Published : 25 May 2026, 05:53 PM
বিএনপি সরকারের একশ দিনে মন্ত্রিসভার নেওয়া ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ৬২% বাস্তবায়িত হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
সোমবার বিকালে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সরকারের একশ দিনের কার্যক্রমের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।
মাহদী আমিন বলেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করার পর ২৪ মে পর্যন্ত মন্ত্রিসভার মোট ১০টি বৈঠক হয়েছে।
“এসব সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এর মধ্যে ৩৭টি সিদ্ধান্ত, অর্থাৎ প্রায় ৬২ শতাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং অবশিষ্ট ২৩টি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় রয়েছে।”
তিনি দাবি করেন, “সরকার গঠনের পর এত স্বল্প সময়ে মন্ত্রিসভায় গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহের উল্লেখযোগ্য অংশ কার্যকর করতে সক্ষম হওয়া সরকারের দ্রুততা, কার্যকারিতা ও আন্তরিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।”
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, ‘গুম-খুন, হামলা-মামলা এবং দমন-পীড়নের’ দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ‘আন্তরিকভাবে’ কাজ করে যাচ্ছে।
“যার প্রতিফলন গত ১০০ দিনের উদার ও সহিষ্ণুতার নতুন মানদণ্ডে বারবার প্রতীয়মান হয়েছে। অন্যদিকে বাকস্বাধীনতার নামে অপপ্রচার, বিদ্বেষ বা বিষোদগারের যে রাজনীতি একটি গোষ্ঠীর অপকৌশলে পরিণত হয়েছে, সেই চর্চা গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক।”

মাহদী আমিন দাবি করেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের মাত্র ১০০ দিনের পথচলাতেই দেশের নানা ক্ষেত্রে দৃশ্যমান, সুস্পষ্ট ও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়েছে। একইসঙ্গে জনমনে সৃষ্টি হয়েছে ক্ষমতায়ন, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার এক নতুন, দৃঢ় ও ইতিবাচক মেলবন্ধন।
“গৃহীত বহুমুখী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলে জনজীবনে ফিরে এসেছে স্বস্তি ও শৃঙ্খলা। সরকারের রূপকল্পে দেশের ২০ কোটি মানুষ যদি একসঙ্গে কাজ করে, তরুণ ও নারীরা যদি ক্ষমতায়িত হন, ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশকে আমরা অবশ্যই একটি মর্যাদাশীল ও স্বনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করতে সক্ষম হব।”
প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচিত সরকার বিশ্বাস করে, গণতন্ত্র সুসংহত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের দায়িত্ব হল এমন নীতিগত সহায়তা দেওয়া, যেখানে দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিক বৈষম্যহীনভাবে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সমান সুযোগ পাবেন এবং দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় অবদান রাখতে পারবেন।
“জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং ১৬ বছরের গণতান্ত্রিক পথচলায় শহীদদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান অঙ্গীকারবদ্ধ। ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত–এই সম্মিলিত শক্তিই দেশের অগ্রগতির মূল ভিত্তি। এই কারণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।”
চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের পথ পেরিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বিএনপি। ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে দুই দশক পর আবার সরকার গঠন করে দলটি।

‘১০০ দিনে অনেক মানুষের সমস্যার সমাধান হয়েছে’
সরকারের ১০০ দিনের কর্মসূচিকে মোটা দাগে মূল্যায়ন করতে গিয়ে মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, “এই বিষয়ে এতটুকুই বলব, প্রথম ১০০ দিনে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যে দ্রুত দৃশ্যমান এবং কার্যকরী বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন খুব স্বল্প সময়ে তাতে মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হচ্ছে,সমস্যার সমাধান হচ্ছে।
‘‘খেটে খাওয়া প্রান্তিক তৃণমূলের মানুষ আরো বেশি স্বাবলম্বী স্বনির্ভর হয়ে উঠছেন বলে আমি মনে করি।”
‘হামের টিকা প্রসঙ্গে’
ভবিষ্যতে যাতে হামের টিকার মত সংকট আর তৈরি না হয় বর্তমান সরকারের সেই চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথা তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, ‘‘ইতিমধ্যে দেখেছেন যে, হামের টিকা বিদেশ থেকে নিয়ে এসেছি এবং গত তিন মাসে প্রায় শতভাগ শিশুকে হামের টিকা নিশ্চিত করা হয়েছে।“
হামে মৃত্যুর ঘটনার তদন্ত বিষয়ক এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘ব্যাকওয়ার্ড লুকিং ইনভেস্টিগেশনের যে প্রশ্নটা করেছেন, সেটা হচ্ছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় যারা নীতি-নির্ধারক রয়েছেন উনাদের কাছে পূর্ণাঙ্গ তথ্য রয়েছে। আমার কাছে সেই তথ্যটা নাই। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সবাই মিলে যেন হাম থেকে শিশুদেরকে রক্ষা করা যায় এবং সবার জন্য টিকার ব্যবস্থা করা যায় (সেই চেষ্টা চলছে)।”
সামনের দিনে যাতে এমন ঘটনা না ঘটে সেজন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ চলমান থাকার কথা বলেন তিনি।
‘অপতথ্যে চরিত্র হনন প্রসঙ্গে’
সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিলেও অনেকেই বাকস্বাধীনতাকে ‘অপব্যবহার’ করছে তুলে ধরে তিনি বলেন, “আপনি যেটা বললেন, অশালীন আচরণ করা, সংবেদনশীলভাবে অপপ্রচার করা কিংবা চরিত্র হনন করা সুনির্দিষ্টভাবে এগুলো কখনোই বাক স্বাধীনতার অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত না।
“আমরা একই সাথে যেমন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চাই, তেমনি প্রতিটি মানুষের কিন্তু সম্মান মর্যাদা সুরক্ষা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। মাত্র তিন মাস সময় হলো স্বাভাবিকভাবেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এখন এই বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত কাজ শুরু হয়নি। তবে অনেক ভুক্তভোগী রয়েছেন যারা চরিত্র হননের শিকার হচ্ছেন, যারা মিস ইনফরমেশন, ডিসইনফরমেশনের শিকার হচ্ছেন এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যারা রয়েছেন তাদের বিরুদ্ধেও অপরাজনীতি বা অপকৌশলের মাধ্যমে যেভাবে বিষোক্তি এবং বিষোদগার করা হচ্ছে সেটি গণঅভ্যুত্থানে কোনোভাবে কাম্য নয়।”

তিনি বলেন, ‘‘একটি স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অংশ হিসেবে জনগণের অধিকার এবং স্বাধীনতা যদি আমাদের সুরক্ষিত রাখতে হয় সেটি যেমন শারীরিকভাবে প্রয়োজন সেটি যেমন বাস্তব জীবনে প্রয়োজন, সাইবার স্পেস বা অনলাইনেও কিন্তু সরকারের দায়িত্ব প্রত্যেককে সুরক্ষা দেওয়া। সেটি নিয়ে কাজ করছি।”
বাক স্বাধীনতার নামে অপপ্রচার রোধে আইনি সংস্কারের অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা, যিনি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্রের দায়িত্বও পালন করছেন। তবে কোনো আইনই বিএনপি সরকার কখনোই উপর থেকে চাপিয়ে দেয়নি। ঐতিহ্যগতভাবে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনের মাধ্যমে সেটি সম্পন্ন হয়েছে।
‘সাগর-রুনি হত্যার বিচার সরকারের অগ্রাধিকার’
সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত বিষয়ক এক প্রশ্নে মুখপাত্র বলেন, “এই নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে কথা বলেছেন। আমরাও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের সুরক্ষার অংশ হিসেবে এটিকে বড় বাধা হিসেবে দেখছি। সুনির্দিষ্টভাবে তথ্য আমার কাছে নেই। যারা আইন মন্ত্রণালয়ের সাথে সংশ্লিষ্টদের তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য আছে।
“সরকারের অংশীদার হিসেবে আমরা সবাই মনে করি, অবশ্যই সাগর-রুনি হত্যার বিচার হওয়া উচিৎ। এটা আমাদের অগ্রাধিকার। এটা নির্বাচনের সময়েও বলেছি, এখনো বলছি। আমার ধারণা সামনের দিনগুলোতে এখানে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চয়ই আপনারা দেখতে পারবেন।“
‘ঈদযাত্রায় প্রাণহানি প্রসঙ্গে’
সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন বলেন, ‘‘এবার কিন্তু ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে, বগির সংখ্যা নারীদের জন্য আলাদাভাবে বাড়ানো হচ্ছে। উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কীভাবে আমরা বাস ও ট্রেনের সূচি ম্যানেজ করতে পারি। যে টাইমগুলো আছে সেগুলোকে এডজাস্ট করার কোনো সুযোগ আছে কিনা? যেখান থেকে ছেড়ে যাচ্ছে সেখানে কী নিরাপত্তা বেষ্টনী বাড়ানোর সুযোগ আছে কিনা?
“অবশ্যই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার থাকবে নিরাপত্তা ও সুরক্ষা এবং দৃঢ়ভাবে আশাবাদী ঈদতো আরো কয়েকটা দিন আছে এর মাঝে ইনশাআল্লাহ অবস্থা দৃশ্যমান উন্নতি আপনাদের চোখে পড়বে।”
সরকারের ১০০ দিনের কর্মসূচির মধ্যে শ্রমবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে দেশব্যাপী শ্রমিকদের ঈদের আগে বেতন, ভাতা ও ঈদ বোনাস পরিশোধ নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ, সাধারণ হজযাত্রীদের বিমানভাড়া কমানো, বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন গতি আনতে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়নের প্রস্তুতি শুরু করা, আগামী ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল চালু করা, বিমানবন্দর ও ট্রেনে হাই-স্পিড ফ্রি ওয়াই-ফাই চালুর মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্য খাতে পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিতের উদ্যোগ, গ্রহণ শিশু রামিসার হত্যাকারীর বিচার দ্রুত করার উদ্যোগ, বাংলাদেশি পাসপোর্টে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করা, অর্থনৈতিক খাত, ব্যাংকিং, ও সামগ্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কারের মাধ্যমে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার জন্য, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা পৌঁছে দিতে বহুল আলোচিত এস আলম গ্রুপের ৪ হাজার ২৬৪ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ সফলভাবে জব্দ করা, সফলভাবে ৯০ দশমিক ৬৬ মিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে ১০টি দেশের মধ্যে ৩টি দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর এবং বাকি দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায় নিয়ে আসা, সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং রপ্তানি আয়ের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি, প্রায় দুই লাখ ফ্রিল্যান্সারকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া, বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ, সংসদ কার্যকর করা, জ্বালানি সাশ্রয় ও পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ইলেকট্রিক বাস চালুর উদ্যোগ গ্রহণের মত পদক্ষেপ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন দেশকে সবুজায়ন করতে প্রধানমন্ত্রীর কয়েকটি উদ্যোগের কথা তুলে ধরে বলেন, বিএনপি সরকার বৃক্ষপ্রেমী সরকার।
উপপ্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনির পরিচালনায় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্পিচ রাইটার মাহফুজুর রহমান, উপ প্রেস সচিব হাসান শিপলু, মো. সুজাউদ্দৌলা ও শাহাদাৎ হোসেন স্বাধীন, সহকারী প্রেস সচিব আশরোফা ইমদাদ, নাজমুল হক খান ও আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ শাহরিয়ার।