Published : 26 Apr 2026, 03:49 PM
সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত শেষ করতে টাস্কফোর্সকে আরও ৬ মাস সময় দিয়েছে হাই কোর্ট।
অ্যাটর্নি জেনারেলের আবেদনের পর রোববার বিচারপতি ফাতেমা নজিব ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের বেঞ্চ এই আদেশ দেয়।
এর আগে গত বছরের ২৩ অক্টোবর আদালত তদন্তের জন্য ৬ মাস সময় দিয়েছিল।
শুনানি শেষে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং রিটকারী পক্ষের আইনজীবী শিশির মনির সাংবাদিকদের কাছে মামলার অগ্রগতি, তদন্তের বাধা এবং দীর্ঘ তদন্ত কার্যক্রম নিয়ে বক্তব্য ও হতাশা তুলে ধরেন।
আদালতে শুনানি চলাকালে রিটকারী আইনজীবী শিশির মনির ও মঞ্জিল মোরশেদ তদন্ত কর্মকর্তাকে সশরীরে তলবের আবেদন জানিয়েছিলেন।
অন্যদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল আদালতে বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা মামলার একটি অগ্রগতি প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন এবং পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আরও ৬ মাস সময় প্রয়োজন।
দীর্ঘ সময়েও তদন্ত শেষ না হওয়ার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, “১৩ বছরেও একটি চাঞ্চল্যকর হত্যার চার্জশিট দিতে না পারা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।”
শুনানি শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল মামলার তদন্তের ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, “থানা এই মামলাটি মাত্র চারদিন তদন্ত করতে পেরেছিল। এরপরে মামলাটি চলে যায় ডিবির কাছে। ডিবি এই মামলাটি দুই মাস দুই দিন তদন্ত করেছে। এরপর ২০১২ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি এই মামলাটা ডিবি থেকে সরিয়ে নিয়ে র্যাবকে তদন্ত করতে দেন আদালত। র্যাব ১২ বছর ৬ মাস ১৫ দিন তদন্ত করেছে।”
টাস্কফোর্স কেন তদন্তে এগোতে পারছে না, সে বিষয়ে তিনি বলেন, “একটা ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত করতে গেলে তার একটা চেইন থাকে, একটা ধারাবাহিকতা থাকে। সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারছেন না বর্তমান টাস্কফোর্সের সদস্যরা। কারণ, ওই সময় যারা প্রাথমিকভাবে তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন, তাদের কাছ থেকে যে সমস্ত তথ্য পেয়েছেন, তার কোনো নিয়মতান্ত্রিক হস্তান্তর বর্তমান টাস্কফোর্সের উপরে হচ্ছে না। তারা শেষ পর্যন্ত তথ্যের ক্ষেত্রে কোনো অ্যাক্সেস পাচ্ছেন না। এটাই হচ্ছে মূল বাধা।”
আলামত ও নথিপত্রের বিষয়ে তিনি বলেন, “তদন্তকারী কর্মকর্তা আমাকে যেটা বলেছেন যে, ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে তার আলামত এবং তৎকালীন সময়ে এমনকি সিডি, যেগুলো মামলার তদন্ত কাজ শেষ করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট, তার কোনো কিছুর তাদের অ্যাক্সেস নেই। যারা জিম্মাদার ছিলেন সেসময়...তাদের কাছে তো তাদেরকে অ্যাক্সেস করতে হবে। তারা তো সেই অ্যাক্সেসটাই করতে পারছেন না।”
ঘটনাস্থল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “যেকোনো ফৌজদারি অপরাধের প্রথম কথা হচ্ছে ক্রাইম সিন। এখনকার যারা টাস্কফোর্সে দায়িত্ব পালন করছেন তারা কিন্তু ঘটনার অব্যবহিত পরে এখানে যাননি। এখন আর ক্রাইম সিন বলে কোনো সিন নেই। ফ্ল্যাটটাও সম্ভবত অন্য কাউকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।”
অন্যদিকে, টাস্কফোর্সের সর্বশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদনের সমালোচনা করে রিটকারী পক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, “তদন্তের স্বার্থে সাবেক যে মন্ত্রী ও পুলিশ কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলা হচ্ছে তারা তো দেশেই নেই, তাহলে কি তাদের পাওয়া পর্যন্ত তদন্ত আটকে থাকবে?”
শিশির মনির বলেন, “তৃতীয়বার টাস্কফোর্স গঠন করার পরে যে সময় নেওয়া হয়েছে, আজকে এসে তারা রিপোর্ট দিয়ে বলছেন যে, আরও অমুক অমুক অমুক অমুককে জিজ্ঞাসা করতে হবে। যাদেরকে জিজ্ঞাসা করতে হবে তারা বলছেন তাদেরকে আসলে জিজ্ঞাসা করা সম্ভব না। কারণ তারা মিসিং (নিখোঁজ)। তারা দেশে নাই। তাদেরকে খুঁজে পাচ্ছেন না।”
সাবেক কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে তিনি বলেন, “তারা তৎকালীন হোম মিনিস্টারের সঙ্গে কথা বলতে চান। তৎকালীন আইজিপির সঙ্গে কথা বলতে চান। তৎকালীন র্যাবের ডিজির সঙ্গে কথা বলতে চান। তৎকালীন একজন আপনাদেরই একজন বিখ্যাত সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলতে চান। এই যে কথা বলতে চান, তারা তো মিসিং, তারা তো নাই, তারা তো বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে নাই।”
এই পরিস্থিতির সমালোচনা করে তিনি প্রশ্ন রাখেন, “পট পরিবর্তনের পরে যে লোকগুলোর সঙ্গে তারা কথা বলবেন বলে ইন্ডিকেট করেছেন প্রোগ্রেস রিপোর্টে, সেই লোকগুলো বাংলাদেশের জুরিসডিকশনের মধ্যে আর নাই। তাহলে কি তদন্তের রেজাল্ট ততক্ষণ হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের পাওয়া যাবে না?”
৬ মাসের মধ্যে এসব ব্যক্তিদের পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
টাস্কফোর্স এখনও হত্যাকাণ্ডের কোনো কারণ বা মোটিভ বের করতে পারেনি জানিয়ে শিশির মনির বলেন, “চার-পাঁচটা জায়গায় তারা কতগুলো 'না না না না' বলেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বলেছেন যে, তারা এখনও মোটিভ খুঁজে পান নাই। ক্লু খুঁজে পান নাই। কেন তাদেরকে হত্যা করা হলো? দাম্পত্য কলহ? বলছেন, না। ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব? বলছেন, না। পেশাজীবী কোনো কাজ? বলছেন, না। জমিজমার কোনো বিষয়? বলছেন, না। তাহলে হ্যাঁ কী?”
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “এখানে অত্যন্ত দক্ষ পুলিশ অফিসার আছে, সিআইডি আছে, পিবিআই আছে, র্যাবের হাতে ছিল, সকলে মিলে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। কেউই তা উদ্ঘাটন করতে পারছেন না। তাহলে বিষয়টা কী? এমনি মরে গেছেন তারা? একজন আরেকজনকে বেঁধে মেরেছেন? একজন তো হাত-পা বাঁধা ছিলেন। কে কাকে বেঁধেছেন? কারা বেঁধেছে?”
এই মামলাকে 'ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমের জন্য একটা শেইমফুল (লজ্জাজনক) ব্যাপার' উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমাদের দেশের অপরিপক্বতা, অথবা ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির অদক্ষতা, অথবা পলিটিক্যাল ইনফ্লুয়েন্স— যে কারণকেই আমরা দায়ী করি না কেন, ফ্যাক্ট হলো এই রহস্য উদ্ঘাটন আজও তারা করতে পারে নাই।”
মামলায় দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের বিষয়ে বাদীপক্ষের অবস্থান স্পষ্ট করে শিশির মনির বলেন, “আশ্চর্যজনক, দুই-তিনজন মানুষকে এখনও জেলে রেখেছে। যারা প্রায় নয়-দশ-এগারো বছর ধরে জেলে আছে এরকম লোকও আছে। তাদের ব্যাপারে কোনো ইনভেস্টিগেশনের আপডেট নাই, কিন্তু তারা জেলে আছে।
“মামলার বাদী রুনির ভাই নওশের আলম রোমান আমাদেরকে বলেছেন যে তারা কোনো নিরপরাধ মানুষকে জেলে এভাবে পড়ে থাকতে দেখতে চান না।”
দীর্ঘ বিচারহীনতায় পরিবারের হতাশার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তাহলে কি আর বিচার পাওয়া গেল না? আজকেও সন্তান মেঘ, সে কল করে বলেছে যে, তাহলে তারপরে কী? এরপরে কী?”
নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানি প্রসঙ্গে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেলও সতর্ক অবস্থান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “আমরা শুধুমাত্র বাইরের সস্তা কথাবার্তায় প্রভাবিত হয়েও যেন কোনো কারণে কোনো তদন্ত রিপোর্ট দিয়ে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে যেন অন্যায়ের মুখোমুখি না করি। সেটাও কিন্তু রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব এবং কর্তব্য মনে করি।”
বিচার প্রক্রিয়ার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, “ফৌজদারি কোনো একটা মামলা সময় শুধুমাত্র পার হয়ে গেছে, এই কারণে ধামাচাপা দেওয়া বা ধামাচাপা দেওয়ার সুযোগ নেই। সাক্ষ্য-প্রমাণ যখনই আসবে, তখনই সে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করে অপরাধীদেরকে শাস্তির মুখোমুখি করার বিধান আমাদের প্রচলিত আইনেই আছে। সরকার আন্তরিক। কারণ টাস্কফোর্সের কোনো কার্যক্রমে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো হস্তক্ষেপ করা হয়নি।”
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারোয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনিকে হত্যা করা হয়।
এ ঘটনায় নিহত রুনির ভাই নওশের আলম রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।
এ মামলার আসামিরা হলেন-রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মাসুম মিন্টু, কামরুল ইসলাম ওরফে অরুণ, আবু সাঈদ, সাগর-রুনির বাড়ির দুই নিরাপত্তারক্ষী পলাশ রুদ্র পাল ও এনায়েত আহমেদ এবং তাদের ‘বন্ধু’ তানভীর রহমান খান। এদের মধ্যে তানভীর জামিনে রয়েছে। পলাশ রুদ্র পাল জামিনে গিয়ে পলাতক হয়েছেন। অপর আসামিরা কারাগারে রয়েছেন।
প্রথমে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন ওই থানার এক উপ-পরিদর্শক (এসআই)। চারদিন পর চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার তদন্তভার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। দুই মাসেরও বেশি সময় তদন্ত করে রহস্য উদঘাটনে ব্যর্থ হয় ডিবি। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে একই বছরের ১৮ এপ্রিল হত্যা মামলাটির তদন্তভার র্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর মামলার তদন্তের দায়িত্ব থেকে র্যাবকে বাদ দেওয়া হয় এবং বিভিন্ন বাহিনীর অভিজ্ঞ তদন্ত কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করে এ তদন্ত কাজ শেষ করতে ছয় মাস বেঁধে দেয় হাই কোর্ট।
এর পরে ১৭ অক্টোবর হাই কোর্টের নির্দেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন নিরাপত্তা বিভাগ থেকে টাস্কফোর্স গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। পিবিআই প্রধানকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের এই উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স কমিটি কাজ করছে।
আরও পড়ুন-
সাগর-রুনি হত্যা: কেন প্রতিবেদন জমা হল না? ব্যাখ্যা তদন্ত কর্মকর্তার