Published : 27 Aug 2025, 11:27 AM
ঢাকার সদরঘাট এলাকায় এক ব্যক্তিকে ঘিরে ধরে কয়েক তরুণ তার জট বাঁধা লম্বা চুল আর দাড়ি কেটে দেওয়ার কথা বলছিলেন। ওই ব্যক্তি রাজি না হলে তাকে জোরজবরদস্তি করে প্লাস্টিকের টুলে বসানোর চেষ্টা করা হয়।
অনেকটা জীর্ণ পোশাক পরা ব্যক্তিটি তরুণদের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে যারপরনাই চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ‘নাছোড়বান্দা’ তরুণরা তাকে জাপটে ধরে বসিয়ে ট্রিমার দিয়ে চুল কাটা শুরু করলেন, কেটে দিলেন দাড়িও।
ওই ব্যক্তির হাত থেকে একগুচ্ছ ধাতব চুড়ি ‘ফেরত দেওয়ার’ কথা বলে খুলেও নেওয়া হল। গোসল করিয়ে নতুন কাপড় পড়িয়ে দিয়েছেন বটে, কিন্তু সেসব চুড়ি আর ফেরত দেওয়া হল না। ‘ভালো কাজের’ উছিলা দিয়ে ‘ডিভিসি বাংলা’ নামের একটি ফেইসবুক পেইজে পুরো ঘটনার ভিডিওটি প্রচার করা হয়। ভিডিওতে সবসময় এমন ‘ভালো কাজ’ করার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করা হয়।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রচলিত জীবনধারার বাইরের মানুষজনদের এমন ‘জোরপূর্বক’ চুল-দাড়ি কেটে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে, তা আবার ফলাও করে প্রচারও করা হচ্ছে ফেইসবুক-ইউটিউবে।
এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠেছে, কেউ চাইলেই কাউকে ধরে জোর করে চুল-দাড়ি কেটে দিতে পারেন কি না; কিংবা ‘ভিউ বাণিজ্যের’ চেষ্টায় আবার সেসব ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করাটাও কতটা আইনসিদ্ধ?
আইনজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই কারো চুল-দাড়ি কেটে দেওয়াটা ‘ফৌজদারি অপরাধ’। সে ব্যক্তি যেই হোক, এভাবে কারও ব্যক্তিবিশ্বাসের ওপর হস্তক্ষেপ করার অধিকার ‘কারো নেই’।
যারা এটা করছেন তারা ‘ভালো বা মানবিক’ দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করলেও, তাদের মূল লক্ষ্য ‘ভিউ বাণিজ্য’। কারণ, কেউ কিন্তু ওই ব্যক্তিকে পুনর্বাসন করছেন না, শুধু চুল-দাড়ি কেটে দিয়ে ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দিচ্ছেন, যার মাধ্যমে তারা আরেক দফা ‘অপরাধ’ করছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে ‘নজরে এলে’ এ বিষয়ে ‘ব্যবস্থা নেওয়ার’ কথা বলা হচ্ছে। তবে এখনও এমন কোনো বিষয় ‘জানা নেই’ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অপরদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন পেইজ ও চ্যানেলের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে কিনা জানতে চাইলে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে ‘যৌক্তিক কারণ’ দেখিয়ে সুপারিশ যেতে হবে তাদের কাছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ব্যক্তির বিশ্বাস, বা ধর্ম কী পালন করবে, এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। সেটাতে রাষ্ট্রীয়ভাবে যদি কোনো ধরনের নীতি-নৈতিকতার ব্যত্যয় না ঘটে, সেক্ষেত্রে তার মত, ধর্ম বিশ্বাস কিংবা দর্শন— যেটাই তিনি অনুসরণ করতে চান, তাকে সে সুযোগ করে দেবে রাষ্ট্র। কারণ এটা তার সাংবিধানিক অধিকার।”
তার ভাষ্য, চুল কাটার ব্যাপারটা কেবল চুল কাটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। একজনকে চুল কেটে দিয়ে কল্যাণ করার জায়গা থেকে তাকে কিন্তু পুনর্বাসন করছে না। চুল কাটার বিষয়টা আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্নভাবে প্রচার করা হচ্ছে। এগুলো শেষমেশ ‘সংঘবদ্ধ অপরাধের’ পর্যায়েই চলে যাচ্ছে।

কে এই মাহবুবুর, শুরুটা কীভাবে
সদরঘাটের ওই ব্যক্তির চুল কাটার সূত্র ধরে ‘ডিভিসি বাংলার’ খোঁজে নামলে ফেইসবুক পেইজটির নাম পাল্টে ‘আফ্রিদি ভাইয়া’ করা হয়।
সেখানে দেওয়া একটি ফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে একজন বলেন, ভিডিওটি তার চ্যানেলে প্রকাশ করেছেন ঠিকই, কিন্তু যাদের ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে, তার নেতৃত্বে রয়েছেন মাহবুব নামে একজন।
নাম প্রকাশ না করে ‘আফ্রিদি ভাইয়া’ পেইজের ওই ব্যক্তি বলেন, “ভিডিওটি আমার চ্যানেলে দেওয়ার পর আমি অনেক সাড়া পেয়েছি। আশা করছি ভবিষ্যতেও এ ধরনের ভিডিও প্রকাশ করব। আমি শুধু মাহবুব ভাইয়ের ভিডিও শেয়ার করেছি। তিনি এ ধরনের কাজ করেন। এসব কাজ সম্পর্কে তার সঙ্গেই কথা বলেন।”
তিনি মাহবুব নামের ওই ব্যক্তির ‘মাহবুব ক্রিয়েশন' নামে একটি পেইজের লিঙ্ক দেন।
‘মাহবুব ক্রিয়েশন’ নামের ওই পেইজটিতেও দেশের বিভিন্ন এলাকার অসংখ্য ‘বোহেমিয়ান’ মানুষের, অনেক সাধু-সন্ন্যাসী, বাউল-ফকিরের চুল-দাড়ি কাটার ভিডিও রয়েছে। যেগুলো খুব ফলাও করে প্রচার করার পাশাপাশি এ ধরনের ‘ভালো কাজ’ করার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন মাহবুব নামের ওই ব্যক্তি।
এ বিষয়ে কথা বলতে পেইজটিতে একাধিকরা মেসেজ করা হলেও কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে সোমবার সদরঘাটে কাউছার আলম নামে একজনের সঙ্গে কথা হয় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের, যিনি ফোনে ছবি দেখে মাহবুবের দলবলকে শনাক্ত করেন।
নিজেকে সুস্থ দাবি করে কাউছার বলেন, “ওরা জোর করে আমার চুল-দাঁড়ি কেটে দিছে। আমি বাধা দিবার পারি নাই। তবে এর বেশি কিছু করেনি। ভিডিও করে নিয়া গেছেগা।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম কাউছারের ছবি তুলতে চেয়েছিল, কিন্তু তিনি রাজি হননি।
মাহবুবুর রহমানের পেইজে দেওয়া একটি ওয়েবসাইটে নিজের সম্পর্কে কিছু কথা ‘জীবন বৃত্তান্ত’ আকারে লিখেছেন তিনি। নিজেকে সফল কনটেন্ট ক্রিয়েটর দাবি করে তিনি বলেছেন, তার নাম মাহবুবুর রহমান। ডাক নাম মাহবুব সরকার। তার বাবার নাম সামছুল আলম। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা জেলার মনোহরগঞ্জ উপজেলার বাইশগাঁও গ্রামে।
স্থানীয় পঞ্চগ্রাম স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মাধ্যমিক পাস করেন তিনি। এরপর ২০২০ সালে পড়াশোনার তাগিদে উচ্চ মাধ্যমিকে এসে ভর্তি হন ঢাকা উদ্যান সরকারি কলেজে।
মাহবুব লিখেছেন, “ঢাকা আসার পর থেকে রাস্তার এই মানুষগুলোকে দেখে ভিতরে একটা মায়া কাজ করত। তাদের কাছাকাছি যেতাম। তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করতাম। ২০২১ সালে আমার ভিতরে এই মানুষগুলোকে নিয়ে ভাবনা শুরু হয়। তাদের জন্য কিছু একটা করার আগ্রহ বাড়তে থাকে।”
তার ভাষ্য, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পাঁচ শতাধিক মানুষকে তারা ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন’ করেছেন। ২৭ জনকে পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দাবিও করেছেন তারা।
ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, তার দলে মাহফুজ, সৌরভ দাশ ও প্রিতম শর্মা নামে তিনজন কাজ করেন।
তবে এসব তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। ফোনে এবং হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করলে, এমনকি পরিচয় জানিয়ে কথা বলার জন্য বার্তা পাঠানো হলেও মাহবুব সাড়া দেননি।
এই প্রতিবেদন প্রকাশের একদিন পর বৃহস্পতিবার মাহবুবুর রহমান যোগাযোগ করেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে। তিনি বলেন, “সদরঘাটের ওই ব্যক্তির দাড়ি আমরা কাটিনি। গোঁফ কেটে দিয়েছি। তার ধাতব চুড়িগুলোও তাকে ফেরত দিয়েছি।
“আমরা অবশ্যই এটাকে ভালো কাজ মনে করি। এটা মোটেই হেনস্তা নয়।”
তবে মাহবুবুর রহমানদের ভিডিওতেই দেখা যাচ্ছে হেনস্তার শিকার লিটন সাধু নামের ওই ব্যক্তির লম্বা দাড়ি ছেঁটে দেওয়া হচ্ছে। ওই ঘটনার পর লিটন সাধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেছেন তার ধাতব চুড়িগুলো ‘হেনস্তাকারীরা’ নিয়ে গিয়েছেন। যার দাম প্রায় আড়াই লাখ টাকা, যেখানে ৫০ ভরি রুপা আছে।

‘ভালো কাজই’ করছেন তারা
একই ধরনের কাজ করা ‘হিউম্যান সার্ভিস বাংলাদেশ’ নামে একটি পেইজের সূত্র ধরে মাওলানা মুফতি সোহরাব হোসাইন নামে একজনের খোঁজ পাওয়া যায়। যার ভাষ্য, ‘মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে’ দেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে অনেক মানুষকে ‘পরিষ্কার’ করে দিয়েছেন।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার বাসার পাশেই একটা লোক ছিল খুব কষ্টে, ভাবলাম এই লোকটাকে পয়পরিস্কার যদি কেউ করত, তাহলে লোকটা কত শান্তি পাইতো বা আরাম পাইতো। পরবর্তী সময়ে আমরা ফেইসবুকে এমন কয়েকটা ভিডিও দেখি। তখন ভাবি, ওরা করতে পারলে আমরা কেন করতে পারব না? ওখান থেকেই এটা শুরু করা।”
তার মতে, যাদের ‘পরিষ্কার’ করেছেন, তারা ‘স্বাভাবিক নন’। তাদেরকে গোসল করানোর পরে ‘যে শান্তি অনুভব’ করেন, তারা পরে হাত তুলে ‘দোয়াও করেন’। প্রথমে ‘পরিষ্কার করতে’ দিতে না চাইলেও পরে ‘আনন্দিত হয়ে যায়’।
এ ধরনের কাজ অব্যাহত রয়েছে কি-না জানতে চাইলে মাওলানা মুফতি সোহরাব হোসাইন বলেন, “আমাদের চ্যানেলটাতে একটু প্রবলেম হইছে, এটা কাজ চলতেছে একমাস ধরে। চ্যানেল ঠিক করলে আবার শুরু করব।”
তাহলে প্রচার করে আয়ের উদ্দেশেই এমনটি করছেন কি-না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “বিষয়টা এরকম না। আমাদের সাথে দুই একজন লোক লাগে। এমনতো না যে, আমাদের দুই একজন ডোনার আছে। এটা সেবামূলক, সম্পূর্ণ নিজের উদ্যোগে এবং নিজের ভালো লাগা থেকে করা।
“কিন্তু এককভাবে তো এটা করা সম্ভব নয়। আমি একজনকে নিয়ে যাব, হাতখরচটা তো কমপক্ষে দিতে হবে। অন্তত তিন-চারজন লোক লাগে। চ্যানেল থেকে ইনকাম করে আমরা সংসার চালাই এমন না। এখান থেকে যে আয়টা হয়, এটা আমরা অসহায় মানুষদের পেছনে খরচ করতাম। আমাদের যাতায়াত খরচের বিষয় আছে। আমাদের কাজ চলমান আছে, আশা করি চ্যানেলটা ব্যাক আসবে।”
এর মাধ্যমে কারো ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হয় কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সে একটা মানুষ, হয়ত তার একটা সুন্দর জীবন ছিল। সেখান থেকে কোনো না কোনো কারণে লাইনচ্যুত হয়ে পাগলের মতো ঘুরে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে কাজটা করি। আমরা তো অনেকের মতো থাকতে পারতাম যে, ও আছে ওর মতো থাকুক।”
যে কোন দৃষ্টিকোণ থেকেই ‘জোরাজবরদস্তি’ করা যায় কিনা জানতে চাইলে তার ভাষ্য, “সব ক্ষেত্রে আসলেই জোরাজোরি করা ঠিক না। অনেক সময় জবরদস্তি করতে হয়, আবার অনেক সময় বললেই তারা হাসি দিয়ে বলে কেটে দেন। তারা একটা সেলুনে যাবে, সেটাও তো পারে না। এভাবেই তাদের দিন কেটে যায়। কিন্তু তারা চুল-দাড়ি কাটতে চায়। কিছু লোক আছে খুব জোরাজুরি করতে হয়। কিন্তু জোরাজুরির পরেও তাদের অনুভূতিটা আপনার খেয়াল করতে হবে।”
এমন কাজ করতে সরকারি কোনো দপ্তরের অনুমতি নেওয়া হয়েছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “পারমিশন অবশ্যই লাগে। আমরা কথা বলেছি, কিন্তু যাদের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা বলেছে দলীয় সরকার আসুক, তারপর ইনশাল্লাহ হয়ে যাবে।”
‘ভালো কাজের’ যুক্তি কতটা যৌক্তিক?
আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, “এরা চুল কেটে দিচ্ছে তাদের একটা নিজস্ব বিশ্বাসের জায়গা থেকে, যেটা তাদের এখতিয়ার নাই। ওই ব্যক্তির কোনো দায়িত্ব নেবেন না, পুনর্বাসন করবেন না। যদি ধরে নেই, ব্যক্তিটার চালচলনের জায়গা থেকে তাকে পুনর্বাসন করবেন, তাহলে সেটারও না হয় একটা অর্থ দাঁড়ায়। কিন্তু কেবল সাধক, ফকির বা সন্ন্যাসীদের চুল কেটে দেওয়া আদর্শিক জায়গা থেকে কারও এখতিয়ার নাই। সংবিধান কাউকেই হস্তক্ষেপ করার এখতিয়ার কাউকে দেয় নাই।”
এ ধরনের কাজকে ‘ক্রিমিনাল অফেন্স’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমি চুল লম্বা রাখব না ছোট রাখব, না আদৌ রাখব না, সেটা তো আমার সিদ্ধান্ত। এখানে রাষ্ট্রেরও হাত দেওয়ার সুযোগ নাই।
“ক্রিমিনাল অফেন্সের জন্য যেমন এদের পানিশম্যান্ট হওয়া উচিত। মানুষকে অবমাননাকর পানিশমেন্ট রাষ্ট্রও দিতে পারবে না, বলা আছে সংবিধানে। সে জায়গায় ব্যক্তি যখন কাউকে চুল কেটে দিচ্ছে, দাড়ি কেটে দিচ্ছে, তখনতো আসলে দণ্ডই তাকে দিচ্ছে। ফেইসবুক বা ইউটিউব ব্যবহার করে যে প্রচার-প্রচারণা, সেটাতে কিন্তু আরেকটা লেবেলের হেনস্থার ঘটনা ঘটছে।”
এদেশে বিভিন্ন সময় বাউলদেরও চুল কেটে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে, পক্ষান্তরে রাষ্ট্রযন্ত্র ‘পুরোটাই নীরব’ দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে বলেও মন্তব্য করেন এ আইনজীবী।
পুরান ঢাকায় এক ব্যবসায়ী ব্যক্তির চুল কেটে দেওয়ার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখেছেন দাবি করে তিনি বলেন, “একজন ব্যবসায়ী, তিনি আবার সাধক। সেটাতো বাধা নাই যে, সাধক হলে ব্যবসা করতে পারবে না। তিনি বেশ পড়াশোনা জানা মানুষ, তাকেও ধরে চুল কেটে দিয়েছে।”
এই চুলকাটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না এটা; আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্নভাবে প্রচার-প্রচারণা করা হচ্ছে। এতে উৎসাহী হয়ে সারা দেশ থেকে বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে খবর পেলেই ওই গ্রুপকে খবর দিচ্ছে বলেও ভাষ্য তার।
“খবর দেওয়া হচ্ছে অমুক জায়গায় একটা পাগল আছে, তাকে ধরতে হবে; তমুক জায়গায় একটা সাধক আছে তাকে ধরতে হবে; ধরে চুল কটে দিতে হবে।”

আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ কিছু শিক্ষার্থীর
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ ধরনের বেশ কিছু ঘটনা প্রচার হওয়ার পর ভুক্তভোগীদের পক্ষে আইনি লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী। তারা ‘যেকোনোভাবেই’ হোক, এমন ঘটনার অবসান চান।
এদের একজন নবীন কিশোর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা ভিডিওগুলা খুব ভালো করে খেয়াল করার চেষ্টা করি যে, কী ধরনের উদ্দেশ্যে তারা কাজ করছেন। প্রথমে ভিডিওগুলা দেখে মনে হয়েছে, তারা যখন যায়, নিজেদেরকে তরুণ বলে উপস্থাপন করে। গণঅভ্যুত্থানের পরে তরুণদের একটা ভালো ফেইস ভ্যালু তৈরি হয়েছে।”
তারা সেই ‘সুযোগটা’ ব্যবহার করছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “রাস্তার পাগল বা ফকির-দরবেশ, যারা সুফিবাদী তরিকায় বিশ্বাস করেন, এরা হচ্ছে মূল টার্গেট। ওদের যে ভিডিও ক্যাপশন, মনে হয়েছে এটা সম্পূর্ণভাবে একটা ভিউ ব্যবসা। আজ যদি একটা মানুষের চুল বড় থাকে, তার যদি চুল কেটে দেয়। আগামীকাল একটা মানুষের মাথায় চুল না থাকলে আলকাতরাও দিয়ে দিতে পারে। একজন নারী যদি তথাকথিত ‘শালীন’ পোশাক না পরে তাকে হেনস্তা করতে পারে। তাদের উদ্দেশ্য, এটা প্রচার করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে আয় করা।
“আরেকজনকে সামাজিকভাবে হেনস্তা করে আয় করা, এটাতো ভালো বিষয় না। তখন আমরা এই জায়গা থেকে উদ্যোগটা নেই, আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা ভিকটিমদের পক্ষে আইনি লড়াইটা লড়তে চাই। এ ব্যবস্থা যেন গায়েব হয়ে যায়; যেন কেউ কাউকে হেনস্তা করার আগে দুবার ভাবে।”
ব্যবস্থা নেবে কে?
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া মনে করেন, রাষ্ট্রের ‘প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ’ পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা আছে বলেই ঘটনাগুলো একের পর এক ঘটে যাচ্ছে। প্রথম ঘটনা ঘটার পরে যদি ব্যবস্থা নিতেন, গ্রেপ্তার করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতেন, তাহলে দ্বিতীয় ঘটনাটাই ঘটত না।
গত কয়েক বছর ধরে ঘটনাগুলো ‘প্রতিনিয়ত ঘটে যাচ্ছে’ এবং দিনের পর দিন অন্যরা ‘উৎসাহী হচ্ছে’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সুনির্দিষ্টভাবে নির্দেশনা পাঠাতে পারে সংশ্লিষ্ট থানাগুলোকে। এ ধরনের ঘটনা দেখলেই যেন সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা হয়। দুই একটা যদি নজির সৃষ্টি করতে পারে শাস্তি দিয়ে, তাহলে কিন্তু ‘অটোমেটিক’ বন্ধ হয়ে যাবে।
“যখন মেসেজটা যাবে, চুল কেটে দেওয়ার কারণে জেল হয়েছে। তাহলে কিন্তু আর কেউ চুল কাটার জন্য ব্যক্তিগত স্পেসে হস্তক্ষেপ করার জন্য দৌড়াবে না।”
এই আইনজীবী আরও মনে করেন, এদেরকে প্রতিরোধ করতে হবে রাষ্ট্রীয়ভাবে। যিনি যে ‘স্পিরিচুয়ালিটি’ নিয়ে থাকতে চান, তাকে তার মতো থাকতে দিন, আপনি হস্তক্ষেপ করবেন না। এটাই আইনি এবং সাংবিধানিক অবস্থান।
সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী শাহদীন মালিকও মনে করেন, এ ধরনের ঘটনা ‘সম্পূর্ণ অপরাধ’।
তিনি বলেন, “আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যদি আমার হাত ভেঙে দেন, এটা অপরাধ হবে না? চুলও আমার শরীরের অংশ। এটার জন্য ফৌজদারি মামলা হয়ে শাস্তি হতে পারে।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারের বিষয়টি নিয়েও ভুক্তভোগী কেউ বা তাদের পক্ষে চাইলে ‘মানহানির ক্ষতিপূরণ’ চেয়ে মামলা করতে পারেন বলেও মত দেন তিনি।
‘ভিউ বাণিজ্য’ করা পেইজ-চ্যানেলগুলোর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছে এ ধরনের পেইজ ও চ্যানেলগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে কিনা, তা জানতে চাওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটা আমাদের কাজ না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কথা বলেন, এগুলা যেহেতু ক্রাইম, তারা দেখবেন। আমরা পলিসি তৈরি করি। আপনারা পুলিশের সঙ্গ কথা বলেন, তারা কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে কি না।”
তিনি বলেন, যেসব পেইজ বা চ্যানেল বন্ধ করা হয়, সেগুলোর সুপারিশ পুলিশ বা সরকারের অন্য দপ্তর থেকে তাদের কাছে প্রথমে যেতে হয়।
“ওরা যখন সাব্যস্ত করে, তখন আমরা এক্সিকিউট করি। আমরা হচ্ছি প্রযুক্তিগত প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে, কিন্তু শনাক্ত করে দেওয়ার অথরিটি আলাদা। বিটিআরসিকে কিছু জানাবে কিনা, ওই অথরিটি ভালো জানবে।”
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, “পুলিশ যদি রেফারেন্স দিয়ে যৌক্তিকভাবে বলে, তার পরের বিষয়টা আমাদের। কারিগরি সক্ষমতা আমাদের, কিন্তু আইনগত বিষয়গুলো তাদের।”
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি সাইবার ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশনস বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলামের মতে, এ ধরনের কাজ ‘অপরাধ’ হলেও এমন কোনো বিষয় তাদের নজরে আসেনি।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সামাজিকভাবে হেয় করা, এটা তো অবশ্যই মানহানি এক ধরনের। এমন ঘটনা আমাদের নজরে এলে ব্যবস্থা নিই। কিন্তু এমন কোনো ঘটনা এখনও আমাদের নজরে আসেনি; আমরা দেখিনি।”