Published : 29 Jun 2026, 09:15 AM
ছয় বছর আগে বুড়িগঙ্গায় লঞ্চ ডুবে ৩৪ জনের মৃত্যুর মামলার বিচার ৬ বছরেও শেষ হয়নি। কবে নাগাদ বিচার শেষ হবে তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। স্বজন হারিয়ে বিচারের অপেক্ষায় দিন পার করছে ভূক্তভোগী পরিবারগুলো।
২০২০ সালের ২৯ জুন ঢাকার শ্যামবাজারের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চডুবিতে ৩৪ জনের মৃত্যুর ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দেয়।
এমএল মর্নিং বার্ড নামের ওই লঞ্চটি মুন্সিগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে যাত্রী নিয়ে সদরঘাটের দিকে আসছিল। সকাল সোয়া ৯টার দিকে শ্যামবাজারের কাছে নদীতে ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় সেটি ডুবে যায়।
‘অবহেলাজনিত মৃত্যু’ ঘটানোর অভিযোগ এনে ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক, মাস্টারসহ সাতজনের বিরুদ্ধে ওইদিনই দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ থানায় মামলা করেন নৌ-পুলিশ সদরঘাট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ শামসুল। পরের বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক মোসাদ্দেক হামিদ ছোয়াদসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় সদরঘাট নৌ থানার এসআই শাহিদুল আলম।
অন্য আসামিরা হলেন-ময়ূর-২ লঞ্চের মাস্টার আবুল বাশার মোল্লা, সহকারী মাস্টার জাকির হোসেন, চালক শিপন হাওলাদার, শাকিল হোসেন, সুকানি নাসির হোসেন মৃধা, গিজার হৃদয় হাওলাদার, সুপারভাইজার আব্দুস সালাম, সেলিম হোসেন হিরা, আবু সাঈদ ও দেলোয়ার হোসেন সরকার। আসামিরা সবাই উচ্চ আদালত থেকে জামিনে রয়েছেন।

২০২২ সালের ১৮ জানুয়ারি আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় আদালত। ঢাকার পঞ্চম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ রেজওয়ানুজ্জামানের আদালতে মামলাটি বিচারাধীন। সাক্ষ্যগ্রহণ, আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানি, সাফাই সাক্ষ্যের পর্যায় শেষ হয়েছে। এখন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হলেই তা রায়ের পর্যায়ে যাবে।
সবশেষ গত ১৫ মে মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য দিন ধার্য ছিল। তবে ওইদিন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন হয়নি। আগামী ৬ জুলাই যুক্তিতর্কের পরবর্তী দিন রাখা হয়েছে।
আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর খান মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, “মামলাটি এখন সবশেষ পর্যায়ে যুক্তিতর্কের জন্য আছে। আসামিপক্ষ বিচার বিলম্ব করতে সময়ক্ষেপণ করছে।
“এজন্য বিচার শেষ হয়নি। যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে করে দ্রুত রায় যেন হয় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সেই চেষ্টা করব। ভূক্তভোগী পরিবারগুলো যেন ন্যায়বিচার পায়।”
ওই ঘটনায় মুন্সীগঞ্জের রিকাবীবাজার গ্রামের পাঁচজন নিহত হন। তাদের একজন শিপলু।
যোগাযোগ করা হলে তার বাবা বলেন, “ছেলেটা পড়াশোনা শেষ করে। পরে আমার সাথে ঢাকায় ব্যবসা করতো। আমরা মামলা করিনি। পুলিশ মামলা করছে। যাদের কারণে এতো বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে, তাদের সাজা হোক।”

একই গ্রামের দুই ভাই-বোনকে হারান আওলাদ হোসেন।
তিনি বলেন, “আমার ছোট ভাই দিদার হোসেন আমার সাথেই চাকরি করতো। মাঝে-মধ্যেই সে বাড়ি আসা-যাওয়া করতো। আর আমার এক বোন ঢাকায় থাকে।
“তার বাসায় যাচ্ছিল ছোট বোন হাফেজা খাতুন রুমা। দুইজনই ওই দুর্ঘটনায় মারা যায়। যাদের অবহেলার এ দুর্ঘটনা ঘটেছে, তাদের শাস্তি চাই।”
আসামিপক্ষের আইনজীবী শাহ জালাল বলেন, “এই মামলায় কোনো চাক্ষুষ সাক্ষী নাই। যারা সাক্ষী দিয়েছেন তারা বলছেন, ‘দেখেছি, ছিলাম’।
“কোনো আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। কোনো সাক্ষী আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনতে সক্ষম হয়নি। আশা করছি, আসামিরা খালাস পাবেন।”
আকারে বহুগুণ বড় লঞ্চ ‘ময়ূর-২’ এর ধাক্কায় ছোট লঞ্চ ‘এমএল মর্নিং বার্ড’ কেমন করে মুহূর্তের মধ্যে বুড়িগঙ্গায় ডুবে গিয়েছিল, সেই দৃশ্য ধরা পড়ে সদরঘাটের একটি সিসি ক্যামেরার ভিডিওতে।
সেই ভিডিও দেখে তৎকালীন নৌপ্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছিলেন, “যেভাবে ঘটনা ঘটেছে, আমার মনে হয়েছে এটা পরিকল্পিত। এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়, হত্যাকাণ্ড।”
লঞ্চ মালিক ছোয়াদের আইনজীবী সুলতান নাসের বলেন, এ মামলায় মূল সাক্ষীদের সাক্ষ্য শেষ হয়েছে। তাদেরটা তারা বলেছে। আসামিপক্ষ নিজেদের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেবেন।
“তারা তাদের অবস্থান স্ট্যাবিলিস্ট করবেন। তবে মূল সাক্ষীদের কেউ বলতে পারেনি, কোন লঞ্চ কাকে ধাক্কা দিয়েছে। তারা শুধু লঞ্চ ডুবতে দেখেছে। প্রত্যাশা করছি, আসামিরা মামলার দায় থেকে খালাস পাবেন।”
ময়ূর-২ লঞ্চের চালক শিপন হাওলাদারের বিষয়ে আইনজীবী নাসের বলেন, “ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে ঘটনার ৮ দিন আগে ২১ জুন তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। তাকেও সেই মামলায় আসামি করা হয়েছে।
“নৌ-অধিদপ্তর দুর্ঘটনা নিয়ে তদন্ত করে। সেই প্রতিবেদনে কিন্তু শিপনের নাম নেই। সঠিকভাবে তদন্ত হলে কয়েকজন আসামিই হতেন না।”