Published : 20 Mar 2026, 03:42 PM
স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে গাবতলী বাস স্ট্যান্ডে হানিফ বাসের অপেক্ষা করছিলেন পোশাককর্মী মো. সুজন; বরিশালে বাড়ির পথে রওনা হবেন তিনি।
তিন দিন আগে ছুটি পেলেও সুজন অপেক্ষা করছিলেন ভিড় কমার। ঈদ যাত্রায় চাপ যখন একদমই নেই, তখন প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে ঈদের আগের দিন যাচ্ছেন পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে ঈদ উদযাপনে করতে।
শুক্রবার দুপুরে বাস কাউন্টারের সামনে কথা হয় সুজনের সঙ্গে। তিনি বলেন, "১০ দিনের ছুটি পাইছি তো। তাই একটু লেট করে যাচ্ছি।"
সুজনের মত হাতেগোনা কয়েকজন ও কিছু পরিবারের দেখা মিলল গাবতলী বাস টার্মিনালে। এর মধ্যে কেউ কেউ আবার অফিসের কাজে ব্যস্ত ছিলেন বলে ঈদের আগ মুহূর্তে বাড়ি ফিরছেন।
শুক্রবার দুপুর ১২টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত গাবতলীতে ঘুরে ভিড় দেখা গেল না তেমন। বেশিরভাগ কাউন্টার একদম ফাঁকা পড়ে আছে। কিছু পরিবহনের কাউন্টারের ঝাঁপ নামিয়ে ফেলা হয়েছে।
কিছু কাউন্টারের সামনে পরিবহন শ্রমিকরা যাত্রীদের জন্য হাঁকডাক দিলেও আগের কয়েক দিনের মত যাত্রীর দেখা মিলছে না। শ্রমিকদের অনেককে কাউন্টারে বসে অলস সময় কাটাতে বা আশেপাশে দাঁড়িয়ে খোশগল্পে মেতে থাকতে দেখা গেল।

ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গে যাওয়ার বাস ছাড়ে গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে। উত্তরা, কল্যাণপুর বাস স্ট্যান্ড আর ট্রেনের যাতায়াত সুবিধার বাইরে অনেকেই এখান থেকে টিকেট কেটে গন্তব্যে চলাচল করেন।
এ টার্মিনাল থেকে এক সময় দক্ষিণাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যাত্রীদের আনাগোনাও থাকত। মাওয়া দিয়ে পদ্মা নদী পার হতে দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকার চেয়ে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাট দিয়ে চলাচল তুলনামূলক স্বস্তির ছিল।
এদিক দিয়ে দক্ষিণাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে যাতায়াতে দূরত্ব বেশি হলেও এ পথ দিয়েই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন যাত্রীরা।
তবে পদ্মা সেতু হওয়ার পর সেসব দিন গত হয়েছে। গাবতলীতেও চাপ কমে গেছে। ঈদের জন্য যতটুকু চাপ থাকে তা শেষ হয়ে যায় ঈদযাত্রা প্রথম দুই-তিনদিনেই।

বরিশালে লঞ্চে না গিয়ে গাবতলী দিয়ে যাওয়া কারণ জানতে চাইলে মো. সুজন বললেন, "বৃষ্টির দিনে বিপদ। ঝড়ঝাপটা থাকে। আমরা নদীর মানুষ। এ বিপদ আমরা ছাড়া কেউ বুঝবে না। বাসেই ভালো।
"তাছাড়া নবীনগর থেকে মাওয়া হয়ে যেতে গেলে ভোর সাড়ে ৪টায় বাস। ওই সময় তো মুশকিল। তাই এখান দিয়ে যাচ্ছি।"
সাভারের একটি কারখানায় কাজ করেন সুজন; স্ত্রীকে নিয়ে সেখানেই থাকেন। সাভার থেকে বাস ধরতে গাবতলী আসাই তাদের জন্য সহজ।
উত্তরবঙ্গের পাবনা, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় যাওয়া শ্যামলী পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার মনির হোসেনকে অলস বসে থাকতে দেখা গেল।
বললেন, "যাত্রী নাই তাই বসে আছি। চাপ ছিল ১৭, ১৮, ১৯ তারিখ। এখন গাড়িও কম, যাত্রীও নাই। কেবল টানের গাড়ি আছে।"
দুদিন আগে বগুড়ায় ট্রেন দুর্ঘটনার কারণে বাড়তি চাপ হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বললেন, "ওই তিন দিন এমনিতেই চাপ ছিল। একসাথে গার্মেন্ট ছুটি হইছে। সরকারি ছুটি। সব মিলিয়ে তিন দিন চাপ ছিল।"

পাবনা যাওয়ার টিকেট কিনতে এ কাউন্টারে এসেছিলেন একটি সিকিউরিটি কোম্পানির চাকুরে উজ্জ্বল। প্রথমে কত টাকা ভাড়া চাইলেন কাউন্টার মাস্টার মনির, তা বোঝা গেল না।
কাছে আসতেই শোনা গেল, "সাড়ে ৯০০ টাকায় যাবেন?"
উজ্জ্বল “আর কম হবে কিনা” প্রশ্ন ছুড়ে কাউন্টার থেকে সরে গেলেন।
ঈদের আগেরদিন কেন বাড়ি যাচ্ছেন জানতে চাইলে উজ্জ্বল বললেন, "অফিসের কাজ থাকায় যেতে পারিনি। আজ যাচ্ছি।"
টিকেটের দাম নিয়ে প্রশ্ন করতেই বললেন, “আমি তো বাসে যাই না। সবসময় ট্রেনে যাই। এবার আর টিকেট কাটতে পারি নাই। এখন এসেছি, সাড়ে নয়শ বলল। কিন্তু আমি ভালো বাস চাই। তাদের নাকি সিট নাই।"

যাত্রী নেই, কর্মহীন বসে আছেন সাতক্ষীরার রাসেল এন্টারপ্রাইজের কাউন্টার ম্যানেজার আল আমিন। অন্য কর্মীদের সঙ্গে খোশগল্প করছিলেন।
জানতে চাইলে আল আমিন বললেন, “সারাদিনই বাস আছে, কিন্তু যাত্রী নাই। রাত ১২টা পর্যন্ত বাস আছে।
"মাওয়া ব্রিজ হওয়ায় গাবতলী দিয়ে এমনিতেই চাপ কম। তারপর ঘরে বসেই টিকিট কাটা যাচ্ছে। আপনি থাকেন উত্তরা, গাবতলী কেন আসবেন? ওখান থেকেই বাস আছে। আপনি থাকেন মালিবাগ, গাবতলী কেন আসবেন? আরামবাগ গেলেই বাসের অভাব নাই। তাই এমনেই এখানে চাপ কম।"
যাত্রী খরার মধ্যে কিছুটা ভিড় দেখা গেল রাবেয়া পরিবহনের কাউন্টারে। রাজবাড়ী হয়ে কুষ্টিয়ায় যাবে বাসটি।
কাউন্টার মাস্টার ইশতিয়াক বলেন, "আমার যাত্রীরা সৌখিন। একটা গেঞ্জি লাগলেও ঢাকায় আসে তারা। তাই এই রুটে সবসময়ই একটু চাপ থাকে। ঘাট পার হলেই রাজবাড়ী। দুই ঘণ্টা লাগে মাত্র। তাই এই সৌখিনতা।"
তিনি বলেন, “এই রুটে আরও ৪-৫টি বাস রয়েছে। ভরলেই ছেড়ে দিচ্ছি। রোলিং হচ্ছে। যাত্রী বেশি থাকলে ৫-৭টাও ছাড়া যাবে।"
এক যাত্রী বললেন, "কালুখালি যাব। কালুখালি পর্যন্ত ৫০০ টাকা, এমনিতে সাড়ে ৪০০। এখন ৫০০ করে নিচ্ছে।"