Published : 23 Feb 2026, 01:25 PM
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলির পদ থেকে মোহাম্মদ তাজুল ইসলামকে সরিয়ে দেওয়াকে ‘স্বাভাবিক প্রক্রিয়া’ হিসেবে দেখছেন সদ্য সাবেক এ প্রধান কৌঁসুলি।
তাজুল বলছেন, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন পদে নিজেদের পছন্দনীয় লোক বসাবেন—এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। এখানে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
সোমবার পদ খোয়ানোর পর ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তাজুল ইসলাম। প্রায় দেড় বছর দায়িত্ব পালনের পর বিদায়বেলায় ‘অম্লমধুর’অনুভূতির কথা বলেন সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী।
কথা বলার শুরুতেই তাজুল ইসলাম নতুন প্রধান কৌঁসুলির প্রতি শুভকামনা জানান।
“প্রথম আমার রিঅ্যাকশন হচ্ছে আমি নতুন চিফ প্রসিকিউটরকে স্বাগতম জানাই। তার প্রতি আমার শুভেচ্ছা থাকবে। তিনি যাতে আমাদের রেখে যাওয়া অসমাপ্ত দায়িত্ব পালনে সফল হন।”
জুলাই-অগাস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন এবং গত ১৫ বছরের গুম-খুনের বিচার প্রক্রিয়া যেন নতুন নেতৃত্বের অধীনে অব্যাহত থাকে, সেই প্রত্যাশার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলির পদ থেকে মোহাম্মদ তাজুল ইসলামকে সরিয়ে দেওয়া হয়; তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন আইনজীবী মো. আমিনুল ইসলাম।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সোমবার এক প্রজ্ঞাপনে বলেছে, আমিনুল ইসলামকে পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত চিফ প্রসিকিউটর পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

‘অম্লমধুর অনুভূতি’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামকে প্রধান কৌঁসুলির দায়িত্ব দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তিনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের আইনজীবী হিসেবে আইনি লড়াইয়ে যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুতে দায়িত্ব নেওয়ার প্রেক্ষাপট মনে করিয়ে দিয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, “আজকে আমার অনুভূতিটা অম্লমধুর। বাংলাদেশের একটা কঠিন সময়ে আমি এখানে চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলাম।”
সেই সময়ের চ্যালেঞ্জের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি যখন দায়িত্ব নিই—আপনারা জানেন যে এই মূল ভবনটি তখন পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। একটা টিনশেডে কার্যক্রম চলছিল। তার আগের প্রসিকিউশনে যারা ছিলেন, তারা সব কিছু এলোমেলো রেখে পালিয়ে গিয়েছিলেন।
“বইপত্র, নথিপত্র বৃষ্টিতে ভিজছিল—এরকম একটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা দায়িত্ব নিয়েছিলাম।”
সেখান থেকে হাসপাতালগুলোতে ছুটে গিয়ে আহতদের কাছ থেকে আলামত সংগ্রহ এবং গুমের তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেন তিনি। ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন ও সর্বাত্মক সহযোগিতার জন্য তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, শহীদ পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী এবং মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
সরকার পরিবর্তন ও পদত্যাগের প্রসঙ্গ
সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি আগে থেকে জানতেন কি না এবং নিজে থেকে কেন পদত্যাগ করেননি—এমন প্রশ্নের জবাবে তাজুল ইসলাম বলেন, “সরকারের কাছ থেকে আমাদেরকে প্রথমে বলা হয়েছিল যে, আমরা অ্যাজ ইট ইজ যেভাবে আছে, সেভাবেই চলবে। তারপর গতকালকে উনি (কারও নাম বলেননি) আসলে আমাকে ধারণাটা দিয়েছেন যে, সরকারের ইচ্ছা যে- এখানে নতুন কাউকে রিপ্লেস করার।
“তখন আমি নিজের থেকে বলেছিলাম যে তাহলে কি আপনারা চাচ্ছেন যে আমি পদত্যাগ করে চলে যাব? বলছেন না দরকার নাই। কারণ হচ্ছে যে ন্যাচারাল প্রক্রিয়াতে রিপ্লেসড হবে। পদত্যাগ করলে এটা ভিন্ন বার্তা যেতে পারত।”
তাজুলের ভাষায়, “যখনই একটা নির্বাচিত সরকার আসে, তারা কিন্তু তাদের পছন্দের লোকজনকে ন্যাচারালি রিপ্লেসড করেন—এটা অস্বাভাবিক আমি মনে করছি না। এটা খুবই স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়া।”
রায় নিয়ে আত্মবিশ্বাসী তাজুল
মামলার আসামিদের ক্ষেত্রে ‘পিক অ্যান্ড চুজ’ (বেছে বেছে আসামি করা) করা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নে সদ্য সাবেক প্রধান কৌঁসুলি তাজুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনে এ বিষয়টি বৈধ।
তিনি বলেন, “মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার দুনিয়ার ইতিহাসে দেখবেন কোথাও গণহারে হাজার হাজার সৈন্যকে শাস্তি দেওয়া হয় না। সেখানে টপ কমান্ডারদের দেওয়া হয় এবং যারা একদম সরাসরি অ্যাট্রোসিটির সাথে ডাইরেক্ট ইনভলবমেন্ট ছিল তাদেরকেই সাজা দেওয়া হয়।”
নিজের মেয়াদের বিচার ও রায়ের মান নিয়ে শতভাগ আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আমি খুব কনফিডেন্ট। যে রায় হয়েছে, যে ডকুমেন্ট আমরা প্রডিউস করেছি—এই ব্যাপারে উচ্চ আদালতে গিয়ে জাজমেন্ট উল্টে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
“অতীতের ট্রাইব্যুনালের সমস্ত রেকর্ড ঘেঁটে দেখবেন, আমরা যে ধরনের শক্তিশালী প্রমাণ এখানে উপস্থাপন করেছি, এই ধরনের প্রমাণ কখনোই উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বিগত দেড় বছর ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার জন্য সংবাদমাধ্যমের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানান তাজুল ইসলাম।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আর কখনো গুম, হত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধের পুনরাবৃত্তি হবে না।
শেষে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তাজুল বলেন, “আমার মূল পরিচয় আমি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। সুতরাং আমার জায়গা হচ্ছে আইন পেশা।
“আমি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে আমার স্বাভাবিক কর্মজীবনে ফেরত যাব। আমি তো একদিনের জন্য বেকার থাকছি না; আপাতত কোনো পদে যাচ্ছি না।”
ট্রাইব্যুনাল থেকে সরানো হল তাজুলকে, নতুন প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল