Published : 12 Apr 2026, 06:08 PM
দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে সংবিধানের প্রতি অবিচল থাকার বার্তা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘দুর্নীতি, দায়িত্বে অবহেলা ও ক্ষমতার অপব্যবহার’ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
একটি ‘আধুনিক ও সময়োপযোগী’ সশ্স্ত্র বাহিনী গড়ে তুলতে বিএনপি সরকারের অঙ্গীকারের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
রোববার সকালে ঢাকা সেনানিবাসের কেন্দ্রীয় মিলনায়তন সেনা প্রাঙ্গণে সশস্ত্র বাহিনীর এক দরবারে তারেক রহমান নানা দিকনির্দেশনা দেন।
১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করেছে বিএনপি।
সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী এই প্রথম সশস্ত্র বাহিনীর দরবারে বক্তব্য রাখলেন।
এদিন সকালে ঢাকা সেনানিবাসের সেনা প্রাঙ্গণে দরবারে পৌঁছলে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান তার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান।

‘সংবিধানের প্রতি অবিচল থাকবেন’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আপনাদের সংবিধান, শপথ, শৃঙ্খলা এবং কমান্ডের প্রতি অবিচল থাকতে হবে। আমাদের সকলকে মনে রাখতে হবে, নিজেদের পেশাগত দক্ষতা ক্রমাগত উন্নয়ন, উন্নত করার কোনো বিকল্প নেই।”
আধুনিক যুদ্ধ ক্ষেত্রে শুধু প্রযুক্তি নয়, কৌশল ও দক্ষতার গুরুত্ব তুলে ধরে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, এর জন্য সমন্বয় এবং কৌশলগত চিন্তাশক্তির সংমিশ্রণ থাকতে হবে অবশ্যই।
“জনগণের সঙ্গে আপনাদের সম্পর্ক হবে আস্থা বিশ্বাস ও গভীর দায়িত্ববোধের। এর ভিত্তিতেই গড়ে উঠবে এক অটুট বন্ধন। এই বন্ধনই আপনাদের শক্তি এবং প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।”
তিনি বলেন, “আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক সশস্ত্র বাহিনীকে শুধু শেষ ভরসার আশ্রয়স্থল হিসেবেই দেখেন না। বরং সাহস, দৃঢ়তা এবং নির্ভরতার প্রতীক হিসেবেও তারা আপনাদেরকে দেখেন।
“আপনাদের প্রতি জনগণের এই অকৃত্রিম আস্থা এবং ভালোবাসাই যেন আপনাদের অন্যতম চালিকাশক্তি ও অনুপ্রেরণা হয়।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দুর্নীতি, দায়িত্বে অবহেলা, অব্যবস্থাপনা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে নিজেকে সর্বতভাবে বিরত রাখতে হবে। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে দেশের সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করা এবং অপচয় রোধ করা আমাদের সবার নৈতিক এবং পেশাগত দায়িত্ব।”
আন্তর্জাতিক অঙ্গন, বিশেষত শান্তিরক্ষা মিশনে দেশের মর্যাদাকে সবকিছুর ওপর স্থান দেওয়ার আহ্বান জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, “কারণ আপনি সেখানে শুধুমাত্র একজন সৈনিক নন। বরং বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি।”

তিনি বলেন, “বাংলাদেশকে আমরা এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, যে বাংলাদেশ কারো আধিপত্য মেনে নেবে না, যে বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মাত্রা নির্ধারিত হবে পাস্পরিক সন্মান, স্বার্থ এবং সমতার ভিত্তিতে। এক্ষেত্রে সশ্স্ত্র বাহিনীর ভূমিকা অপরিসীম।”
সশস্ত্র বাহিনী দেশপ্রেমে অনড় থাকলে আগামী দিনে বাংলাদেশ আরও নিরাপদ থাকবে, আরও মর্যাদাশীল হবে, এ বার্তা দিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, “আমি আপনাদের আশ্বস্ত করে বলতে চাই, সশ্স্ত্র বাহিনীকে আমরা একটি আধুনিক ও সময়োপযোগী বাহিনী হিসেবে গঠন করতে বদ্ধপরিকর।”
‘বাংলাদেশ এগুবে দেশপ্রেমের শক্তিতে’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আজকের এই দরবার থেকে আমি একটি বার্তা দিতে চাই, বাংলাদেশ এগুবে শৃঙ্খলা, সক্ষমতা, আত্ম মর্যাদা এবং দেশপ্রেমের শক্তিতে। আর সেই অগ্রযাত্রায় আমরা আমাদের সহযোদ্ধা হিসেবে আপনাদের গৌরবময় সশ্স্ত্র বাহিনীকে পাশে পেতে চাই।
“সশ্স্ত্র বাহিনী যে কারণে গঠিত হয়েছে, সকল কাজে আমরা সেই উদ্দেশ্যকে সাথে রাখতে চাই। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ সশ্স্ত্র বাহিনী হবে ইনশাআল্লাহ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ, পেশাদার, আধুনিক ও মর্যাদাপূর্ণ বাহিনী।”
তিনি বলেন, “আসুন আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করব এবং সংবিধানের মর্যাদা সমুন্নত রাখব এবং জনগণের আস্থা অটুট রাখব এবং সর্বপরি আমরা বাংলাদেশকে ভালোবাসব কর্মে, শপথে এবং ত্যাগে।”
সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও এ দেশের সন্তান এবং এদেশের মাটি-মানুষের সঙ্গে সবার বেড়ে ওঠার কথা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, “এ মাটি ও মানুষের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা আমাদের সকলের ঈমানি দায়িত্ব। আমি গভীরভাবে উপলব্ধি করি, একজন সৈনিকের জীবন দেশের আর ৮/১০ জন সাধারণ নাগরিকের মতো নয়, কিংবা চাকরি নয়।
“সৈনিক জীবন একটি পেশা, ত্যাগের নাম। এটি একটি পবিত্র শপথ এবং দেশের স্বার্থে প্রাণ উৎসর্গ করার এক চরম সংকল্প। সেই কাজটি আপনারা সাহসের সঙ্গে করছেন। আমি বিশ্বাস করি, আমরা সকলে যদি যে যার অবস্থান থেকে যার যার ভূমিকা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করি তাহলে দেশের স্বার্থবিরোধীরা আর বাংলাদেশকে তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারবে না।”
সবাই মিলে ভালো থাকার জন্য একটি গণতান্ত্রিক মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই বর্তমান সরকার কাজ করছে তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ থাকলে, দেশের স্বার্থে থাকলে, আমরা অবশ্যই বাংলাদেশকে আমাদের কাংখিত বাংলাদেশ, প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হবো।”
‘সশস্ত্র বাহিনী একটি রাষ্ট্রের শক্তি’
সশস্ত্র বাহিনী কোনো ব্যক্তি, পরিবার কিংবা দলের সম্পদ নয়, এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সশস্ত্র বাহিনী একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের শক্তি এবং মর্যাদা প্রতীক। রাষ্ট্রীয় সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং জনগণের অবিচল আস্থা হতে হবে সশস্ত্র বাহিনীর পথ চলার প্রধান ভিত্তি।
“দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে আমাদের প্রতিটি সদস্যের এক মাত্র এবং পবিত্র চূড়ান্ত দায়িত্ব।”
পেশাদারিত্বের প্রশ্নে কোনো আপস না করে সশস্ত্র বাহিনীকে একটি সুউচ্চ আদর্শিক অবস্থানে থাকার ওপর জোর দেন তারেক রহমান।
তিনি বলেন, “রাষ্ট্রীয় মর্যাদা রক্ষায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি স্তরে দেশপ্রেমের যে অগ্নিশিখা জ্বালিয়ে দিয়েছেন তা যেন অক্ষুন্ন থাকে।”
“২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা, ২১ নভেম্বর যৌথ সামরিক পূর্ণতা এবং ৭ নভেম্বর দেশপ্রেম ও পেশাদারিত্বের পুনর্জাগরণ, এই তিন অবিভাজ্য ধারা আমাদের সামরিক বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনীর ঐতিহ্যের মেরুদণ্ড।”
সরকারপ্রধান বলেন, “গণতান্ত্রিক দায়িত্ববোধ এবং দেশের সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত রেখে এই বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আগামী প্রজন্মের অনুপ্রেরণা হিসেবে টিকিয়ে রাখা আমাদের সকলের সম্মিলিত অঙ্গীকার।”
এ সময়ের নতুন বাস্তবতায় যুদ্ধ ও নিরাপত্তার ধরন বদলেছে, এ কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, “আজ নিরাপত্তা মানে কেবল স্থলসীমান্ত সুরক্ষা নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমুদ্র, আকাশ সাইবার স্পেস, তথ্য যুদ্ধ, প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উপকূলীয় নিরাপত্তা, জ্বালানি অবকাঠামো, সামুদ্রিক সম্পদ এবং আঞ্চলিক কৌশগত প্রতিযোগিতা।”
তিনি বলেন, সশস্ত্র বাহিনীকে সবকিছুকে গুরুত্বের সাথে নিয়ে পেশাগত দক্ষতা, কৌশলগত প্রজ্ঞা ও জ্ঞানভিত্তিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে। যাতে করে সশস্ত্র বাহিনী যে কোনো সমসাময়িক ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়।
এ বাস্তবতাকে সামনে রেখে সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়নকে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে বিশেষ প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলেছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
নির্বাচনের আগে ঘোষিত ইশতেহারে দেশের প্রতিটি খাতের সংস্কার এবং সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের অর্থ সামাজিক এবং জীবনমান উন্নয়নের লক্ষে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এবং কর্মসূচি প্রকাশ করার বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতা উন্নয়নের লক্ষ্যে দেশের প্রায় চার কোটি পরিবারের নারী প্রধানের কাছে আমরা ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে চাই পর্যায়ক্রমে।”
এছাড়া ক্রীড়া কার্ড চালু, দেশের মসজিদের ইমাম, খতিব, মুয়াজ্জিন এবং সকল ধর্মাবলম্বী ধর্মীয় প্রধানদের জন্য আর্থিক সম্মানী, কৃষকদের ১০ হাজার টাকার কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ, প্রবাসী কার্ড চালুর কথাও তুলে ধরেন তিনি।
দরবারে ঢাকায় অবস্থানরত সামরিক ও অসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন এবং দেশের অন্যান্য স্থানে অবস্থানরত সদস্যরা ভিডিও টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে অংশগ্রহণ করেন।
দরবারে বক্তব্য দেওয়ার পর সেনা কর্মকর্তা ও সৈনিকদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী।