Published : 03 Jan 2026, 04:42 PM
এশিয়ার অন্যতম আলোকচিত্র উৎসব ‘ছবি মেলা’র ১১তম সংস্করণ শুরু হতে যাচ্ছে আগামী ১৬ জানুয়ারি।
যা চলবে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। শনিবার রাজধানীর দৃকপাঠ ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এবারের উৎসবের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়।
সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রদর্শনী উপভোগ করতে পারবে বলে আয়োজকেরা জানান।
দৃক পিকচার লাইব্রেরি ও পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগে ২০০০ সাল থেকে এ উৎসবটি আয়োজিত হয়ে আসছে।
এবারের উৎসবটি ১৬ দিনব্যাপী চলবে ঢাকার পাঁচটি স্থানে। সেগুলো হল-বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা, দৃকপাঠ ভবন এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ (সাউথ প্লাজা)। এই পাঁচ স্থান মিলিয়ে নয়টি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে।
এবারের সংস্করণে পাঁচটি মহাদেশের ১৮টি দেশ থেকে ৫৮জন অংশগ্রহণকারী একত্রিত হচ্ছেন।
উৎসব পরিচালক এএসএম রেজাউর রহমান বলেন, “২০২১ সালে করোনাকালীন বাস্তবতায় আমরা সীমিতভাবে একটি বিশেষ সংস্করণ ‘শুন্য’ এর আয়োজন করেছিলাম। এবারের ১১তম সংস্করণটি পরিপূর্ণভাবে আয়োজিত হছে ‘পুনঃ’ থিমের আলোকে। উপসর্গ ‘পুনঃ’ অর্থ আবার, নতুন করে কিংবা অন্যভাবে শুরু করা।
“বর্তমান বিশ্ব ও বাংলাদেশে আমরা সবাই মুখিয়ে আছি নতুন সময়ের জন্য, নতুন করে শুরু করার জন্য, সেই ভাবনা থেকে আমরা এবার ছবি মেলাকে নতুন করে ঢেলে সাজিয়েছি।"
যা যা থাকছে
কিউরেটর মুনেম ওয়াসিফ ও সরকার প্রতীক উৎসবের নানান প্রদর্শনীর বিষয়বস্তু সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন।
মুনেম ওয়াসিফ বলেন, "এবারে ছবি মেলার প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে তিনটি মূল জায়গা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখনকার পৃথিবী যে ধরনের সংঘাত ও দুশ্চিন্তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সেই ভাবনাকে মাথায় রেখে ‘বাট এ উন্ড দ্যাট ফাইটস’ প্রদর্শনীর মাধ্যমে ঢাকা-গাজা-করাচি-কাশ্মির হয়ে নানান জায়গার টানাপোড়েন ও শিল্পীরা তা কিভাবে দেখছেন- তা উঠে এসেছে।
"আমন্ত্রিত কিউরেটর তানভি মিশ্রার ‘রাইটস অব প্যাসেজ’ কাজটির মধ্য দিয়ে আমরা দেখতে পাব সীমান্তের ধারনার সূচনা, কিভাবে সীমান্ত মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে, কারা এই সীমান্তকে নিয়ন্ত্রণ করে, এপারে-ওপারে রিফ্যুইজি হয়ে যাওয়া এবং সীমান্তকে ঘিরে সংঘাত কিভাবে ইকোসিস্টেমের ওপর প্রভাব ফেলে।"
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ জানিয়ে মুনেম ওয়াসিফ বলেন, "ইয়াসমিন ইদ-সাব্বাহ ও লালে বার্গম্যান হোসেন পরিকল্পিত ‘(আন)লার্নিং প্যালেস্টাইন’—যাতে একটি রিডিং রুম থাকবে। যেখানে ফিলিস্তিনি গল্পগুলোকে বিভিন্ন বই, চিঠি, ইলাস্ট্রেশন, ছবির মধ্য দিয়ে মানুষ ফিলিস্তিনি ইতিহাস জানতে পারবে ও বুঝতে পারবে।"
সরকার প্রতীক বলেন, "এবারের উৎসবের মূল প্রদর্শনীস্থল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে অ্যাডাম ব্রুমবার্গ, আর্নেস্ট কোল ও সৈয়দ মুহাম্মদ জাকিরের তিনটি কাজ রাখা হয়েছে- যার মধ্যে স্থানের ও কাজের ভিন্নতা থাকলেও, থাকছে ইতিহাস, মানুষ, পরিবেশের সম্পর্ক।"
এবারের নয়টি প্রদর্শনীর সমাহারে রয়েছে তিনটি একক প্রদর্শনী: আলেসান্দ্রা সাঙ্গুঁইনেতির ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার্স অব গুইল এবং বেলিন্ডা অ্যান্ড দ্য এনিগম্যাটিক মিনিং অব দেয়ার ড্রিমস’; বানি আবিদির ‘দ্য ম্যান হু টকড আনটিল শি ডিসঅ্যাপিয়ার্ড’।
আলোকচিত্রী আমানুল হকের ‘দ্য রোমান্টিক ডকুমেন্টেরিয়ান’ উৎসবের একটি বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকছে বলে জানানো হয়।
এতে আলোকচিত্রীর তোলা ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৭১’র স্বাধীনতা যুদ্ধ, বাংলাদেশের নদী ও গ্রামের ছবি থেকে শুরু করে প্রদর্শিত হবে সত্যজিৎ রায়ের নানান ছবি।
উৎসবে থাকছে জান্নাতুল মাওয়া ও ছবি মেলার একটি দলের গবেষণা থেকে উঠে আসা ‘উইমেন ইন দ্য জুলাই আপরাইজিং: এসেনশিয়াল দেন – হোয়াই ইরেজড নাউ?’ প্রদর্শনী।
আলোকচিত্রী জান্নাতুল মাওয়া সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “বৈষম্য নিরসনে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গনঅভ্যুত্থান হল- যেখানে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নারীদের অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে নারীদেরকে রাখা হয়নি। সেই প্রশ্ন থেকেই এ প্রদর্শনীর মাধ্যমে ২৫জন আলোকচিত্রীর কাজ দিয়ে নারীদের সেই উপস্থিতি ও অংশগ্রহণকে আবারো তুলে ধরা হচ্ছে, কেননা ছবি দলিলের কাজ করে। এবং বৈষম্যের সংগ্রাম এখনো চলছে, শেষ হয়নি।”
এবারের ছবি মেলা ফেলোশিপের সহয়তায় থাকছে প্রদর্শনী ‘ঢেউ’-যেখানে ভিন্ন ভিন্ন পটভূমির নয়জন ফেলো-শিল্পীর ইন্টারডিসিপ্লিনারি, লেন্স-ভিত্তিক চর্চার মধ্য দিয়ে করা নতুন কাজ প্রদর্শিত হবে। এই কাজগুলোর তত্ত্বাবধানে নির্দেশনা ও পরামর্শ দিচ্ছেন আমন্ত্রিত কিউরেটর সোহরাব জাহান এবং সহায়তা করছে দুর্জয় বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন।
এডুকেশন ডিরেক্টর খন্দকার তানভীর মুরাদ বলেন, "ছবি মেলায় সবসময় ভিজ্যুয়াল শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একইধারায় পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউট এবারে আমাক মাহমুদিয়ান, অর্ক দত্ত, বানি আবিদি, হাসিব জাকারিয়া, নিকোলাস পল্লি এবং রেনা এফেন্দির নেতৃত্বে ছয়টি বিশেষায়িত কর্মশালা পরিচালনা করবে।
"আরও থাকছে ১৬টি পাবলিক টক ও ৪টি গাইডেড ট্যুর; বিভিন্ন গুণী দেশি ও বিদেশি আলোকচিত্রীরা প্রায় ৭০ জন আলোকচিত্রীর পোর্টফলিও রিভিও করবেন। এছাড়া স্থানীয় স্কুলগুলোকে নিয়ে একটি শিক্ষামূলক প্রচার কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে, যাতে ১৫টি স্কুলের ৫০০ থেকে ৮০০ শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করবে। তাদের এবং তাদের শিক্ষকদের বিভিন্ন ম্যাটেরিয়াল নিয়ে বসা হবে যাতে করে বাচ্চাদের ভিজ্যুয়াল লার্নিং এর মধ্য দিয়ে ভিন্ন অভিজ্ঞতা হয়।"

ছবি মেলা সবসময় ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে: শহিদুল আলম
উৎসবের প্রধান উপদেষ্টা শহিদুল আলম বলেন, “ছবি মেলা সবসময় ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে এসেছে। এবারেও আন্তর্জাতিকভাবে ও নিজের দেশে, ক্ষমতাকে আমরা কতটা প্রশ্ন করছি – তা কাজগুলোতে দেখা যাবে।“
এবার ছবি মেলা শুরু হচ্ছে নির্বাচনের আগে। ছবি মেলার মধ্য দিয়ে কে কার কাজ কিভাবে দেখবে, তা দেখার একটা জায়গা ও ভিন্ন একটা নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে বলেও মনে করেন শহিদুল আলম।
তিনি বলেন, "সময়ের সাথে উৎসবের চরিত্র বদলেছে, মেন্টরশিপের মাধ্যমে কিভাবে এই যাত্রাকে জিইয়ে রাখা যায় পরিকল্পনা সেদিকে এগোচ্ছে। শুরু থেকে যারা সম্পৃক্ত থেকেছেন, পাঠশালার ছাত্র-শিক্ষকরা - তারাই আজ ছবি মেলাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন।"
ছবি মেলা শুরুর গল্প প্রসঙ্গে শহিদুল আলম বলেন, “১৯৯৪ সালে প্রথম সিদ্ধান্ত নেয় ছবি মেলা করার ও তার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করি ১৯৯৫ সালে। কিন্তু যে সপ্তাহে ছবি মেলা হওয়ার কথা ছিল – সে সপ্তাহেই বাংলাদেশে প্রথম এক-সপ্তাহব্যাপী হরতালের ডাক দেওয়া হয়। তখন কিভাবে সামাল দিব বুঝে উঠতে না পেরে আয়োজনটি বাতিল করা হয়েছিল।
"পরবর্তীতে নানান বাস্তবতায় আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম– ছবি মেলার সময়ে যত যাই হোক, ছবি মেলা করবো। ২০০০ সালে যখন আমরা শুরু করি – তখনও উৎসব চলাকালীন সময়ে একদিন খবর এলো রাস্তায় ট্যাঙ্ক নামবে। সেই অবস্থাতেও বিদেশি আলোকচিত্রীদের নিয়ে রাস্তায় নেমেছি, ছবি মেলা হয়েছে।"
ছবি মেলা একটি অলাভজনক আয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা সংবাদ সম্মেলনে জানান।
এবারের আয়োজনে পৃষ্ঠপোষকতায় রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। একইসাথে উৎসবের অংশীদার হিসেবে আছে আরও ১৬টি প্রতিষ্ঠান। সেগুলো হল- আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা, এপেক্স ফুটওয়ার লিমিটেড, বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ, ব্রিটিশ কাউন্সিল, সিটি ব্যাংক পিএলসি, ডেলিগেশন অব দ্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন টু বাংলাদেশ, দেশার ওয়ার্কস, দুর্জয় বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন, গ্যোটে ইনস্টিটিউট, জয়িতা ফাউন্ডেশন, মিউচুয়াল ট্রাষ্ট ব্যাংক লিমিটেড, নন্দিনি হোটেল, নভোএয়ার, প্রো হ্যালভেশিয়া, দ্য সেভেন ফাউন্ডেশন, এবং টাকশিলা।