Published : 07 May 2026, 06:32 PM
স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য কমাতে সরকারিভাবে প্রাথমিক সেবা নিশ্চিত করতেই হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তার ভাষায়, “আমরা দেখেছি এবং আপনাদের (বিআইডিএসের) গবেষণায় এসেছে, সেটা হচ্ছে বৈষম্য কমানো যাবে—যদি স্বাস্থ্যখাতে আপনার ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানো যায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যে, কোথায় ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানো হবে?
“আমরা মনে করি যে, আসলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা দরকার প্রথমে। আমরা এটাও মনে করি যে আপনার সেকেন্ডারি যে স্বাস্থ্যসেবা এবং টারশিয়ারি যে স্বাস্থ্যসেবা—এই তিনটার মধ্যে আমরা মনে করছি যে, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা সরকারকে করতেই হবে।”
বৃহস্পতিবার আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সম্মেলন কক্ষে সংস্থাটির এক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন। স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে নাগরিকের কী পরিমাণ অর্থ গুনতে হয় এবং অর্থ সংকটে সেবাগ্রহণ ব্যাহত হওয়া সম্পর্কিত একটি গবেষণা প্রবন্ধ সেখানে উপস্থাপন করা হয়।
বিএনপি সরকারের উদ্যোগের কথা তুলে ধরতে গিয়ে অনুষ্ঠানে উপদেষ্টা তিতুমীর বলেন, “আমরা মনে করছি যেহেতু আমরা স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার হিসেবে দেখছি, যেহেতু আমাদেরকে রাইটস অনুযায়ী এটাকে দেখতে হচ্ছে, তো আমরা চিন্তা করছি যে বিশেষ করে ২৫০ শয্যার যে হাসপাতালগুলো আছে, সেখানে অন্তত তিনটি বিষয়—এটা এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি আমরা আলোচনার মধ্যে আছি—তিনটি বিষয় কীভাবে নিশ্চিত করা যায়।
“একটা হচ্ছে কার্ডিয়াক করোনারি ইউনিট। কিডনি ডায়ালাইসিস এবং তৃতীয় হচ্ছে কমপ্লিকেটেড গাইনি অ্যান্ড অবস্টেট্রিক্স কেয়ার। এই তিনটা খুবই জরুরি; কারণ হচ্ছে আমরা দেখছি এটা একটা বড় সমস্যা এবং সেখান থেকে উত্তরণ কীভাবে করা যায়।”
জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নাগরিকের অধিকার পূরণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তিনি বলেন, “আমাদের বর্তমান সরকার মনে করছে যে—অর্থাৎ গর্ভদশা থেকে আপনার শেষ যাত্রা পর্যন্ত রাষ্ট্রের একটা দায়িত্ব আছে।
“এবং এই দায়িত্ববোধটা দাতব্য নয়, এটা একটা অধিকার ভিত্তিক এবং এটা হচ্ছে পূর্ণ জীবনচক্র ভিত্তিক।”
সংবিধান সংশোধন করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে দরিদ্রদের জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন।
তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, এজন্য গ্রামে ও শহরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা চিকিৎসক নিয়োগ দিতে হবে। গ্রামে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্র একত্রিত করে এবং শহরে ওয়ার্ডভিত্তিক কেন্দ্র গড়ে প্রথম স্তরে প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রেফারেল ব্যবস্থা কাঠামোবদ্ধ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক রেফারেল ব্যবস্থা করতে হবে যেন রোগীরা সঠিক সময়ে সঠিক স্তরের সেবা পায়।
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সর্বজনীন প্রাপ্যতা একটি মৌলিক স্বাস্থ্য অধিকার হিসেবে চিহ্নিত করার সুপারিশও আসে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অন্য মৌলিক অধিকার নিশ্চিতে বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলেন অর্থ উপদেষ্টা তিতুমীর। সেক্ষেত্রে ‘অপচয়’ না করারও প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
তিতুমীর বলেন, “আমাদের দরকার হচ্ছে যে আমরা (জিডিপির) ৫ শতাংশে যেতে চাই এবং ৫ শতাংশ যেন সংশোধিত বাজেটে পুরোটাই ব্যয় হয়।
“আবার তার মানে এই না—অপচয় করে ব্যয় করা বা ব্যয় বৃদ্ধি করে ব্যয় করা।”

তিনি বলেন, “তার মানে হচ্ছে যে ব্যয় বৃদ্ধি না আসলে বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে যেহেতু স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়লে আসলে বৈষম্য কমে যায়; সেই জন্য ব্যয় বাড়ানো।”
সেমিনারে গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো আব্দুর রাজ্জাক সরকার।
প্রবন্ধে বলা হয়, ২২ শতাংশ মানুষ মাসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন বলে তুলে ধরেছেন। তবে এর ৬৫ শতাংশ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারেন না। মাসে একটি পরিবার গড়ে ৩ হাজার ৪৫৪ টাকা স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় করে, যা পরিবারটির মাসিক পুরো ব্যয়ের ১১ শতাংশ।
গবেষণা অনুযায়ী, চাহিদা অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবা সবচেয়ে বেশি অপূরণীয় থেকে যায় নড়াইলে (৮১ শতাংশ) ও হবিগঞ্জে (৮০ শতাংশ)। আর সবচেয়ে কম অপূরণীয় থাকে ফেনীতে (১৮ শতাংশ)।
যারা হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন, তাদের মধ্যে বাৎসরিক হিসেবে সবচেয়ে বেশি খরচ দেখা যায় ক্যান্সার ও কোভিড চিকিৎসায়।
ক্যান্সারে সর্বনিম্ন ৩ হাজার ১০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৮ লাখ ৪৭ হাজার ৯০০ টাকা নিজেদের অর্থ খরচের তথ্য উঠে এসেছে গবেষণায়। আটজনের তথ্যে বছরে গড় খরচ ছিল ২ লাখ ২৩ হাজার ৯৩৮ টাকা। কোভিডে ৩৬ জনের গড় হিসাবে খরচ দাঁড়ায় ১ লাখ ৩১ হাজার ৭০৯ টাকা।
গবেষক ২০২২ সালের খানার আয় ও ব্যয় জরিপের ওপর ভিত্তি করে এসব ফল তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানের সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, যেসব ক্ষেত্রে সরকার স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে বা ব্যয় করে, সেখানে দেখা যায় বৈষম্য কম।
এক্ষেত্রে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেখানে গরিব ও নারীরা যেভাবে বৈষম্যহীনভাবে সেবা পাচ্ছেন, সেভাবে বেসরকারি খাতে সেবা পান না।
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, কেবল অর্থ বা সামর্থ্য থাকলেই স্বাস্থ্যসেবা নিতে যান না সবাই। সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্যশিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি দরকার।
উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগে বরাদ্দ থাকলেও দেখা যায়, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) সেই ব্যয় একদমই বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
এ বাস্তবতায় বরাদ্দের সঙ্গে সঙ্গে কোথায় এবং কীভাবে সরকার খরচ করবে, সেখানে সরকারের প্রাধিকার ঠিক করার কথা বলেন এ অর্থনীতিবিদ।