Published : 12 Jul 2026, 11:38 PM
রাঙামাটির বন্যাকবলিত এলাকার অতিদরিদ্র ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে চলতি জুলাই মাসের কিস্তি আদায় না করতে এনজিওগুলোকে অনুরোধ করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
কিস্তি পরিশোধে দেরি হলে অতিরিক্ত সুদ বা জরিমানা না নিতেও সংশ্লিষ্ট এনজিওগুলোকে অনুরোধ করেন বলে রোববার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়।
এদিন রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে জেলার দপ্তর প্রধানদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, তার অনুরোধ এনজিও কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দিতে রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও রাঙামাটির কয়েকটি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বন্যা ও পাহাড় ধসে প্রাণহানিও হয়েছে।
শুক্রবার বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অমিতকে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যার দুর্যোগ মোকাবেলায় উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্ব দিয়েছে সরকার।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “অত্র এলাকার অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এদের অনেকেই বিভিন্ন কারণে এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন। বন্যাকবলিত এইসব ঋণগ্ৰস্ত মানুষের পক্ষে এই মাসের কিস্তি প্রদান করা দুরূহ।”
চলতি মাসের কিস্তি পরে গ্রহণ এবং বিলম্বের জন্য কোনো জরিমানা বা সুদ আরোপ না করার বিষয়টি বৈঠকে তুলে ধরার কথাও বলেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী অমিত বলেন, “জেলা প্রশাসক রাঙামাটি এলাকার এনজিও কর্মকর্তাদের কাছে আমার অনুরোধ পৌঁছে দেবেন।”
পাহাড় ধসের প্রসঙ্গ টেনে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের সরিয়ে বিকল্প জায়গায় আবাসনের ব্যবস্থা করা গেলে সেটিই স্থায়ী সমাধান হবে।
তিনি বলেন, “পাহাড়ের পাদদেশ যারা বসবাস করছেন, তাদের বোঝাতে হবে এবং তাদেরকে বুঝিয়ে বিকল্প জায়গায় আবাস করে দিতে পারলে সেটিই হবে স্থায়ী সমাধান। যারা বাস্তুহারা তাদেকে বিকল্প জমিতে ঘর তৈরি করে দিতে চান প্রধানমন্ত্রী, এই বিষয়ে সংসদেও আলোচনা হয়েছে।”
প্রতিমন্ত্রীর মতে, প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা একযোগে সচেতনতা তৈরি করতে পারলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় কোনো ঘাটতি থাকলে তা জানাতে বলেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী অমিত বলেন, দুর্গম এলাকায় সশস্ত্র বাহিনী এবং মাঠপর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কাজ করছেন। এসব কার্যক্রম সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “দুর্যোগ শেষে সকলেই বাসায় ফিরবে, কিন্তু বাসাবাড়ি আগের মতো থাকবে না। ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলো মেরামতের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করবো। এটা জনগণের কাছে আমাদের ওয়াদা।”
পরে ওমদামিয়া হিল পৌর জুনিয়র হাই স্কুলে আশ্রয় নেওয়া বন্যার্তদের সঙ্গে দেখা করেন প্রতিমন্ত্রী। সেখানে তিনি তাদের খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনের বিষয়ে খোঁজ নেন।
আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আপনাদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব সরকারের। বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসলে আপনাদের পুনর্বাসনের জন্য সরকার পরিকল্পনা মাফিক কাজ করবে।”
মতবিনিময় সভায় রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান, জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী, পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য যুগ্মসচিব সুমন বড়ুয়া, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মোহাম্মদ রিজাউল করিম, সিভিল সার্জন নূয়েন খীসা, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জালাল উদ্দীন উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও সিঅ্যান্ডবি, মোহরা ও দক্ষিণ কাট্টলির জলাবদ্ধ এবং বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন, সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ ও সাঈদ আল নোমানকে সঙ্গে নিয়ে তিনি পানিবন্দি মানুষের মধ্যে খাদ্য ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন।
পরিদর্শনের সময় প্রতিমন্ত্রী বাড়ি বাড়ি গিয়ে দুর্গত মানুষের খোঁজ নেন এবং জলাবদ্ধতা ও বন্যায় তাদের দুর্ভোগের কথা শোনেন। ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপত্তা, বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য ও জরুরি সেবার বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “দুর্যোগের এই কঠিন সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত মানবিক নীতির আলোকে সরকারের সব প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। কোনো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখা হবে না। প্রয়োজনীয় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ এবং অন্যান্য সহায়তা অব্যাহত থাকবে।”
দুর্যোগের পর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, পুনর্বাসন ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে কাজ করার কথাও বলেন তিনি।
চট্টগ্রামের মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, “সিটি করপোরেশনের প্রতিটি সংশ্লিষ্ট বিভাগ মাঠপর্যায়ে নিরলসভাবে কাজ করছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল রাখা, জরুরি সেবা নিশ্চিত করা, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সার্বিক সহায়তায় বিভিন্ন ওয়ার্ডে ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।”
এ সময় দুর্গত মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার, চাল, ডাল, তেল, বিশুদ্ধ পানি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করা হয়।