Published : 06 Jun 2025, 12:16 AM
ঈদের দুদিন আগে সড়ক পথে ঢাকা ছেড়ে যাওয়া ঘরমুখো হাজারো মানুষ যানজটের ভোড়ান্তিতে পড়েছেন।
বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া লম্বা ছুটির প্রথম দিনে বৃষ্টি, যানবাহনের চাপ, যানবাহন বিকল ও খানাখন্দের কারণে বিভিন্ন মহাসড়কের নানা জায়গায় তীব্র যানজটে দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে হয় যাত্রীদের।
পথে পথে যানজটে আটকে থাকায় ঢাকার টার্মিনালগুলোতে দূর পাল্লার বাস পৌঁছতে পারেনি সময়মত। যে কারণে মানুষকে টার্মিনাল ও সামনের সড়কে দাঁড়িয়ে-বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতে হয়।
ট্রেনে যাত্রীদের বাড়তি চাপেও দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে রেলপথের যাত্রীদের।

সড়ক পথে যানজট
এবার ঈদযাত্রা শুরুর প্রথমদিকে মহাসড়কে তেমন যানজটের খবর পাওয়া যায়নি। তবে বুধবার দুপুরের পর ঘরমুখো মানুষের ভিড় বাড়ে, যানবাহনের চাপ বাড়ে বিভিন্ন মহাসড়কে।
এতে সাভার থেকে নবীনগর বাইপাইল হয়ে চন্দ্রা, টঙ্গী থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা, গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত সড়কে যানজট সৃষ্টি হয়।
এছাড়া অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ এবং সড়কের বিভিন্ন অংশে যানবাহন বিকল হওয়ায় বুধবার রাত থেকেই চন্দ্রা থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়।
তীব্র যানজটের পাশাপাশি প্রচন্ড রোদের পর বৃষ্টিতে দুর্ভোগে পড়েন মানুষ। কাপড়সহ অনেকের টাকা, মোবাইল ও মালামাল ভিজে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষদের ভোগান্তি ছিল বেশি।
ঢাকা থেকে রংপুরগামী নাবিল পরিবহনের যাত্রী আশিকুর রহমান বলেন, এবার ঈদের আগে ছুটি পড়েছে কম। এ কারণে একসঙ্গে অনেক মানুষ বাড়ির পথ ধরেছে। এতে চাপ বেড়েছে।
“প্রতিটি সড়কেই গরুর হাট, গরুবাহী ট্রাকসহ নানা যানবাহনের চাপ বেশি ছিল। এবার ঈদের আগে একদিনে সরকারি অফিস, তৈরি পোশাক কারখানার ছুটি হয়েছে। ফলে সবাই একসঙ্গে বাড়ির পথ ধরেছে। এতে রোজার ঈদের চেয়ে এবার মানুষের ভোগান্তি বেশি হয়েছে।”
ঢাকার একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা নাজমুল আলম বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সকালে ঢাকার মগবাজার থেকে একটি ভাড়ার মাইক্রোবাসে করে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে টাঙ্গাইলের মধুপুর রওনা হন তিনি। তবে সাড়ে তিন ঘণ্টার ওই পথটুকু পাড়ি দিতে সময় লেগেছে সাত ঘণ্টার বেশি।

নাজমুল আলম বলেন, তিনি যানজট এড়াতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কিছু অংশ এড়িয়ে গেছেন।
“আমরা চন্দ্রার যানজট এড়ানোর জন্য নবীনগর, ধামরাই, কালামপুর হয়ে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে গিয়ে হাইওয়েতে উঠি। সেখান থেকে টাঙ্গাইল বাইপাস, এলেঙ্গা হয়ে মধুপুর হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু করটিয়া থেকেই যানজটে পড়লে ওইদিক থেকে ভেতরের একটা রাস্তা ধরে যাওয়া শুরু করি। গ্রামের বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে ঘুরে কালিহাতি উঠে সেখান থেকে মধুপুর গেছি।”
ঈদের ছুটিতে সন্তানদের নিয়ে দিনাজপুরের গ্রামের বাড়ির পথে রওনা হয়েও যানজটের কারণে ফিরে এসেছেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, নিজের গাড়িতে বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১১টায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসা থেকে বের হন তিনি। উত্তরা থেকেই যানজটে পড়েন। দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থেকে গাজীপুরের ভোগড়া থেকে ঘুরিয়ে বাসায় চলে আসেন তিনি।
“বাসা থেকে বের হওয়ার পর উত্তরা থেকেই যানজটে পড়ি। তারপরও একটু একটু করে এগিয়েছি। এরমধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে খবর নিচ্ছিলাম, জানতে পারলাম গাজীপুর চৌরাস্তা, চন্দ্রা, টাঙ্গাইল, যমুনা সেতুতে যানজট। সঙ্গে বাচ্চারা আছে, দীর্ঘ সময় যানজটে গাড়ি চালানোর সাহস করিনি। ভোগড়ার দিকে গিয়ে একটা ইউটার্ন পেয়ে ফিরে এসেছি। বাসায় এসেছি ৫টার দিকে।”
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় তীব্র যানজট তৈরি হয়। গাজীপুরের শ্রীপুরের গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি এলাকা থেকে ময়মনসিংহের ভালুকার সিডস্টোর-আমতলী পর্যন্ত ময়মনসিংহ লেনে এই যানজটে আটকে থাকার কথা জানিয়েছেন ইমাম পরিবহনের চালক হাতেম আলী।
ঢাকা-শেরপুরের পথে চলাচলকারী এই চালক বলেন, “দিনভর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে থেমে থেমে যানবাহন চলেছে। সারাদিনে থেমে থেমে তৈরি হওয়া যানজট পর্যায়ক্রমে বড় আকার ধারণ করেছে। অন্য চালকদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি, কথা বলছি, তারা তীব্র যানজটের মধ্যে পড়েছেন।”

ঢাকা থেকে যাওয়ার পথেও যানজট, ফেরার পথেও যানজটে পড়তে হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন পরিবহনের চালকরা।
ঢাকা থেকে নওগাঁর শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের চালক আবদুল আলীম বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বুধবার রাত ৮টায় বাস নিয়ে ঢাকা ছাড়েন তিনি। নওগাঁ গিয়ে যাত্রী নামিয়ে আবার যাত্রী তুলতে ৩০ মিনিট সময় লেগেছে। এছাড়া বাকি সময় রাস্তায় ছিলেন তিনি।
“যাওয়ার পথে সড়কের বিভিন্ন জায়গায় যানজট। আবার ফেরার পথেও যানজট। সকালে রওনা হয়ে সন্ধ্যা ৭টা বাজল ঢাকায় আসতে। পুরা সময় রাস্তায়। যারা কয় এইবার সড়কে ভোগান্তি নাই তাদের বলেন ঢাকা-টাঙ্গাইল সড়ক ঘুরে আসতে।”
মহাসড়কের বিভিন্ন জায়গায় যানজটের কারণে মহাখালী টার্মিনালেও বাস আসতে পারেনি। যে কারণে ঢাকার মহাখালী টামির্নালে বাস ছিল।
বৃহস্পতিবার বিকালে টার্মিনালের সামনের সড়ক, টার্মিনাল ভবন এবং ফাঁকা জায়গায় হাজারো নারী-পুরুষ ও শিশুকে বাসের অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায়। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে অনেকেই ব্যাগের ওপর বা নিচে কাগজ বিছিয়ে বসে পড়েন।
মহাখালী থেকে ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ, জামালপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইল এবং উত্তরবঙ্গের কয়েকটি রুটের বাস চলাচল করে।
নেত্রকোণায় যাওয়ার জন্য টার্মিনালে এসেছিলেন শাকিল আহমেদ নামে এক যাত্রী। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “কোনো গাড়ি নাই। প্রায় তিন ঘণ্টার মত এখানে দাঁড়িয়ে আছি। তারা বলে গাড়ি জ্যামে আছে। কিন্তু শুনেছি তারা ভাড়া বেশি নেওয়ার জন্য গাড়ি ছাড়তেছে না।”
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে আসা রাজিয়া আকতার নামে এক নারী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ইউনাইটেড পরিবহনের বাসের টিকেটের জন্য কাউন্টারের সামনে দুপুর ২টা থেকে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। কিন্তু সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত টিকেট পাননি।
“টিকেট দেওয়া বন্ধ করে দিছে। তারা বলে আসতে দিরং হইতেছে, রাস্তায় নাকি জ্যাম।”

ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটের ইউনাইটেড পরিবহনের বাসের চালক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ময়মনসিংহ থেকে ফেরার পথে বিভিন্ন জায়গায় যানজট। এ কারণে বেশিরভাগ বাস টার্মিনালে আসতে পারেনি।
বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স এসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শুভঙ্কর ঘোষ রাকেশ বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, শুরুর দিকে সড়কে তেমন ঝামেলা ছিল না, যানজটও ছিল না। তবে বুধবার থেকেই সড়কের বিভিন্ন অংশে যানজট দেখা দেয়।
“বিশেষ করে সাভার, বাইপাইল, চন্দ্রা এলাকায় যানজট ছিল বেশি। এ কারণে যাত্রীদের ভোগান্তি হয়েছে। তবে আমাদের ট্রিপগুলো আমরা যানজটের কথা মাথায় রেখেই শিডিউল করেছি। এ কারণে শিডিউল নিয়ে কোনো ঝামেলা হয়নি।”
ঢাকা থেকে হবিগঞ্জ যাচ্ছিলেন ব্যাংক কর্মকর্তা রাসেল আহমেদ; ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের মাধবদী, নরসিংদী, ইটাখোলায় ছোট ছোট যানজট পেরিয়ে গেলেও তার ভোগান্তি চরমে ওঠে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত গাড়িতে আশুগঞ্জে পৌঁছানোর পর তার ৫ কিলোমিটার রাস্তা পার হতে লেগে গেছে দুই ঘণ্টার বেশি। আশুগঞ্জ থেকে বিশ্বরোড পর্যন্ত প্রায় সময়ই চরম যানজট লেগে থাকে।
“এই জায়গার রাস্তা বছরের পর বছর একইরকম খানাখন্দে ভরা দেখি। রাস্তার সংস্কার চলছে তো অনেক দিন ধরে। এই কাজ কবে শেষ হবে।”
বেহাল সড়কে ঈদযাত্রায় ভোগান্তিতে পড়েন ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট, সুনামগঞ্জের ঘরমুখো মানুষেরা।

ভিড়ে উধাও ট্রেনের স্বস্তি
এ বছর গত ৩১ মে থেকে ট্রেনে ঈদযাত্রা শুরু হয়। বুধবার পর্যন্ত সময়সূচি মেনে ট্রেনগুলো ছেড়ে গেছে। ট্রেনে খুব বেশি ভিড়ও ছিল না। তবে বুধবার দুপুরের পর থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলোতে যাত্রীদের চাপ বাড়তে থাকে।
বিনা টিকেটের যাত্রী ঠেকাতে বুধবার পর্যন্ত কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে নিরাপত্তাকর্মীদের কড়াকড়ি ছিল। তবে বৃহস্পতিবার তা আর ধরে রাখতে পারেনি রেলওয়ে।
স্ট্যান্ডিং টিকেটের যাত্রীদের পাশাপাশি টিকেটবিহীন যাত্রীরা আসায় কমলাপুর থেকেই বিভিন্ন ট্রেনের ছাদে যাত্রীরা উঠেছে। এরপর বিমানবন্দর, টঙ্গী আর জয়দেবপুর স্টেশন থেকে যাত্রী ওঠায় ট্রেনগুলোয় ছিল যাত্রীতে ঠাসা।
বৃহস্পতিবার গাজীপুরের টঙ্গী স্টেশনে দেখা গেল, ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া প্রতিটি ট্রেনের ছাদে শতশত যাত্রী, ইঞ্জিনের সামনে পেছনে প্রচুর যাত্রী। বেশিরভাগ যাত্রী উঠেছেন বিমানবন্দর স্টেশন থেকে। এছাড়া টঙ্গী স্টেশনে যেসব ট্রেন থামে সেগুলোতে যাত্রী উঠেছে।
ঢাকা থেকে একতা এক্সপ্রেস ট্রেনে পাবনার ঈশ্বরদীর যাত্রী আরিফুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, একতা এক্সপ্রেস ট্রেন নির্ধারিত সময়েই কমলাপুর ছেড়েছে।
“ট্রেন ছিল ১০টা ১৫ মিনিটে, তা ঠিক সময়েই ছেড়েছে। কিন্তু ট্রেনে বিভিন্ন স্টেশন থেকে অনেক মানুষ উঠেছে। এ কারণে ট্রেন আস্তে চলেছে বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। আমরা নির্ধারিত সময়ের দুই ঘণ্টা পর ঈশ্বরদী এসেছি।”
আরেক যাত্রী আরিফুজ্জামান সুমন বলেন, আগে টিকেট কিনেও ভিড়ের কারণে মানুষ ট্রেনে উঠতে পারত না। এবার সেটা একটু কমলেও কমলাপুর থেকেও ট্রেনের ছাদে মানুষকে উঠতে দেখা গেছে।
“প্রত্যেক বগিতে ২৫ শতাংশ স্ট্যান্ডিং টিকেট থাকার কথা। দেখা গেছে প্রতিটি বগিতে ১০০ জন লোক দাঁড়িয়ে আছে। আমরা কমলাপুরে গেলাম যেন আরামে উঠতে পারি। সেখানে কীভাবে বাইরের লোক চলে গেল, ছাদে উঠল? অথচ তিন দফা বাইরে থেকে ভেতরে ঢুকলো। ব্যবস্থাপনা শেষ দিকে আর ঠিক থাকেনি।”
আরও পড়ুন:
ঈদযাত্রা: আশুগঞ্জ-বিশ্বরোডে যানজটে দুর্ভোগ চরমে
ঢাকা-ময়মনসিংহের পথে গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি থেকে সিডস্টোর পর্যন্ত তীব্র যানজট