Published : 23 May 2026, 04:47 PM
ঢাকার পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় বিচার চেয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভের মধ্যে সারাদেশে শিশু সুরক্ষায় প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও জোরদারের তাগিদ এসেছে ইউনিসেফের তরফে।
বাংলাদেশে জাতিসংঘ শিশু তহবিল-ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেছেন, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত শিশুদের বিরুদ্ধে নির্মম ও যৌন সহিংসতার ঘটনা যে হারে বেড়েছে তাতে সারাদেশে শিশু সুরক্ষায় প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও জোরদার করা ‘অতি জরুরি’ হয়ে পড়েছে।
শনিবার ‘শিশুদের ওপর বর্বরতা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে’ এমন আহ্বান জানিয়ে এক বিবৃতিতে তিনি এ কথা বলেন।
রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, “২০২৬ সালে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে নির্মম ও যৌন সহিংসতার ঘটনার যে হারে বাড়ছে তাতে সারাদেশে দ্রুত শিশু সুরক্ষা ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও জোরদার করা অতি জরুরি হয়ে পড়েছে।
“অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।”
মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর পল্লবীর একটি ফ্ল্যাট থেকে আট বছর বয়সী শিশু রামিসার খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ বলেছে, ওইদিন সকালে পাশের ফ্লাটের বাসিন্দা ৩২ বছরের সোহেল শিশুটিকে গলা কেটে হত্যার পর মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এরপর ফ্ল্যাটের সাবলেট এই ভাড়াটে গ্রিল কেটে পালিয়ে যান। তবে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ঘরেই ছিলেন।
পুলিশ বাসা থেকে স্বপ্নাকে আটক করে। পরে সন্ধ্যায় সোহেলকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এ ঘটনার পর সারাদেশ তোলপাড় হয়ে পড়ে এবং দেশের বিভিন্ন মহল থেকে বিচার চাওয়া হয়।
এছাড়া চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া এলাকায় এক শিশুকে ‘ধর্ষণের’ সন্দেহভাজনকে পুলিশ আটক করে নিয়ে যেতে চাইলে স্থানীয়দের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘ্টনা ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেরাই তাকে ‘শাস্তি’ দেওয়ার কথা বলেন। তারা পুলিশের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সংঘর্ষে ৪০ জন আহত হয়।
এ ঘটনা ছাড়াও চট্টগ্রাম নগরীতে আরও দুই শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে দুইজনকে আটক করা হয়েছে।
এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় শিশুর সুরক্ষায় প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও জোর করার আহ্বান জানিয়ে এ বিবৃতি দিল ইউনিসেফ।
শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতার মতো অপরাধ বন্ধে ইউনিসেফের প্রতিনিধি বলেন, “একই সঙ্গে প্রতিরোধ, অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের, প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা, শিশুবান্ধব পুলিশ ও বিচারব্যবস্থা, কমিউনিটি সুরক্ষা এবং সামাজিক সেবাসমূহের মধ্যে বিদ্যমান ঘাটতিগুলো দূর করতে হবে।
“নারী ও শিশুদের জন্য মনোসামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্কুল, মাদ্রাসা, কর্মক্ষেত্র, পাড়া-মহল্লা ও শিশুযত্ন কেন্দ্রগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও বাড়াতে হবে।”
রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, “বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে শিশুদের ওপর সাম্প্রতিক ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনায় ইউনিসেফ গভীরভাবে মর্মাহত ও স্তম্ভিত। এর মধ্যে রয়েছে ছেলে ও মেয়ে শিশুদের ধর্ষণ ও হত্যার মতো ঘটনা।
“অথচ যেসব জায়গায় তাদের নিরাপদ থাকার কথা ছিল, সেখানেই এসব সহিংসতার শিকার হয়েছে তারা। ভুক্তভোগী সব পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছে ইউনিসেফ।”
তিনি বলেন, “সমাজে নীরবতা বজায় থাকলে সহিংসতা আরও ছড়িয়ে পড়ে। ইউনিসেফ শিশু, নারী, পরিবার, কমিউনিটি ও সমাজের মানুষকে যেকোনো সহিংসতা বা নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর আহ্বান জানাচ্ছে। এজন্য প্রয়োজনে আপনারা চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮-এ যোগাযোগ করুন, যা ভুক্তভোগী শিশুদের তাৎক্ষণিক সহায়তা ও প্রয়োজনীয় সেবা দিয়ে থাকে।”
‘নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের মর্যাদার প্রতি সম্মান জানানো উচিত’, এর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বাংলাদেশে ইউনিসেফের এই প্রতিনিধি বলেন, “তাদের ছবি, ভিডিও বা ব্যক্তিগত তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা একধরনের নতুন নির্যাতন। যারা এগুলো শেয়ার করেন, তারা মূলত ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের মানসিক কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেন এবং ভুক্তভোগীদের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করেন।
“ইউনিসেফ সর্বসাধারণ, গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে যেন তারা ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের অধিকারকে সম্মান দেখান এবং এ ধরনের ছবি, ভিডিও বা তথ্য শেয়ার করা থেকে বিরত থাকেন। এর বদলে অপরাধীদের শাস্তি থেকে দায়মুক্তি দেওয়ার অবসান ঘটানো ও মানুষের নিরাপত্তা জোরদার করার দাবিতে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।”