুই পাওয়া যায়, তার মধ্যে একটি চীনা বনরুই।
গভীর জঙ্গলের বাসিন্দা আর নিশাচর হওয়ায় বনরুই সম্পর্কে এখনো অনেক তথ্যই অজানা।
বাংলাদেশের সিলেট ও চট্টগ্রামের দুয়েকটি বনে খুব অল্পসংখ্যক বনরুই আছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। উত্তরবঙ্গে মাঝে মাঝে যেসব বনরুই উদ্ধার হয়, সেগুলো সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসে বলে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য।

যেভাবে উদ্ধার হল
ঘটনার সূত্রপাত ২৭ অক্টোবর বিকেলে। পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার ঝলই শালশিরি ইউনিয়নের কালিয়াগঞ্জ নজিরতন উচ্চবিদ্যালয় মাঠে।
ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড স্নেক রেসকিউ টিম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. সহিদুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সেদিন বিকেলে হাজার হাজার লোক সেখানে ফুটবল খেলা দেখতে এসেছিল। এত লোক সমাগমের কারণে খেলা শেষে যখন তারা চলে যাচ্ছিল তখন মাটিতে যে কম্পন সৃষ্টি হয় তাতে বনরুইটি ভয় পেয়ে বের হয়ে আসে বলে ধারণা করছি।
“পাশেই একটি বাঁশঝাড় ও কবরস্থান। বনরুইটি ওই কবরস্থান থেকে বের হতে দেখেছে স্থানীয়রা। সন্ধ্যার পর কবরস্থান থেকে রাস্তায় উঠে তারপর মাঠে প্রবেশ করে। সেখানে লোকজন সেটিকে পিটিয়ে প্রায় অজ্ঞান করে ফেলে।”
সেখান থেকে টোলিফোনে একজন মো. সহিদুল ইসলামকে খবর দেন। খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান।
সহিদুল ইসলাম বলেন, “যখন আমরা যাই, তখন বনরুইটি আহত অবস্থায় পড়ে ছিল। অবস্থা খুব খারাপ ছিল। উদ্ধারের পর আমি বাড়ি নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করি এবং বন বিভাগকে খবর দিই।
“ওই এলাকায় বা আশেপাশে কোনো বন নেই। আগে সেখানে কখনো কেউ বনরুই দেখেছে বলে বলতে পারেনি, এটাই প্রথম।”
দিনাজপুরের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ফাহিম মাসউদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বনরুই দেখে চিনতে না পেরে ভয়ে গ্রামের লোকজন আঘাত করেছিল। সহিদুল ইসলাম গিয়ে সেটি উদ্ধার করেন। আমি উনার কাছ থেকে বিষয়টি জানতে পারি।

“পরদিন তিনি আমাদের কাছে বনরুইটি হস্তান্তর করলে পরবর্তীতে আমরা ঢাকায় বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট এবং বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সাথে যোগাযোগ করে সেটিকে হস্তান্তর করি।”
ট্রান্সমিটার নিয়ে লাউয়াছড়ায়
আহত বনরুইটিকে এরপর নিয়ে যাওয়া হয় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের জানকিছড়া বন্যপ্রাণী রেসকিউ সেন্টারের ক্লিনিকে।
এই প্রাণী সেবা কেন্দ্রটি বন বিভাগের সাথে বেসরকারি সংস্থা ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স (সিসিএ)এর যৌথ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়।
সিসিএ এর অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও পানিশূন্যতার কারণে বনরুইটিকে জানকিছড়া ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ সেন্টারের ক্লিনিকে রেখে চিকিৎসা ও তরল সরবরাহের মাধ্যমে সুস্থ করে তোলা হয়।
তারপর বনরুইটির গায়ে একটি ছোট ভিএইচএফ (অতি উচ্চ তরঙ্গের) রেডিও ট্রান্সমিটার সংযুক্ত করা হয়।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ সিলেট এর শ্রীমঙ্গল রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. কাজী নাজমুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, রেডিও ট্রান্সমিটার সংযোগের পর শনিবার বনরুইটিকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে অবমুক্ত করা হয়েছে।

এর আগে ২০২১ সালে উদ্ধার হওয়া একটি বনরুই লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে অবমুক্ত করা হয়েছিল। ওই বনে কিছু বনরুই আছে।
সিসিএ এর ওয়াইল্ডলাইফ ভেটেরিনারিয়ান ডা. জয়তু কুমার মণ্ডল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল বনরুইটিকে সুস্থ করে বনে ফিরিয়ে দেওয়া। এটি গভীর বনের প্রাণী। অতীতে অনেক সময় বনরুই মানুষের কাছাকাছি এলে আর নিরাপদে ফিরতে পারেনি। এই বনরুইটির জীবনও প্রায় বিপন্ন হয়ে পড়েছিল।
“সুস্থ হওয়ার পর রেডিও ট্রান্সমিটার স্থাপন করে এটিকে বনে অবমুক্ত করা হয়েছে।”
অতি বিপন্ন ও পাচারের শীর্ষে
বনরুই বা Pangolin হল pholidota বর্গের Manidae গোত্রের একটি স্তন্যপায়ী প্রাণী। এর আরেকনাম আঁশযুক্ত পিপীলিকাভুক। পিপড়া খায় বলে এর এমন নাম।
আকৃতির কারণে বনরুইকে সরীসৃপ বলে ভুল করা হয়। পিঠ, পাশ, হাত-পায়ের উপরদিক ও গোটা লেজ বড় বড় তিনকোণা শক্ত আঁশে ঢাকা থাকে বনরুইয়ের শরীর।
ভয় পেয়ে এরা খুব দ্রুত বলের মত পুরো শরীর গুটিয়ে ফেলে। মালয় ভাষায় ‘পেনগুলিং’ অর্থ যে গুটিয়ে যেতে পারে। এমন আচরণের জন্যই প্রাণিটির ইংরেজি নাম ‘পেনগুলিন’।
বনরুইয়ের শরীরের আঁশগুলি খাড়া করলে বনরুইকে অনেকটা সজারুর মত দেখায়। এরা দুর্গন্ধযুক্ত এক ধরনের তরলের নিঃসরণ ঘটাতে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারবেশন অব নেচার (আইইউসিএন) এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বনরুইয়ের স্বীকৃত প্রজাতি সংখ্যা আটটি।
ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউডব্লিউএফ) তথ্য মতে, এই আটটি বনরুই প্রজাতি মূলত এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে পাওয়া যায়।

এরমধ্যে এশিয়ায় যে চারটি প্রজাতি পাওয়া যায় সেগুলো হল- ভারতীয় বনরুই (Manis crassicaudata), ফিলিপিন্সের বনরুই(Manis culionensis), সুন্দা বনরুই (Manis javanica) ও চীনা বনরুই (Manis pentadactyla)।
বাংলাদেশে সচরাচর চীনা ও ভারতীয় বনরুইয়ের দেখা মেলে। এরমধ্যে ভারতীয় প্রজাতিটি খুব কম দেখা যায়। চীনা বনরুই এর আঁশ তুলনামূলক কালচে হয়।
বনরুই এর সামনের পায়ের নখ পিছনের পায়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ লম্বা হয়। বুক ও পায়ের পাতা ছাড়া পুরো শরীর থাকে আঁশে ঢাকা। আঁশের ফাঁকে ফাঁকে লোম থাকে। নখ দিয়ে এরা পোকার বাসা ভাঙে, গর্ত করে এবং কাঠ চিড়ে খাবার খোঁজে।
চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে হাজারীখিল রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা সিকদার আতিকুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গত দুই বছরে হাজারীখিল বন্যপ্রাণী অভায়রণ্যে বনরুইয়ের দুটি গর্ত দেখেছি। এরা সচরাচর নজরে পড়ে না। মাটিতে গর্ত করে তারা বাসা বাঁধে।
“এখানে যারা পাখির ছবি তুলতে আসেন, তারা দুয়েকবার ছবি পেয়েছেন। তবে অতীতে চট্টগ্রামের দোহাজারি দুধপুকুরিয়া ধোপছড়ি, বান্দরবানের প্রত্যন্ত বেতছড়ি এবং রাঙামাটি জুড়াছড়িতে দায়িত্ব পালন করলেও সেখানে কখনো বনরুইয়ের দেখা পাইনি।”
পঞ্চগড়ে বনরুই পাওয়ার কথা জানিয়ে সিকদার আতিকুর রহমান বলেন, “অতীতে উত্তরবঙ্গে যেসব বনরুই পাওয়া গেছে তার অধিকাংশই সীমান্তের ওপার থেকে আসা। গভীর বনের বাসিন্দা এই প্রাণী সুযোগ পেলে আবার বনে ফিরে যায়।
“এরা অত্যন্ত দ্রুত দৌড়াতে পারে এবং শারীরিক গঠনের কারণে অন্য প্রাণীরা সহজে এদের কাবু করতে পারে না।”
বনরুই এর আঁশ কেরাটিন দিয়ে তৈরি। একই পদার্থ পাওয়া যায় গণ্ডারের শিং এ।

চীন ও ভিয়েতনামে বনরুই এর আঁশ দিয়ে হাঁপানি, বাত ও আর্থ্রাইটিসসহ বিভিন্ন রোগের স্থানীয় ওষুধ তৈরি হয়। এছাড়া বনরুই এর মাংস কোনো কোনো দেশে খাওয়া হয়।
ওয়াইল্ডলাইফ ভেটেরিনারিয়ান ডা. জয়তু কুমার মণ্ডল জানান, সারাবিশ্বে যত প্রাণী পাচার হয়, তার মধ্যে বনরুইয়ের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে চোরা শিকারী এবং বনের বাসিন্দাদের কাছ থেকে অল্প টাকায় বনরুই সংগ্রহ করা হয় পাচারের জন্য।
“পাচারের কারণে বনরুই সারাবিশ্বে এখন বিলুপ্তপ্রায় এক প্রাণী। এখনই সংরক্ষণ করা না গেলে এটি হয়ত হারিয়ে যাবে।”
‘আশার আলো’
মানুষের হাতে পড়ে মরতে বসা বনরুইটি এখন আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে।
সিসিএ‘র ট্র্যাকিং টিম বনে ছাড়া বনরুইটির চলাচল ও বন্য পরিবেশে অভিযোজন পর্যবেক্ষণ করছে।
ডা. জয়তু বলেন, “সারাবিশ্বেই এখন পর্যন্ত বনরুই বিষয়ে তথ্য অপর্যাপ্ত। গভীর বনে গর্ত করে বসবাস করায় এবং নিশাচর হওয়ায় এর জীবন প্রক্রিয়া সম্পর্কে অনেক কিছুই অজানা।
“আগামী ১৮ মাস রেডিও ট্রান্সমিটারটি কাজ করবে। এই পদ্ধতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এতে এই প্রাণির বাসস্থান, খাদ্যাভাস, জীবন প্রক্রিয়া, ওই বনে বনরুইয়ের সংখ্যা সবকিছু নিয়ে বিস্তারিত তথ্য পাব বলে আশা করছি।”

বাংলাদেশে ভারতীয় বনরুই খুবই কম দেখা যায় জানিয়ে তিনি বলেন, এখনো যে দুয়েকটি বনরুই দেখা যায় তা চীনা বনরুই প্রজাতির।
‘প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষাকারী’
পিঁপড়ার বাসা ভেঙে পিঁপড়া ও পিঁপড়ার ডিম খায় বনরুই। এছাড়া উইপোকা, ঝিঁঝিঁ পোকা ও মাছিসহ বিভিন্ন প্রজাতির পোকামাকড় খেয়ে জীবনধারণ করে এই প্রাণী।
ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার (আইএফএডব্লিউ) এর তথ্য অনুযায়ী, বনরুই নিধন জীববৈচিত্র্য এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় মারাত্মক হুমকির কারণ হতে পারে।
বনরুই না থাকলে পিঁপড়া, উইপোকা, ঝিঁঝিঁ পোকা, মাছি এবং অন্যান্য পোকামাকড়ের সংখ্যা অতিরিক্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। যা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে।
আইএফএডব্লিউ বলছে, একটি বনরুই বছরে প্রায় ৭০ মিলিয়ন পিঁপড়া এবং উইপোকা খায়। এই সংখ্যাই বলে দেয় বনরুই কী পরিমাণ ক্ষতিকারক পোকা কমিয়ে প্রকৃতির ভারসাম্য ঠিক রাখে।
পাশাপাশি বনরুই মাটিতে গর্ত করে মাটির বায়ু চলাচল স্বাভাবিক করতেও সহায়তা করে।