“আপনাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমরা যুদ্ধে আছি,” বলেন তিনি।
Published : 02 Mar 2025, 02:33 PM
কারসাজি করে ভোটে জয়ের মুখ দেখা গেলেও আখেরে যে তা দলেরই ক্ষতি ডেকে আনে তা মনে করিয়ে দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন।
তার ভাষ্যে, “আমি একটা কথা বলতে চাই, আমরা সব সময় ভুলে যাই, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে, ভোট সন্ত্রাস করে আপাতত দৃষ্টিতে জেতা যায়। কিন্তু আখেরে নিজের জন্য, দলের জন্য, দেশের জন্য সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে, আখেরে টেকা যায় না।”
রোববার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে জাতীয় ভোটার দিবসের আলোচনায় বক্তব্য দিচ্ছিলেন নাসির উদ্দিন।
ভোটে কারসাজি না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আমার প্রত্যাশা, কেউ এ জাতীয় উদ্যোগ নেবেন না; কেউ এ জাতীয় চেষ্টা করবেন না। আমরা সর্বশক্তি দিয়ে ১৮ কোটি মানুষের পাশে আছি।”
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়ে নাসির বলেন, “১৮ কোটি মানুষের কাছে আমার আবেদন থাকবে- আমাদের পাশে থাকুন। আপনাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমরা যুদ্ধে আছি।
“আমরা ওয়ার ফুটে কাজ করছি। অত্যন্ত সীমিত টাইম লিমিটের মধ্যে, আমরা খুব কষ্ট করে এগিয়ে যাচ্ছি।”
ভোটের ভাবনা শয়নে-স্বপনে
ভোটার দিবসের অনুষ্ঠানে সিইসি বলেন, “বাঙালি এখন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে। যদি কোনো কারণে এটা বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে বা কোনোক্রমে আমরা যদি পিছিয়ে যাই, তাহলে কিন্তু যারা আহত বা নিহত হল, তাদের অবদান তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। আমরা সেটা হতে দিতে পারি না।”
মানুষ এতদিন ‘ভোট দিতে পারেনি’ মন্তব্য করে নাসির উদ্দিন বলেন, “এখন ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ এসে গেছে; ভোটটা শুধু এখন অধিকার হিসেবে দেখলে হবে না। এটা এখন নাগরিকের দায়িত্ব।”
‘দিনে-রাতে শয়নে-স্বপনে’ সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়টিই ভাবনায় থাকার কথা বলেন সিইসি। তিনি বলেন, “আমি এখন যেখানে যাই, সবাই আমাকে বলে যে ‘সমস্ত মানুষ আপনাদের দিকে তাকিয়ে আছে’। আমাদের কাছে মানুষের আকাঙ্ক্ষা এখন অনেক। আগে নির্বাচন কমিশনের প্রতি মানুষের এত প্রত্যাশা ছিল না, কিন্তু এখন মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেড়ে গেছে। এটা আমাদেরকে ভাবিয়ে তুলেছে যে কীভাবে আমরা এই প্রত্যাশা পূরণ করব।”
ভিন্নমতেও ‘আশাহত নন’
সিইসি মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলো যার যার দৃষ্টিকোণ থেকে বক্তব্য দেবে, সেটাই ‘গণতন্ত্রের সৌন্দর্য’।
“এখানে অনেকেই আছে যারা মনে করে আমার দলই দেশপ্রেমিক আর কোনো দল নয়। এট ঠিক না। মানুষ কিন্তু জন্মগতভাবেই দেশপ্রেমিক। দেশপ্রেমটা কারো মনোপলি নয়, পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে কম বেশি হয়।”
নাসির উদ্দিন বলেন, “অনেকে বলে যে বিভিন্ন দল, তাদের বিপরীতমুখী অবস্থান। আমি এটা ভিন্ন চোখে দেখি। এটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য। আমরা যদি ৩০টা দল থাকি, সবাই একরকম চিন্তা করব না। প্রত্যেক দলেরই তো আলাদা আলাদা পারসপেকটিভ আছে। যার যার দলের একটা স্বার্থ আছে। তো তাদের নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে তারা বক্তব্য দেবে। দ্যাট ইজ দ্য বিউটি অব ডেমোক্রেসি।”
দলগুলোর ভিন্নমত থাকলেও এক সময় তারা একমত হবে বলে আশা করেন সিইসি।
“যখনই বিভিন্ন দল বিপরীতমুখী বক্তব্য দেয়, আমি আশাহত হই না। দিন শেষে একটা পর্যায়ে তারা ঘুরে ফিরে আবার আসবে। এক সময় তারা একমত হবে। সেই বিশ্বাস আমার আছে।”
ঐকমত্য কমিশনের কাছে প্রত্যাশা
সিইসি বলেন, “আমি সবার মুখে একটা জায়গায় ঐকমত্য দেখেছি। এটার জন্য ঐকমত্য কমিশনের প্রয়োজন পড়েনি। এই বিষয়টা নিয়ে সবাই একমত, যেখানে কোনো দ্বিমত দেওয়া ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি, যে বলে ‘আমি একটি সুষ্ঠু, সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চাই না’। এটা কিন্তু কেউ বলেনি। একজনও বলেনি। যারাই আমাদের সাথে সভা করতে এসেছেন, তারা সবাই বলেছেন যে তারা সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচন চায়।”
নির্বাচনী আইন-বিধি প্রতিপালনের বিষয়ে ঐকমত্য কমিশনে দলগুলোর কাছ থেকে লিখিত প্রতিশ্রুতি নেওয়ার পক্ষে মত দেন নাসির উদ্দিন।
তিনি বলেন, “আমি ভাবি... যে ঐকমত্য কমিশন হয়েছে, উনারা যদি একটা কাজ করতেন যে যখন দলগুলোকে ডাকেন, তাদেরকে যদি জিজ্ঞেস করত যে আপনারা কি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চান? যদি চায় তাহলে তাদের কাছ থেকে সই নেওয়া উচিত যে নির্বাচন আচরণবিধির মানবেন, আপনার দলের প্রার্থী যদি কোনো গোলমাল করে তাহলে দলীয়ভাবে অ্যাকশন নেবেন এবং সুন্দর একটা নির্বাচনের জন্য সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করবেন।”
ঐকমত্য কমিশন দলগুলোর কাছে এমন কিছু আদায় করতে পারলে ‘আইনকানুন মানায় চাপ তৈরি হবে’ বলে মনে করেন সিইসি।
তিনি বলেন, “এরকম একটা ঐকমত্য যদি নেওয়া হয়। লিখিতভাবে যদি নেওয়া হয় আচরণবিধি মানার জন্য, একটা দলীয় চাপ থাকবে... তাহলে আমাদের কাজ অনেক সহজ হয়ে যাবে বলে মনে করি। আমরা যেহেতু জাতির কাছে ওয়াদা দিয়েছে, আমরা একটা নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে চাই। আমাদের নিজস্ব কোনো এজেন্ডা নেই, আমাদের এজেন্ডাটা বাংলাদেশের এজেন্ডা, দেশের মানুষের এজেন্ডা। আমাদের এজেন্ডা হচ্ছে একটা সুস্থ সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের এজেন্ডা।”
এরপরে সিইসি উপস্থিত নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাত তুলে ‘ওয়াদা’ করান, যেন তারা নির্বাচনে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করেন।
খোলা মাঠে ভোটকেন্দ্র চান ইসি তাহমিদা
নির্বাচন কমিশনার তাহমিদা আহমদ বলেন, “আমরা চারিদিকে দেখছি সংস্কার আর সংস্কার। ইসির কি সংস্কার হবে না? আমি চাই খোলা মাঠে নির্বাচনটা হোক। স্কুলের খোলা মাঠে নির্বাচন করতে কি পারব না? তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কথা বললে তারা বলে এটা সম্ভব না। কিন্তু আপনারা সহযোগিতা করলে এটা করা সম্ভব।”
অবশ্য পরে একজন নির্বাচন কমিশনার আলোচনায় বলেছেন, এ ধরনের প্রস্তাব বাস্তবসম্মত নয়।
অন্য কমিশনাররা যা বললেন
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “জনগণের অংশগ্রহণই হল অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। একটি নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের শাসক নির্বাচন করে। ভোটারদের মতামত তখনই প্রতিফলন হবে, যদি ভোটার সঠিকভাবে ভোট দিতে পারে।”
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, আমাদের ভাবতে হবে আমরা কঠিন পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমরা ভেঙে যাবর কিন্তু মচকাব না। নির্বাচন কমিশনের একার পক্ষে ভালো নির্বাচন করা সম্ভব নয়। সামজিকভাবে বিশ্বাস অর্জনের জন্য যা যা করার প্রয়োজন তা করতে হবে। প্রথম পরীক্ষাই হবে আমাদের একটা ভালো নির্বাচন করা “
তিনি বলেন, কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তার দায় কেউ না কেউ নেবেন। যদি বিগত নির্বাচনগুলো ভালো না হয়ে থাকে, এর দায় কাউকে না কাউকে নিতে হবে। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, এর দায় ইসিকে নিতে হবে। কেউ এর দায় এড়াতে পারেন না।”
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, “ভোটার দিবস সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ। বাড়ি বাড়ি গিয়ে সংগ্রহ করা তথ্য ও ভোটারযোগ্যদের নিবন্ধন শেষ করে জুনের মধ্যে একটি ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করা হবে।”
বাড়িবাড়ি হালনাগাদ কার্যক্রমে ভোটার তালিকা থেকে ১৯ লাখ মৃতভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। সারাদেশে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে ৫৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫৬৩ জনের।
ইসি সচিব আখতার আহমেদের সভাপতিত্বে সভায় অন্যদের মধ্যে সংস্থাটির অতিরিক্ত সচিব, জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন (এনআইডি) অনুবিভাগের মহাপরিচালক, নির্বাচনি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালকসহ সকল পর্যায়ে কর্মকর্তা, কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।