Published : 08 May 2026, 12:54 AM
সংসদ সদস্যদের বসার জন্য উপজেলা পরিষদ ভবনে ‘পরিদর্শন কক্ষ’ বরাদ্দ দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত স্থানীয় সরকারের কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নির্বাচিত স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ।
এ সিদ্ধান্ত উপজেলা পরিষদের ওপর সংসদ সদস্যদের ‘কর্তৃত্ব’ বাড়াবে বলে মনে করছেন তারা।
উপজেলা চেয়ারম্যানরা বলছেন, এ উদ্যোগ স্থানীয় সরকারের ওপর আইন প্রণতাদের ‘প্রভাব’ বাড়াবে; যা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে দুর্বল বা বিলুপ্ত করবে।
তবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এসব উৎকণ্ঠা ও শঙ্কার কথা মানতে নারাজ।
তিনি বলেন, পরিদর্শন কক্ষ শুধু সংসদ সদস্যদের জন্য নয়; মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বসার জায়গা হিসেবে বিবেচিত হবে।
“আমি বলছি এটা পরিদর্শন কক্ষ। পরিদর্শন কক্ষ কোনো ব্যক্তির জন্য নির্ধারিত না। এখানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে যেই যাবেন, সে ওই রুম ব্যবহার করবেন এবং উপজেলা পরিদর্শন করবেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলবেন, এক দুই ঘণ্টা থাকবেন, পরে চলে আসবেন।”
তার মতে, এতে সংসদ সদস্যদের স্থানীয় সরকারের ওপর প্রভাব প্রতিপত্তি খাটানোর কোনো সুযোগ নাই।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ২১ এপ্রিল এক আদেশে উপজেলা পরিষদ ভবনে সংসদ সদস্যদের বসার জন্য আলাদা জায়গা হিসাবে ‘উন্নতমানের’ আসবাবে সজ্জিত ‘পরিদর্শন কক্ষ’ প্রস্তুত করতে নির্দেশনা দেয়।
বিদ্যমান উপজেলা পরিষদ ভবনগুলোর দ্বিতীয় তলায় এ কক্ষ প্রস্তত করতে বলা হয়েছে। আর নতুন উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও দ্বিতীয় তলায় এমন একটি কক্ষ রাখার জন্য ডিপিপির নকশা ও পরিকল্পনায় সংস্থান রাখতে বলা হয়।
‘দুর্বল হবে স্থানীয় সরকার’
উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও গাজীপুর সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ইজাদুর চৌধুরী মিলনের দাবি, এমপিদের জন্য এ ‘পরিদর্শন কক্ষ’ স্থানীয় সরকারের ওপর আইন প্রণেতাদের কর্তৃত্ব স্থাপন করবে; যা স্থানীয় ব্যবস্থাকে দুর্বল এমনকি বিলুপ্ত করতে পারে।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “উনাদের (সংসদ সদস্য) জন্য সরকার ন্যাম ভবন করেছেন। সেখান থেকে তারা সংসদে আইন প্রণয়ন করবে। কোনো কিছু প্রয়োজন হলে তা সংসদে আলোচনা করবেন। পরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় আমাদের (উপজেলা পরিষদকে) তা বাস্তবায়ন করতে বললে, আমরা তা করবো। কিন্তু উপজেলা পরিষদে অফিস দেওয়া হলে তারা পরিষদের ওপর সরাসরি কর্তৃত্ব স্থাপন করবে।
“উনাদের খেয়াল খুশি মত তারা চেয়ারম্যানকে কাজ করতে বলবে। উপজেলা পরিষদ তথা স্থানীয় সরকার দুর্বল হবে। এটি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করার প্রথম ধাপ।”
এ উদ্যোগ স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আইন প্রণেতাদের সরাসরি ‘সংঘাতের’ সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন সাবেক এ বিএনপি নেতা ও সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা মিলন।
তিনি বলছেন, “আমি কিছু কিছু উপজেলা পরিষদের কথা জানি, যেখানে এমপিদের বসার জায়গা দেওয়া হলে উপজেলা চেয়ারম্যানের লোকজনের সঙ্গে এমপির লোকজনের প্রতিদিন মারামারি হবে।”
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী উপজেলা পরিষদগুলোতে কক্ষ প্রস্তুতের কাজ শুরু হয়েছে কিনা, সে বিষয়ে চেয়ারম্যানরা এখনো কিছু জানেন না বলেও দাবি তার।
চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল জব্বার চৌধুরীর মতে, উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের বসার জায়গা দেওয়ার মাধ্যমে স্থানীয় সরকার তথা উপজেলা পরিষদের স্বাধীনতা খর্ব হবে।
এর মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হতে পারে বলে তিনিও মনে করছেন।
জব্বার চৌধুরী বলেন, “এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন বলে এমপিরা তাদের কাজটা বাদ দিয়ে স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধির প্রত্যেকটা কাজে তদারকি করবেন। তখন স্থানীয় সরকারের সঙ্গে তাদের প্রতিদিনই একটা না একটা সমস্যা তৈরি হবে; যা এমপি ও উপজেলা পরিষদের মধ্যে দূরত্ব বাড়াবে।
“এমনটা হলে স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিরা এমপিদের কথার বাইরে কোন কথাই বলতে পারবে না। তাদের কোন স্বাধীনতা থাকবে না। ফলে উপজেলা পরিষদ আরও দুর্বল হবে।”

‘পরিদর্শন কক্ষ বরাদ্দ অসাংবিধানিক’
উপজেলা পরিষদ ভবনে সংসদ সদস্যদের জন্য পরিদর্শন কক্ষ বরাদ্দের উদ্যোগকে ‘অসাংবিধানিক’ ও ‘আদালতের রায়ের পরিপন্থি’ বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ বদিউল আলম মজুমদার।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমক বলেন, “আদালত এমপিদের স্থানীয় সরকারে যুক্ত হওয়াকে অসাংবিধানিক বলে আখ্যায়িত করেছেন। এটি একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। কারণ এর মাধ্যমে আমাদের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা- যা কেন্দ্রীয় সরকারের সমান্তরাল সংবিধান স্বীকৃত আরেকটি সরকার- তা ধ্বংস হয়ে যাবে। এর মাধ্যমে ‘এমপি রাজ’ সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দেবে।”
পরিদর্শন কক্ষ বরাদ্দের এই উদ্যোগ সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন দাবি করে তিনি বলছেন, “ওই অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যদের সুস্পষ্টভাবে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এটি সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদেরও পরিপন্থি, কারণ এই অনুচ্ছেদে শুধু নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদেরকেই এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে; আইনসভার সদস্য হিসেবে এমপি সাহেবদেরকে নয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে ‘মুখের কাজ (খাওয়া) নাকের মাধ্যমে’ করার পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে।
“এটি আমাদের হাই কোর্টের দেওয়া আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বনাম বাংলাদেশ মামলার রায়ের লঙ্ঘন। ওই মামলার রায়ে হাই কোর্ট ২০০১ সালে চার দলীয় জোট সরকারের আমলে জেলা মন্ত্রী পদ সৃষ্টি করে জারি করা একটি প্রজ্ঞাপনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। একইসাথে মন্ত্রী, হুইপ, এমপি প্রমুখের স্থানীয় উন্নয়নে সম্পৃক্ত হওয়াকে অসাংবিধানিক বলে রায় দেন। এই সিদ্ধান্ত বিএনপির ৩১ দফা এবং দলটির নির্বাচনি ইশতেহারে স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার অঙ্গীকারের পরিপন্থি। হতাশার বিষয় হল যে, এই স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী দল নির্বিশেষে সব সংসদ সদস্য একমত।”
‘এমপিদের দায়িত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হবে’
উপজেলা পরিষদে বসার জায়গা দেওয়া হলে তা এমপিদের মূল দায়িত্ব আইন প্রণয়নকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে মত নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মো. আব্দুল আলীমের।
তিনি বলেন, "আমাদের বর্তমান যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, এরকম যদি চলতে থাকে তাহলে উপজেলা পরিষদে এমপিদের অফিস দিলে স্থানীয় প্রশাসনে তাদের হস্তক্ষেপ বাড়াই খুব স্বাভাবিক। কিন্তু এটা যদি কোন উন্নত গণতন্ত্রে ঘটে, তখন হয়ত এটা ঘটবে না। কারণ আমাদের এমপিরা বহু আগে থেকেই নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত, যেটা মূলত তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না বেস্ট প্র্যাকটিস অনুযায়ী।
"কাজেই এই জিনিসগুলো পৃথকীকরণ না করে যদি এই কাজগুলো করা হয়, তাহলে উপজেলা পরিষদে এমপিদের নজরদারি খবরদারি, তাদের সম্পৃক্ততা বাড়বে, তাতে কোন সন্দেহ নাই। তাতে করে এমপির যে প্রধান দায়িত্ব আইন প্রণয়ন সেটাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
বিকল্প কী হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে এ নির্বাচন বিশেষজ্ঞ বলেন, “যদি করতেই হয় তাহলে খুব পরিষ্কারভাবে এমপিরা কী করতে পারবেন, কী পারবেন না এটা চিহ্নিত করে তারপরে এগোতে হবে।”
সরকারের এ উদ্যোগকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলামও।
তিনি বলেন, “এমপিদের আসলে উপজেলা পরিষদ বা উপজেলা প্রশাসনে কোনো কাজ নেই। ফলে তারা যখন শারীরিকভাবে উপজেলা পরিষদে উপস্থিত থাকবেন স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে তখন আসলে এক ধরনের প্রভাব বিস্তার সুযোগ পাবেন। কারণ আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি হলো ক্ষমতার অপপ্রয়োগ। এটা এমপিদের তরফে স্থানীয় সরকারের ওপরে অগ্রহণযোগ্য চাপ তৈরি করবে।”
সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ আসনে অফিস থাকতে পারে, তবে সেটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাবের বাইরে রাখতে হবে বলেও মন্তব্য করেন অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম।
“এমপিদের বসার জায়গা স্থানীয় দলীয় অফিসে হতে পারে বা বাইরে কোথাও প্রাইভেট অফিস ভাড়া করতে পারে। একটা অফিস থাকা দরকার এটা সত্য। এটা পৃথিবীর অন্যান্য গণতন্ত্রে আছে।”
উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের অফিস স্থানীয় সরকারের ওপর তাদের ‘কর্তৃত্ব ও খবরদারির রাস্তা’ প্রশস্ত করবে এবং এই ধরনের পদক্ষেপ উপজেলা পরিষদে সমান্তরাল ক্ষমতার ‘দ্বৈত কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করবে বলে মনে করছে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক।
সংবাদমাধ্যমে গত ২৩ এপ্রিল দেওয়া বিবৃতিতে এই উদ্যোগ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “এর মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের কর্তৃত্ব ও খবরদারীর রাস্তা প্রশস্ত হবে।”