Published : 29 Jan 2025, 08:10 PM
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে পূর্বাচলে প্লট বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগে দায়ের করা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় আসামি হওয়ার পর গ্রেপ্তার আতঙ্কে অফিসে আসছেন না পূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজউকের কর্মকর্তারা।
এমন অবস্থায় তাদের নাম পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে দুদকে চিঠি দিয়েছেন রাজউক চেয়ারম্যান মো. ছিদ্দিকুর রহমান সরকার।
গত ১৬ জানুয়ারি পাঠানো চিঠিতে রাজউকের ভূমি বরাদ্দের বিধিবিধানের আলোকে প্লট বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে চেয়ারম্যান বলেছেন, রাজউক, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সরকারের আদেশ পালন করেছে মাত্র।
এ বিষয়ে রাজউক চেয়ারম্যান ছিদ্দিকুর রহমান সরকার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দুদকের মামলায় আসামির তালিকায় এমন লোকজন রয়েছেন যারা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন বা চিঠিপত্র রিসিভ করেছেন বা ডেসপাচ করেছেন। তারা তো এই প্লট জালিয়াতি, অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। কিন্তু তাদের সমানভাবে অপরাধী করা হয়েছে।”
শেখ পরিবারকে প্লট বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগে দুদক মোট ছয়টি মামলা করেছে। এসব মামলায় শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা, তাদের ছেলে-মেয়ে ছাড়াও রাজউক, পূর্ত মন্ত্রণালয়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে।
রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, “তারা (কর্মকর্তারা) অফিসে আসছেন না দুদকের মামলায় গ্রেপ্তারের ভয়ে। অফিসের প্রাত্যহিক কার্যক্রম চালনো মুশকিল হয়ে গেছে। তাদের ভয় থেকে বাঁচানোর জন্য আমরা বলেছি, আসলেই যদি তারা সত্যিকারভাবে দায়ী থাকে, আইন ভঙ্গ করে থাকে সেটি আরো বিশ্লেষণ করে যেন তাদের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়।
“প্রকৃত দোষী যদি কেউ হয়...আইন ভঙ্গ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে প্লট দিয়েছে, সে অবশ্যই দোষী তার শাস্তি হোক। কিন্তু কেরানি, কম্পিউটার অপারেটর যারা সিস্টেমে পড়েছে তাদের বিষয়টি যাচাই বাছাই করার জন্য বলেছি।
রাজউক চেয়ারম্যানের চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও গৃহায়ন গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পত্রের আলোকে রাজউকের ভূমি বরাদ্দ নীতিমালার আওতায় পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ, শেখ রেহানা, আজমিনা সিদ্দিক ও রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের অনুকূলে ১০ কাঠা আয়তনের ছয়টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়।
রাজউকের প্লট বরাদ্দ বিধিমালায় কোন কোন ক্ষেত্রে সরকার প্লট বরাদ্দ প্রদান করতে পারবে তাও চিঠিতে তুলে ধরা হয়েছে।
এছাড়া আইনের অধীনে চেয়ারম্যান ও অন্য সদস্যরা নির্ধারিত বা সময় সময় অর্পিত দায়িত্ব ও ক্ষমতা প্রয়োগ করেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের অনুকূলে রাজউকের প্লট সরকারের আইন ও বিধি মোতাবেক সরকারের লিখিত আদেশে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে চিঠিতে বলা হয়েছে, “দুদকের মামলায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজউকের কর্মকর্তাদের নাম শামিল করা হয়েছে। কিন্তু তাদের উপর আইন ও বিধির আলোকে বর্ণিত প্লটসমূহ বরাদ্দ প্রদানের কাজ সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা ছিল। সরকারের আদেশ মোতাবেক কাজ সম্পন্ন না করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণের বিরুদ্ধে বর্ণিত আইন ও বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো।
“সুতরাং, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজউক এর কর্মকর্তাগণ যেহেতু উক্ত আইন ও বিধি বহির্ভূত কোনো কাজ করেনি সেহেতু তাদের নাম মামলায় সংযুক্ত করা সমীচীন হয়নি মর্মে প্রতীয়মান হয়।”
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। সে দিন ভারতে পালিয়ে যান তিনি। তার পরিবারের অন্যরাও দেশের বাইরে।
তারপর ২৬ ডিসেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারের পাঁচ সদস্যের নামে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ছয়টি প্লট বরাদ্দে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।
অনুসন্ধানে প্লট বরাদ্দে অনিয়মের পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়ারে কথা গত ১২ জানুয়ারি জানান দুদকের উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম।
পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের ২৭ নম্বর সেক্টরের কূটনৈতিক জোনের ২০৩ নম্বর সড়কের আশপাশের এলাকায় শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, ছোট বোন শেখ রেহানা এবং তার ছেলে-মেয়ে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও আজমিনা সিদ্দিকের নামে প্লটগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনা ১০ কাঠার প্লট (প্লট নম্বর ০০৯) বরাদ্দ পেয়েছেন। ২০২২ সালের ৩ অগাস্ট তার নামে রাজউক প্লটের বরাদ্দপত্র দেয়।
সজীব ওয়াজেদ জয় (প্লট নম্বর ০১৫) এবং মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলও (প্লট নম্বর ০১৭) ১০ কাঠা করে প্লট পেয়েছেন।
জয়ের বরাদ্দপত্র ২০২২ সালের ২৪ অক্টোবর দেওয়া হয় এবং ১০ নভেম্বর মালিকানা সংক্রান্ত রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়। পুতুলের বরাদ্দপত্র দেওয়া হয় ওই বছরের ২ নভেম্বর।
শেখ রেহানাও ১০ কাঠার প্লট (প্লট নম্বর ০১৩) বরাদ্দ পেয়েছেন। তার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের (প্লট নম্বর ০১১) এবং মেয়ে আজমিনা সিদ্দিকের (প্লট নম্বর ০১৯) নামেও একই পরিমাণের প্লট বরাদ্দ হয়েছে।
গত বছরের অক্টোবর শেখ হাসিনার পরিবারের ছয় সদস্যের নামে পূর্বাচলে প্লট বরাদ্দে অনিয়ম নিয়ে সংবাদমাধ্যমে আসা অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে দেয় হাই কোর্ট।
একইসঙ্গে এ কমিটিকে আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১৫ বছরে (২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে) রাজউকের প্লট বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগও তদন্ত করতে বলা হয়।