Published : 16 Jun 2024, 12:22 AM
দুই দিন বাজার পর্যবেক্ষণের পর অবশেষে পশু বিক্রির ধুম পড়েছে গাবতলীতে। হাসিল ঘরের সামনে শত শত মানুষের ভিড়। একটি গেটে সন্ধ্যায় দেখা গেল মিনিটে তিন থেকে চারটি গরু বের হচ্ছে, যেগুলো নগরবাসী কিনেছেন।
কখনো আবার ভেতর থেকে একটি গাড়িতে কয়েকটি গরু বের হতেও দেখা গেছে।
বিক্রি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গরু এখনও আসছে হাটে। বলা চলে গাবতলী হাট এখন ২৪ ঘণ্টাই সচল।
বিক্রেতারা গত কয়েক দিন অস্বাভাবিক বেশি দাম বললেও এখন দাম অনেকটাই কমাচ্ছেন ফলে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে ব্যবধান কমে আসছে।
সোমবার কোরবানির ঈদের আগে আছে আর একটি দিন। অবশ্য অনেকে ঈদের দিন সকালেও পশু কিনে থাকেন, কিন্তু সেই সংখ্যাটি খুব বেশি না।
বৃহস্পতি থেকে শুক্রবার পর্যন্ত ক্রেতা-বিক্রেতা দুই পক্ষই দাম যাচাইয়ের চেষ্টা করেছেন। বিক্রেতারা একটু বেশি দামই চেয়েছেন এই কয়দিন।
বৃহস্পতিবার যে আকারের গরু দেড় লাখ টাকা দাম চাইতে দেখা গেছে, শনিবার সেই আকারের গরুর দাম হাঁকা হয় এক লাখ ২০ থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এখান থেকে কিছুটা ছাড়ে বিক্রি করছেন। ফলে ক্রেতারাও আগের মত বিরক্ত না হয়ে গরু নিয়ে যাচ্ছেন।
মো. মাহিদুজ্জামান হোসেন বাজার দেখে বলেন, “গতকালের তুলনায় আজকের বাজার কম মনে হল। তাই দাম অনুযায়ী পছন্দসই পেলাম আর কিনে নিলাম। আমার গরু এক লাখ ২৮ হাজার টাকা।”
মগবাজারের বাসিন্দা মো. রিয়াজুদ্দিন শুক্রবার বনশ্রীর মেরাদিয়া হাটে দাম বেশি দেখে গরু কেনেননি। পরের দিন গাবতলীর বাজার দেখে তিনি বলেন, “কয়েকটা গরু দেখছি। দাম গতকালের তুলনায় কমই। আরেকটু দেখি, আরও কমে পাই কি না।”

ক্রেতাদের পাশাপাশি বিক্রেতারাও জানালেন দাম কমার কথা। টাঙ্গাইল থেকে তিনটি গরু নিয়ে এসেছেন রুবেল মিয়া। গতকাল একটি গরুর দাম উঠেছিল সোয়া দুই লাখ। আর আজ দুই লাখের বেশি একটা উপরে উঠছে না।
তিনি বলেন, “গতকাল গরুটা বেইচা দিলেই ভালো করতাম। কাইল যদি না বেচতে পারি, তাহলে বাইত লইয়া যাওয়া আরেক ভোগান্তি। আবার লসের উপরে লস। দেহি আশেপাশে দাম হইলে ছেড়ে দিব।”
দুম্বার দর্শক আছে, ক্রেতা নেই
সোমবারে আটটি দুম্বা নিয়ে গাজীপুর থেকে গাবতলীর হাটে এসেছিলেন আলমগীর হোসেন। প্রথমদিনেই দুই লাখ ৩০ হাজার টাকায় একটা বিক্রি হয়েছে। এরপর পাঁচ দিনে একটিও বিক্রি হয়নি। সাতটি দুম্বা নিয়ে হাটে বসে আছেন তিনি।
গাজীপুরের শ্রীপুরে তাদের খামারে ৬০০ থেকে ৭০০ দুম্বা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন বাজারে তারা প্রাণী পাঠিয়েছে বিক্রির জন্য।
সৌদি থেকে ১০ বছর আগে একটি পুরুষ ও ৯ টি স্ত্রী দুম্বা আনা হয়েছিল। এখন তার খামার আকারে বিশাল হয়ে গেছে।
সাড়ে তিন বছর বয়সের একটি দুম্বার দাম হাঁকা হচ্ছিল সাড়ে তিন লাখ টাকা। বিক্রেতা মো. কামাল হোসেনের দাবি, একশ থেকে ১১০ কেজি ওজন হবে প্রাণীটির।
তিনি বলেন, “শুক্রবার একটা বিক্রি করছি ৩ লাখ টাকায়। আরেকটা নিয়ে বসে আছি এটা বিক্রি হলেই বাঁচি।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে কামাল কথা বলার সময় ১০ থেকে ১২ জন মানুষ দুম্বার পেছনে চাপ দিয়ে মাংসের পরিমাণ দেখছিলেন।
তখন বিক্রেতা মো. সাব্বির নামে একজনকে কামাল বলেন, “সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ এটার গায়ে হাত দিয়ে চাপ দেয়। দুম্বাটার শরীর ব্যথা হয়ে গেছে। আপনারা দেখেন, কিন্তু হাত দিয়েন না।”

মো. সাব্বির বলেন, “আগে কখনও দুম্বা দেখি নাই, আজ প্রথম দেখলাম। জীবনে কখনও কেনা হবে বলে মনে হয় না। দাম অতিরিক্ত বেশি মনে হচ্ছে।”
দাম বেশি হওয়ায় দুম্বা বিক্রি কম হচ্ছে কিনা?- এই প্রশ্নে বিক্রেতা কামাল বলেন, “দুম্বার মাংস পাঁচ হাজার টাকা কেজির উপরে, তাও পাওয়া যায় না। এটার মাংস এতটাই বেশি সুস্বাদু যে খেয়ে দেখলেই বুঝা যায়। আর দুম্বা তো দেশে খুব বেশি না। আরব থেকে আনা। দাম তো একটু বেশি হবেই।”
আছে ভারতীয় গরুও
আগেরদিন খিলক্ষেতের ৩০০ ফিটের মত গাবতলীতেও দেখা মিলেছে ভারতীয় গরুর। এগুলো আকারে অনেক বড়।
ব্যাপারীদের কেউ এনেছেন ২৫ টি, কেউ ৫০ টি, কেউবা তারও বেশি।
টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর থেকে এসেছেন ৮৪ টি গরু নিয়ে এসেছেন দুলাল হোসেন চকদার। তিনি ভূঞাপুরের ৪ নং গোবিন্দাসী ইউনিয়নের চেয়ারম্যানও।
৮৪ টি গরুর মধ্যে ৫০ টি গরু বিক্রি হয়ে গেছে শনিবার সন্ধ্যার আগেই। সর্বনিম্ন তিন লাখ থেকে সর্বোচ্চ ছয় লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে সেগুলো।

গরুগুলো রাজশাহী থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “এক বছর সময়ের মত আগে এগুলো কিনে মোটাতাজা করেছি, এরপর হাটে আনা হল।”
ভারতীয় গরু কীভাবে পেলেন, এই প্রশ্নে তিনি বলেন, “বিভিন্ন সময়ে কৃষক, ছোট ছোট খামারিরা অল্প অল্প করে আনে। এরপর আমরা দুই লাখ, আড়াই লাখ বিভিন্ন দামে কিনে মোটাতাজা করে হাটে আনি। আমরা তো বর্ডার দিয়ে আনি না।”
সাবেক অতিরিক্ত সচিবের পকেটকাটা
হাটে ভিড় বাড়ার পাশাপাশি কেউ মলম পার্টি, কেউবা ছিনতাইকারী আবার কেউ পকেটমারের কবলে পড়ছেন।
সন্ধ্যা সাতটার দিকে গাবতলী হাটের পুলিশের বুথে অভিযোগ নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায় সাবেক অতিরিক্ত সচিব এ এইচ এম আব্দুল্লাহকে। তিনি পকেট মারের খপ্পরে পড়েছেন।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে আব্দুল্লাহ বলেন, “গরু আসছে গরু আসছে বলে বলে পিছন থেকে চিল্লাচিল্লি করছিল। এক পর্যায়ে ভিড় বেড়ে গেল। কিছুক্ষণ পর আমি পকেটে হাত দিয়ে দেখি আমার ৫০ হাজার টাকার একটা বান্ডিল নেই।”
দারুসসালাম থানার ওসি (তদন্ত) জামাল হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মানুষের ভিড় বেড়ে যাওয়ায় দুয়েকটা পকেটমারের ঘটনা ঘটছে। আমরা দেখি ধরতে পারি কি না।”