Published : 05 Feb 2026, 05:01 PM
দুই বছর আগে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খতনা করাতে গিয়ে শিশু আয়ান আহমেদের মৃত্যুর ঘটনায় তিন চিকিৎসকের ‘অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার প্রমাণ’ পাওয়ার দাবি করেছে পুলিশ।
ওই চিকিৎসকরা হলেন-হাসপাতালের এনেসথেসিয়া স্পেশালিস্ট সৈয়দ সাব্বির আহম্মেদ (৩২), সার্জন তাসনুবা মাহজাবীন (৩৮) ও সহকারী স্পেশালিস্ট এনেসথেসিয়া নাজিম উদ্দিন (৩৪)।
এ ঘটনায় করা মামলার দীর্ঘ তদন্ত শেষে গেল ২২ জানুয়ারি আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ, যেখানে নাজিম উদ্দিনকে পলাতক এবং বাকি দুই চিকিৎসক আগাম জামিনে রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়।
বৃহস্পতিবার ঢাকার মহানগর হাকিম মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।
প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মো. কামাল হোসেন বলেছেন, তাসনুবা ও সাব্বির জামিনে ছিলেন, তবে বৃহস্পতিবার তারা আদালতে হাজির হননি।
পাঁচ বছর বয়সী আয়ানকে খতনা করানোর জন্য ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকার সাঁতারকুল এলাকার ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালে নিয়ে গিয়েছিল তার পরিবার। অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার পর তার আর জ্ঞান ফেরেনি।
পরে তাকে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়, পরের বছরের ৭ জানুয়ারি সেখানেই মৃত্যু হয় শিশুটির।
আয়ানের বাবা শামীম আহামেদ পরে বাড্ডা থানায় মামলা করেন। পরে জানা যায়, যথাযথ নিবন্ধন ছাড়াই চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল কর্তৃপক্ষ। এ কারণে ওই হাসপাতালের সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশও দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
প্রায় ২৫ মাস পর দেওয়া অভিযোগপত্রে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বাড্ডা থানার পরিদর্শক ইয়াসিন খন্দকার বলেছেন, প্রাপ্ত তথ্য ও সাক্ষ্য প্রমাণ, বাদী ও সাক্ষীদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ, হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক গঠিত বিশেষজ্ঞ তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পর্যালোচনা, আয়ানের লাশের ময়না তদন্ত ও ভিসেরা প্রতিবেদন পর্যালোচনা, ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা বিশ্লেষণ এবং প্রকাশ্য ও গোপনীয়ভাবে তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য ও সাক্ষ্য প্রমাণসহ সার্বিক তদন্ত বিশ্লেষণে ওই তিন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ‘প্রমাণিত হয়েছে’।
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের বর্ণনা অভিযোগপত্রে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, “শিশু আয়ানের মৃত্যু শ্বাসকষ্টের কারণে হয়েছে, আর ‘লিমোকেইন হাইড্রোক্লোরাইড এবং বেন্টো ডায়াপিজাইন যৌগগুলি’ প্রয়োগের জটিলতার ফলে শ্বাসকষ্ট হয়েছে, যা অ্যান্টিমর্টেম ছিল।”
ভিসেরা প্রতিবেদনের পর্যালোচনায় তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেছেন, লিভার ও কিডনির অংশ বিশেষ এবং রক্তে ‘লিডোকেইন হাইড্রোক্লোরাইড ও বেনজোডায়াজেপিন যৌগ’ পাওয়া গেছে।
আর পুরো ঘটনার বিবরণে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা লিখেছেন, অভিযুক্ত তিন চিকিৎসকের তত্বাবধানে ৩১ ডিসেম্বর আয়ানের খাতনা করানোর অপারেশন কার্যক্রম শুরু হয়। অপারেশনের আগে ডাক্তার সাব্বির ও নাজিম উদ্দিন আয়ানকে অজ্ঞান করার জন্য প্রয়োজনীয় ইনজেকশন পুশ করেন এবং অপারেশনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তারা পুরো কার্যক্রমে ‘জড়িত ছিলেন’।
এ ঘটনায় এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাই কোর্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল, যেটির প্রতিবেদনও সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করার কথা অভিযোগপত্রে বলেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
ওই প্রতিবেদনে শিশু আয়ানের মৃত্যুর জন্য ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক তাসনুভা ও সাব্বিরের ‘অবহেলা’কে দায়ী করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে ঘটনার বর্ণনায় তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরিরত শামীম আহমেদ তার ছেলে আয়ানের খাতনা করার জন্য ‘অত্যাধুনিক ও উন্নত’ হাসপাতাল বিবেচনায় ২০২৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে ডাক্তার তাসনুবাকে দেখিয়ে আয়ানের সুন্নতে খাতনার বিষয়ে আলোচনা করেন।
ডাক্তার তাসনুবা তখন ‘আমরা নিয়মিতভাবে সুন্নাতে খাতনা করাই’ বলে শামীমকে আস্বস্ত করেন। পরে তাসনুবা ও সাব্বির মিলে আয়ানের কয়েকটি টেস্ট দেন। যেগুলোর রিপোর্টসহ পরদিন সকালে আয়ানকে নিয়ে হাসপাতালে যান শামীম। সকাল ৯ টায় আয়ানকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে তাসনুবার তত্ববধানে ডাক্তার সাব্বির ও নাজিম উদ্দিন অজ্ঞান করার জন্য আয়ানকে প্রয়োজনীয় ইনজেকশন ও ওষুধ প্রয়োগ করেন। তারা শামীম ও তার স্বজনদেরকে ২০/২৫ মিনিট অপেক্ষা করতে বলেন। ওই সময়ে তারা আয়ানের সুন্নতে খাতনা অপারেশন কার্যক্রম সম্পন্ন করেন।
সে সময় হাসপাতালের রেজিস্ট্রার ডা. রিফাতুল কবীর তার অধীনস্থ মেডিকেল শিক্ষার্থীদের নিয়ে অপারেশন থিয়েটারে প্রবেশ করে সেখানে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের মেশিন ও সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি সম্পর্কে জ্ঞানদান করেন এবং কিছু সময় পর তারা বের হয়ে যান।
সকাল ১০টার দিকে আয়ানের অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকলে ডাক্তাররা আয়ানকে সিপিআর দিতে থাকেন, তার অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে আরো বিভিন্ন ইনজেকশন পুশ করেন। অপারেশন কার্যাক্রম শেষ হতে দেরি হওয়ায় এবং অপারেশন থিয়েটারে হাসপাতালের অন্যান্য লোকজনের দ্রুত আসা যাওয়ার কারণে আয়ানের বাবা ও স্বজনরা ভেতরে ঢুকে শিশুটির অবস্থা দেখতে পান।
তারা আয়ানের বুকের দুই পাশে দুটি ছিদ্র করে টিউব লাগানো এবং বুকের উপর চাপাচাপি করছে দেখতে পান। আয়ানের অবস্থা আরো খারাপ হতে থাকলে অভিভাবকের সাথে ‘আলাপ-আলোচনা না করেই’ তাকে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নিয়ে আয়ানকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। শামীম তার ছেলেকে অন্য কোনো হাসপাতালে নিয়ে যেতে চাইলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে সেখানেই রেখে দেয় অবশেষে ৭ জানুয়ারি আয়ানকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
পরে শামীমকে তার মৃত সন্তানের চিকিৎসা খরচ বাবদ ৫ লাখ ৭৭ হাজার ২৫৭ টাকার একটা বিল ধরিয়ে দেয়। বিষয়টি নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডা হলে বাড্ডা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আয়ানের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে পাঠায়।
আয়ানের বাবা শামীম আহামেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ইউনাইটেড গ্রুপের চেয়ারম্যানসহ আরো যারা আসামি ছিলেন, চার্জশিটে তাদের নাম আনা হয়নি। তার পরেও চার্জশিট দিয়েছে, এটাই আলহামদুলিল্লাহ। আশা করি আমি ন্যয়বিচার পাব।”