Published : 12 Jan 2026, 07:25 PM
ঢাকায় পৌঁছেছেন বাংলাদেশে নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন।
সোমবার সন্ধ্যায় তিনি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ক্রিস্টেনসেনের সঙ্গে তার স্ত্রী ডিয়ান ডাও-এরও বাংলাদেশে আসার খবর এক ফেইসবুক পোস্টে দিয়েছে ঢাকা যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস।
ক্রিস্টেনসেনকে উদ্ধৃত করে ওই পোস্টে বলা হয়, “বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ১৯তম রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারা আমার জন্য সম্মানের বিষয়। আমি আমাদের দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক আরও দৃঢ় করে আঞ্চলিক শান্তি ও সমৃদ্ধি এগিয়ে নিতে আগ্রহী।
“আমার স্ত্রী এবং আমি এমন একটি দেশে ফিরে আসতে পেরে আনন্দিত, যে দেশের সঙ্গে আমাদের অনেক সুন্দর স্মৃতি জড়িয়ে আছে।”
কূটনীতিক হিসেবে ক্রিস্টেনসেনের বাংলাদেশে আসাটা এবারই প্রথম নয়। চার বছর আগে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ক কাউন্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন তিনি।
গত সেপ্টেম্বরে ক্রিস্টেনসেনকে বাংলাদেশে ‘অ্যাম্বাসেডর এক্সট্রাঅর্ডিনারি অ্যান্ড প্লেনিপটেনশিয়ারি’ হিসেবে মনোনয়ন দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এরপর গত মাসে মার্কিন সেনেটের অনুমোদন পান তিনি।
এর মধ্যে দুদিন আগে রাষ্ট্রদূত হিসেবে তার শপথ নেওয়ার তথ্য দেয় মার্কিন দূতাবাস।
সেদিন ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের ফেইসবুক পোস্টে বলা হয়, “বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রদূত হিসেবে শপথগ্রহণকারী ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনকে স্বাগত জানাতে পেরে ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস আনন্দিত।”
ওই পোস্টে ক্রিস্টেনসেনের প্রতিক্রিয়াও তুলে ধরা হয়।
তিনি বলেন, “যে দেশটির সঙ্গে আমি খুব ভালোভাবে পরিচিত, সেই বাংলাদেশে ফিরতে পেরে আমি ভীষণ আনন্দিত। ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে আমেরিকান ও স্থানীয় কর্মীদের নিয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী দলের নেতৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের লক্ষ্যকে এগিয়ে নিতে এবং প্রতিদিন নিরলসভাবে কাজ করে আমেরিকাকে আরও নিরাপদ, শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ করে তুলতে আমি উচ্ছ্বসিত।”
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন ঢাকা মিশনে পিটার হাসের উত্তরসূরি হলেন। তিনি ঢাকায় অষ্টাদশ মার্কিন দূত।
এর আগে ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ক কাউন্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ক্রিস্টেনসেন।
পিটার হাস ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তদশ রাষ্ট্রদূত হিসেবে ২০২২ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
২০২৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে অবসরে যান হাস। তার অবর্তমানে এতদিন ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে শার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন।

নতুন রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন ২০২২ সালের অগাস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডের পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক কৌশলগত প্রতিরোধ মিশনের আন্তর্জাতিক প্রভাব নিয়ে পরামর্শ দিতেন।
দুই দশকের বেশি সময়ের কূটনৈতিক ক্যারিয়ারে তিনি ওয়াশিংটন ও বিদেশে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
মার্কিন রাজনৈতিক-সামরিক ব্যুরোর আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অস্ত্র হস্তান্তর দপ্তরের উপপরিচালক, উত্তর কোরিয়া নীতির জন্য বিশেষ প্রতিনিধির বিশেষ সহকারী এবং যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল বিষয়ক উপকমিটিতে পিয়ারসন ফেলো হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
ক্রিস্টেনসেন ম্যানিলা, সান সালভাদর, রিয়াদ ও হো চি মিন সিটিতে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসগুলোতেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
ন্যাশনাল ওয়ার কলেজের ‘ডিস্টিংগুইশড’ গ্র্যাজুয়েট ক্রিস্টেনসেন ২০২২ সালে ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজিতে মাস্টার্স করেন। এছাড়া টেক্সাস এ অ্যান্ড এম ইউনিভার্সিটি থেকে পরিসংখ্যানে মাস্টার্স এবং রাইস ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতি ও ব্যবস্থাপনায় স্নাতক ডিগ্রি রয়েছে তার।
স্প্যানিশ, জার্মান ও ভিয়েতনামি ভাষায় কথা বলতে পারেন এই কূটনীতিক, ফরাসি, জাপানি ও পর্তুগিজ ভাষাও শিখেছেন।
২০০২ সালে ফরেন সার্ভিসে যোগ দেওয়ার আগে হিউস্টন ও নিউ ইয়র্কে ব্যবস্থাপনা পরামর্শক হিসেবে কাজ করতেন ক্রিস্টেনসেন।
অক্টোবরে সেনেটের ফরেন রিলেশন্স কমিটির শুনানিতে ক্রিস্টেনসেন বলেছিলেন, চীন এবং দেশটির সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজে কী ধরনের ‘ঝুঁকি’ রযেছে, তা বোঝাতে বাংলাদেশের সরকার ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজ করবেন তিনি।
শুনানিতে লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন,“বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ হলেও বড় প্রতিবেশীদের ছায়ায় পড়ে থাকায় বাংলাদেশ যথাযথ মনোযোগ পায় না। ফরেন সার্ভিসের চাকরিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ নীতি নিয়ে ২০ বছরের বেশি সময়ের কাজের অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে, যার মধ্যে এর আগে ঢাকায় কাজ করাও রয়েছে।
“ফলে আমি দেশটির গুরুত্ব এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের তাৎপর্য ভালোমতো বুঝি। কৌশলগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ অবাধ, নিরাপধ ও সমৃদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হয়ে উঠেছে।”
বাংলাদেশ এখন ‘গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে’ মন্তব্য করে তিনি সেদিন বলেন, “২০২৪ সালের অগাস্টে ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বিক্ষোভ ১৫ বছর শাসনকারী সরকারের পতন ঘটিয়েছে। নতুন সরকার এবং নতুন পথনির্দেশ পেতে আগামী বছরের শুরুতে ভোট দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশের জনগণ, যা হবে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ নির্বাচন।
“উজ্জল ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের যাত্রায় বাংলাদেশকে সমর্থন করে যুক্তরাষ্ট্র। রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিশ্চিত হলে, আমি ঢাকায় দূতাবাসকর্মীদের নিয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত উত্তরাধিকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার কাজ করব।”
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেন, রাষ্ট্রদূত হলে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক উন্নতি, বাণিজ্য বাধা ও বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালীকরণে কাজ করবেন তিনি।
আরও পড়ুন
সেনেটের সায় পেলেন ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন