Published : 07 Dec 2025, 04:16 PM
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নেওয়ার সময় এবার এক ঘণ্টা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোটগ্রহণ চলবে।
রোববার নির্বাচন কমিশন সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সভা শেষে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, “এবার ভোটগ্রহণের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেক্ষেত্রে সকালে আধা ঘণ্টা ও বিকালে আধা ঘন্টা সময় বাড়বে। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোট চলবে।”
বিকালে তফসিলের আগে ও পরের কাজসহ ভোট প্রস্ততির সার্বিক বিষয় তুলে ধরে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এ তথ্য জানিয়েছেন।
সাধারণত সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ভোট নেওয়া হয়। কদিন আগের মক ভোটিংয়ের অভিজ্ঞতার পর এবার ভোটগ্রহণের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানো হল।
এদিন সকালে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে কমিশন সভা হয়।
এসময় চার নির্বাচন কমিশনার ও ইসি সচিবসহ সংশ্লষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে সংসদ ও গণভোট একই দিনে হবে।
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, "৮ থেকে ১৫ ডিসেম্বর-এ সময়ের মধ্যে যে কোনো দিন তফসিল ঘোষণা করা হবে।"
কমিশন সভার সার্বিক সিদ্ধান্তের পর ১০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাতের কথা রয়েছে।
এবার প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রে ২ লাখ ৪৪ হাজার ভোটকক্ষ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। সাধারণত প্রতি কক্ষে ভোট দেওয়ার একটি গোপনকক্ষ থাকে। তবে এবার দুই ব্যালটে ভোট দিতে সময় বেশি লাগায় গোপনকক্ষ দ্বিগুণ করার ভাবনা রয়েছে ইসির।
এদিন কমিশন সভায় বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে—
আপাতত বেসরকারি ব্যাংক থেকে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নয়
এবার ভোটের দায়িত্বে ৯ থেকে ১০ লাখ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োজিত থাকবে। এর মধ্যে প্রিজাইডিং, সহকারী প্রিজাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তারা রয়েছেন, যাদের তালিকাও প্রস্তুত করা হয়েছে। চূড়ান্ত হবে ভোটের আগেই।
নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ বলেন, “আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের এ তালিকায় সংযুক্ত করব। বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের আপাতত বিবেচনায় নিচ্ছি না। তারা রিজার্ভে থাকবেন।”
ভোটের আগের রাতে কেন্দ্রে সরঞ্জাম
ভোটের কয়েক দিন আগে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী মোতায়েন করা হলেও ব্যালট বাক্সসহ নির্বাচনি সরঞ্জাম পাঠানো হবে ভোটের আগের রাতে।
নির্বাচন কমিশনার বলেন, “নির্বাচন সামগ্রীর ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, নির্বাচনি সামগ্রী আগের মতো আগের রাতেই সব কেন্দ্রে পৌঁছে যাবে ব্যালট পেপারসহ।”
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগের রাতে নির্বাচনি সরঞ্জাম পাঠাতে যথাযথ সুপারভিশন থাকবে এবং নজর রাখব যেন কোনো ধরনের ব্যত্যয় না ঘটে।
গণভোটের প্রচারে ভোটকেন্দ্রে বড় পোস্টার
এ নির্বাচন কমিশনার জানান, গণভোটের প্রচারে সরকার ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিচ্ছে। নির্বাচন কমিশন এতে সহযোগিতা করবে।
গণভোটের প্রশ্নটা যেন সহজে ভোটাররা বুঝতে পারেন, সেজন্য প্রত্যেকটা কেন্দ্রে এই ব্যালটটা বড় আকারে ছাপিয়ে ভোটের লাইনের সামনে ঝুলিয়ে রাখা হবে।
প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালট ছাপানো শুরু সোমবার থেকে
পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে কমিশন সভায়। ইতোমধ্যে সোয়া দুই লাখ প্রবাসী নিবন্ধন করেছেন। ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত নিবন্ধনের সময় রয়েছে।
দেশের ভেতরে তিন ধরনের ব্যক্তি তফসিলের পর থেকে ১৫ দিন ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত নিবন্ধনের সুযোগ পাবেন।
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল বলেন, “দুই ধরনের পোস্টাল ব্যালট আছে। দেশের ভিতর থেকে এবং দেশের বাইরে থেকে পোস্টাল ভোটিং। দেশের বাইরের ব্যালটগুলো আগামীকাল (সোমবার) থেকে ছাপানোর কাজ শুরু করছি। আগামী পরশু দিন (মঙ্গলবার) থেকে এটা বিদেশে পাঠানো শুরু হবে।“
পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক নিয়ে আলোচনা
এবারের নির্বাচনে পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়েছে কমিশন সভায়।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ বলেন, “পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকরা যেন নির্বিঘ্নে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেজন্য যেসব সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন, সে ব্যাপারে পরিপত্র জারি করা হবে।”
ভোটে ৭-৮ লাখ আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য এবং ৯-১০ লাখ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োজিত থাকেন। ভোটের আগের রাতেই কেন্দ্রে কেন্দ্রে নিয়োজিত থাকেন তারা। ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের বাজেট বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানান এ নির্বাচন কমিশনার।
তিনি বলেন, “বাজেটের ব্যাপারে একটা দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চূড়ান্তকরণের ব্যাপারে ইতোমধ্যে যে বাজেট আমরা পেয়েছি, এর অতিরিক্ত বাজেট পরিকল্পনা করে চাইতে বলা হয়েছে।”
জুম বৈঠকে নির্বাচনি কর্মকর্তা ও পোস্টাল ভোটিং
নির্বাচন সামনে রেখে আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবে ইসি। সেই সঙ্গে এবার ভোটের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের সঙ্গেও বৈঠক করা হবে।
প্রথাগতভাবে জেলা প্রশাসকরাই রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ইউএনওরা সহকারী রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পেয়ে আসছেন। তফসিল ঘোষণার দিনই কমিশন জানাবে, কারা রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পাচ্ছেন।
এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, “আগামীকাল (সোমবার) আমরা আঞ্চলিক এবং সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের সঙ্গে জুম মিটিং করব।”
কারা রিটার্নিং কর্মকর্তা হচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, “রিটার্নিং কর্মকর্তার ব্যাপারে কোনো আলোচনা আজ হয়নি। রিটার্নিং কর্মকর্তা সাধারণত জেলা প্রশাসকরা হয়ে থাকেন। এর বাইরেও আমাদের কিছু প্রস্তাব আছে, সেগুলো নিয়ে আমরা আলোচনা করছি; যথাসময় জানতে পারবেন।”
আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও আচরণবিধি প্রতিপালন
এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, “ আইনশৃঙ্খলা কার্যক্রম নিয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যেদিন তফসিল ঘোষণা হবে, সেদিন সন্ধ্যাবেলায় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সঙ্গে আমরা জুম মিটিং করব।”
প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পরে তাদের সঙ্গে ইসির সরাসরি আরেকটা বৈঠক হবে।
এ নির্বাচন কমিশনার জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েনের ব্যাপারে একটি পরিপত্র এই সপ্তাহের মধ্যে নির্বাচন কমিশন থেকে দেওয়া হবে। এর আলোকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে।
নির্বাচনি পরিস্থিতি তথ্য সংগ্রহের জন্য অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করার কথাও জানান তিনি। অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে ১৪ জনের কমিটি থাকবে।
জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ, নির্বাচনি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, ইসির আইন শাখা, নির্বাচন ব্যবস্থাপনা ও এলাকাভিত্তিক কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে এ কমিটি হবে।
ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি কমিটির কাজে কথা তুলে ধরে এ নির্বাচন কমিশনার জানান, তিন ধরনের বিচারিক কমিটি মাঠ পর্যায়ে কাজ করে। ৩০০ আসনে ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি কমিটি কাজ করবে।
তফসিলের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আগাম প্রচার সামগ্রী অপসারণ
তফসিল ঘোষণার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সব ধরনের প্রচারসামগ্রী সরাতে নির্দেশনা দেবে ইসি।
তিনি বলেন, “প্রচার-প্রচারণা যেগুলো রাজনৈতিক দলগুলো ইতোমধ্যে করেছেন এবং ঝুলিয়েছেন, এগুলো সরাতে হবে। না সরালে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এছাড়া বিভিন্ন ধরনের পরিপত্র, যেগুলো জারি করা হয়, সেগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। রুটিন কাজ হিসেবে যথাসময়ে তা জারি হয়ে যাবে।
যান চলাচলে বিধি নিষেধ, সাধারণ ছুটি
এ নির্বাচন কমিশনার জানান, ভোটের দিন সামনে রেখে যান চলাচলের নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে অতীতে যেভাবে নির্দেশনা দেওয়া ছিল, সেটাই বলবৎ থাকবে। অর্থাৎ ট্যাক্সি ক্যাব, পিকাপ, মাইক্রো এবং ট্রাক, এগুলো চলবে না ২৪ ঘণ্টার জন্য। মোটরসাইকেল চলবে না ৭২ ঘণ্টার জন্য।
এ কমিশনার জানান, দুর্গম নির্বাচনি এলাকায় হেলিকপ্টার সহায়তার ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। নির্বাচনি মালামাল ও ভোট গ্রহণকারী কর্মকর্তাদের চলাচলের জন্য হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হবে।
আরও খবর-
সংসদ ও গণভোটের তফসিল ঠিক করতে সভায় ইসি
ভোটগ্রহণের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানোর পরিকল্পনা
সংসদ নির্বাচন ও গণভোট: তফসিল ঘোষণা কবে?
তফসিলের আগে ১০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ইসির সাক্ষাৎ
সংসদ ও গণভোটের তফসিলের অপেক্ষা, পর্যালোচনায় বসছে ইসি
একসঙ্গে সংসদ ও গণভোট: ভোটগ্রহণের সময় ও গোপনকক্ষ বাড়ানোর ভাবনা