Published : 29 Apr 2026, 07:21 PM
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল-জামুকা আইন সংশোধন করে বীর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ধারণের প্রসঙ্গ টেনে সংসদে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেছেন, এর মধ্য দিয়ে একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধীরা কারা ছিল, তা ‘প্রতিষ্ঠিত’ হয়ে গেছে’।
বুধবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এক কথা বলার পাশাপাশি বিরোধীদলীয় নেতা ও বিরোধী দলের সদস্যদের ধন্যবাদ জানান।
মন্ত্রী বলেন, জামায়াতে ইসলামী এ আইনের ‘কার্যত বিরোধিতা করেনি’ এবং এনসিপির পক্ষ থেকেও লিখিত ‘অনুসমর্থন’ এসেছে।
গেল ৯ এপ্রিল সংসদে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আহমদ আজম খান ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল সংশোধন বিল, ২০২৬’ অবিলম্বে বিবেচনার প্রস্তাব তোলেন। পরে কণ্ঠভোটে তা গৃহীত হয়। দফাওয়ারি অনুমোদনের পর বিলটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা এ অধ্যাদেশে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’, ‘মুক্তিযুদ্ধ’, ‘মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের সহযোগীর’ সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণ করা হয়। সেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর দেশীয় সহযোগীদের তালিকায় তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টির নাম রাখা হয়েছিল।
অধ্যাদেশটি আইন আকারে পাস করার সুপারিশ করেছিল সংসদের বিশেষ কমিটি। ওই কমিটির প্রতিবেদনে জামায়াতের সদস্যরা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছিলেন। সংসদে শফিকুর রহমানের বক্তব্যেও সেই আপত্তির প্রতিফলন দেখা যায়।
জাতীয় সংসদের বুধবারের অধিবেশনে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, “আমি বিরোধীদলীয় নেতাসহ বিরোধীদলীয় সকল সংসদ সদস্যকে ধন্যবাদ জানাতে চাই।”
ধন্যবাদ দেওয়ার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “বীর মুক্তিযোদ্ধার যে সংজ্ঞা নির্ধারিত করা হয়েছে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন, ২০২৬-এর সেই সংশোধনীতে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের যে সমস্ত দামাল ছেলেরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর তৎকালীন মুসলিম লীগ, তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী, তৎকালীন নেজামে ইসলামী এবং আল বদর, আল শামস বাহিনী, রাজাকারদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলেন, তাদেরকে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যে আইন এই সংসদে পাস হয়েছে, সে আইনে জামায়াতে ইসলামী বিরোধিতা করেনি কার্যত।”
ঝিনাইদহ-১ আসনের এই সংসদ সদস্য বলেন, “সে আইনে এনসিপির পক্ষ থেকে লিখিতভাবে অনুসমর্থন জানানো হয়েছে। এই কারণে তাদেরকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।”
এরপর এই আইনের রাজনৈতিক তাৎপর্যের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আইনের কার্যকরিতায় এবং ব্যাখ্যায় তাহলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল যে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে কারা বিরোধিতা করেছিলেন, কারা খুন, গুম, ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, কারা বাংলাদেশের অগণিত অসংখ্য মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।”
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও টানেন আসাদুজ্জামান।
তিনি বলেন, “আমরা যারা আজকে এই সংসদে দাঁড়িয়েছি, আজ থেকে প্রায় দুই বছর আগে আমাদের এবং ওনাদের জায়গা এক ছিল। আমরা নির্যাতিতের পক্ষে ছিলাম।
“এই বাংলাদেশ দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। এক ভাগে ছিল ফ্যাসিস্টরা। গুটি কয়েক লুটেরা, গুটি কয়েক খুনি; আরেকদিকে ছিলাম আমরা সবাই।”
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান নামে পরিচিত সেই রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রসঙ্গ টেনে আইনমন্ত্রী বলেন, এই সংসদ এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চায়, যেখানে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে এগিয়ে যাওয়া যাবে।
তবে বিরোধী জোটের একটি প্রচারপত্রের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সেখানে ‘জুলাই সনদ’-এর কথা নেই।
আসাদুজ্জামান বলেন, “গতকাল জাতীয় সংসদে একটি লিফলেট পেলাম। সেই লিফলেটে, ওনারা ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে একটি লিফলেট দিয়েছেন-‘বিরোধী দল কেন সংস্কার চায়’। সেখানে কয়েকটি পয়েন্ট দিয়েছেন। এসব পয়েন্টের মধ্যে কোথাও জুলাই সনদের কথা বলা নাই।”
তার দাবি, প্রচারপত্রে গণভোটের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তবে সেখানে জুলাই সনদ থেকে তারা সরে গেছেন।
‘এটি সংবিধান ও আইনের সঙ্গে প্রতারণা’-এ কথা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, “এখানে কোথাও জুলাই জাতীয় সনদ, যেটা ৩৩টি রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করেছিলেন, তার কোথাও নাম-চিহ্ন এখানে নাই।”
এই অবস্থাকে ‘অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং দুঃখজনক’ বলে বর্ণনা করেন তিনি।
সংসদে দেশের অনেক বিষয় বাদ দিয়ে ‘গণভোটের চারটি প্রশ্ন’ নিয়ে আলোচনা চলছে, এ কথা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, “গণভোটে চারটি প্রশ্ন ছিল। তার সাড়ে তিনটি প্রশ্নের ব্যাপারে বিএনপির কোন আপত্তি কখনো ছিল না। বাকি অর্ধেক যে প্রশ্নটা, সে আধা প্রশ্নটা হল ‘আধা প্রেম, আধা প্রতারণা’।”
বিরোধী দলের উদ্দেশে তিনি বলেন, “দেখাচ্ছেন আমরা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছি, এটা জুলাই সনদের অংশ। আধা প্রতারণা হল-জুলাই সনদের মধ্যে বলা আছে, ওই প্রশ্নটা কখনোই প্রাসঙ্গিক হবে না। বিএনপির জন্য ‘প্রযোজ্য’ হবে না। বিএনপির জন্য ‘প্রযোজ্য’ হবে তার ‘নোট অব ডিসেন্ট’।”