Published : 16 Apr 2026, 12:08 AM
জুলাই আন্দোলনে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের গুলিতে নিহত শিক্ষার্থী ইমাম হাসান তাইমের সুরতহাল প্রতিবেদনে গুলির তথ্য গোপন করার অভিযোগ তুলেছেন তার বাবা পুলিশের এসআই ময়নাল হোসেন ভূঁইয়া।
বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তিনি জবানবন্দি দিয়েছেন।
সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী শাহবাগ থানার এসআই শাহদাতের বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের অভিযোগ তুলে ময়নাল হোসেন বলেন, “এসআই শাহদাত আমাকে বললেন, এটা উপরের অর্ডার, আমি গুলির কথা লিখতে পারব না।”
বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবিরের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ জবানবন্দি দিয়েছেন তাইমের বাবা।
জুলাই আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় গুলিতে নিহত হন তাইম। এ ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আসামি ১১ জন।
গেল ২২ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল আসামিদের বিচার শুরুর আদেশ দেন।
বুধবার কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয় গ্রেপ্তার হওয়া দুজনকে। তারা হলেন—যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ওসি আবুল হাসান ও সাবেক এসআই শাহাদাত আলী।
মামলার অপর ৯ আসামি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
তাদের মধ্যে রয়েছেন, ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারী জোনের সাবেক ডিসি ইকবাল হোসাইন, এডিসি শাকিল মোহাম্মদ শামীম, ডেমরা জোনের তৎকালীন এডিসি মো. মাসুদুর রহমান মনির, তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন, পরিদর্শক (অপারেশন) ওহিদুল হক মামুন ও এসআই (নিরস্ত্র) সাজ্জাদ উজ জামান।
জবানবন্দিতে এসআই ময়নাল হোসেন বলেন, তার ছোট ছেলে ইমাম হাসান তাইম ভূঁইয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যাত্রাবাড়ী এলাকায় অংশগ্রহণ করেছিল। ঘটনার দিন দুপুর ১২টার দিকে বন্ধু শাহরিয়ারের ফোন পেয়ে তাইম বাসা থেকে চা খাওয়ার কথা বলে বের হয়। কিন্তু সে শাহরিয়ার এবং রাহাতসহ কাজলা এলাকায় অবস্থান নেয়।
পরে দুপুর ১টার সময় তিনি রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে অবস্থানকালে স্ত্রীর ছোট বোন শাহিদা আক্তারের কাছে তাইম নিহত হওয়ার ও তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার খবর শোনেন। তিনি শাহিদাকে তাড়াতাড়ি ঢাকা মেডিকেলে যেতে বলে বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে অবগত করেন। কর্তৃপক্ষ তাকে ১০ দিনের ছুটি দেয়।
দুপুর ২টা ৪৫ থেকে ৩টার মধ্যে ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছে ময়নাল ছেলেকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না তুলে ধরে তিনি বলেন, এক সাংবাদিকের কাছে থাকা একটি ছবি দেখে তিনি ছেলেকে মৃত অবস্থায় শনাক্ত করেন।
মর্গে ছেলের লাশ শনাক্ত করার বর্ণনা দিয়ে তাইমের বাবা বলেন, “আমার ছেলের লাশের উপরে, বুকে, পেটে এবং পায়ে অসংখ্য গুলির চিহ্ন দেখতে পাই। তখন আমি উপস্থিত সাংবাদিকদের বলি, একটা মানুষ মারতে কয়টি গুলি লাগে? পরবর্তীতে মর্গ থেকে বের হয়ে আসি।”
সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত নিয়ে পুলিশের টালবাহানা প্রসঙ্গে এই পুলিশ সদস্য বাবা বলেন, লাশ নেওয়ার জন্য শাহবাগ থানায় গিয়ে কার্যক্রম শেষ করে আনুমানিক রাত ৮টার সময় ঢাকা মেডিকেলে যান তিনি। হাসপাতালে আসা তার দুই সহকর্মী ইন্সপেক্টর নিজাম উদ্দিন ও এসআই দেলোয়ার তাকে বলেন, তারা শাহবাগ থানায় গিয়েছিলেন, সুরতহাল এবং পোস্ট মর্টেমের দায়িত্ব শাহবাগ থানার এসআই শাহদাতকে দিয়েছে।
সেদিন সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত না হওয়ায় মর্গের সামনে প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করে দুই সহকর্মীরাসহ রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে চলে যাওয়ার কথা বলেন তিনি।
তাইমের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য নেওয়ার কথা তুলে ধরে ময়নাল বলেন, সকাল ৯টা সাড়ে ৯টার সময় শাহবাগ থানা থেকে এসআই শাহদাত এলে তাকে দ্রুত সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করেন।
তিনি বলেন, “সে (এসআই শাহদাত) আমাকে দেখে কোনো সান্ত্বনা না দিয়ে অন্য একজনের সাথে মোবাইলে কথা বলেন। পরবর্তীতে এসআই শাহদাত তার অন্যান্য সহকর্মীদের সাথে ব্যক্তিগত কথাবার্তা বলেন এবং ব্যক্তিগত কাজ করতে থাকেন।”
এসআই শাহদাত অকারণে দেরি করেন বলে তুলে ধরে তাইমের বাবা বলেন, “আনুমানিক ১২টার সময় এসআই শাহদাত সুরতহাল করার জন্য যান। সুরতহাল করার সময় পুলিশের গুলিবিদ্ধ হওয়ার চিহ্নগুলি না লিখে কিছু ছিদ্র ও কালো স্পট থাকার কথা লিপিবদ্ধ করেন।
“আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি, আপনি পুলিশের গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা না লিখে স্পট থাকার কথা কেন লিখলেন? এসআই শাহদাত আমাকে বলল-এটা উপরের অর্ডার, আমি গুলির কথা লিখতে পারব না।”
ময়নালের বলেন, এসআই শাহদাত তাকে বলেছেন ছাত্র-জনতার আঘাতে ও গুলিতে তাইম মারা গেছে। এই বলে সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করে তাকে স্বাক্ষর করতে বলেন।
“আমি অনেক চিন্তায় পড়ে যাই। আমার ছেলে মারা গেছে এবং চাকুরি হারানোর সম্ভাবনা আছে এবং ছেলের মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে, লাশে প্রায় পচন ধরে গেছে। এই চিন্তা করে আমি সুরতহাল রিপোর্টে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হই।”

সুরতহালের পর দুই-তিন ঘণ্টা হয়ে গেলেও ময়নাতদন্ত করাতে পারছিলেন না তুলে ধরে তিনি বলেন, এসআই শাহদাতকে দুই-তিন বার অনুরোধ করলেও তিনি কোনো সহযোগিতা করেননি। পরে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ময়নাতদন্ত শেষে তারা লাশ বুঝে পান।
রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে নিয়ে তাইমকে গোসল করানো সময় কোমরের বাম পাশে বড় গর্তের দাগ দেখার বিষয়টি তুলে ধরে এসআই ময়নাল বলেন, “আমি এবং আমার সহকর্মীরা এই দাগ দেখে বুঝতে পারি, এটা পিস্তলের গুলির দাগ।”
ছেলের বন্ধুদের কাছ থেকে শোনা হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষ বিবরণ তুলে ধরে জবানবন্দিতে তিনি বলেন, কুমিল্লায় ছেলের লাশ দাফন করে ২৮ জুলাই তিনি ঢাকায় ফেরেন। তাইমের বন্ধু রাহাত, শাহরিয়ারসহ অন্যান্যদের কাছে শুনতে পান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় তার ছেলে তাইম প্রত্যেক দিন আন্দোলনে যোগ দিত। ঘটনার দিন ১২টা থেকে ২ টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল ছিল। ঘটনার সময় তাইম ও তার বন্ধু শাহরিয়ার, রাহাত কাজলা ফুটব্রিজ এলাকায় লিটনের চায়ের দোকানের সামনে আন্দোলনের জন্য অবস্থান করছিল।
সেখানে যাত্রাবাড়ী থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) জাকির হোসেন, ইন্সপেক্টর (অপারেশন) মামুন, এসআই সাজ্জাদের নেতৃত্বে ২০/২৫ জন পুলিশ তাইম ও তার বন্ধুদের চার দিক থেকে ধাওয়া করলে কোনো দিকে যেতে না পেরে তারা লিটনের চায়ের দোকানে ঢুকে শাটার টেনে দেয়।
ময়নাল বলেন, “পুলিশ সদস্যরা দোকানের শাটার খুলে আমার ছেলে ও তার বন্ধুদেরকে বের করে লাঠি, রাইফেলের বাট দিয়ে অনেক মারতে থাকে। পরবর্তীতে পুলিশ সদস্যরা আমার ছেলে ও তার বন্ধুদেরকে দৌড় দিয়ে চলে যেতে বলে। আমার ছেলে দৌড় দিলে ইন্সপেক্টর (অপারেশন) মামুন পিস্তল দিয়ে গুলি করে এবং এসআই সাজ্জাদ গুলি করে।
“আমার ছেলে মা মা করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তার বন্ধু রাহাত তাইমকে পিছনের দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে। তখনই ইন্সপেক্টর জাকির খুব কাছ থেকে অনেকবার গুলি করে। আমার ছেলে মা মা করে কাঁদতে থাকে। একটি গুলি রাহাতের পায়ে লাগে। রাহাত তার জীবন বাঁচাতে আমার ছেলেকে ফেলে রেখে চলে যায়। আমার ছেলে সেখানে পড়ে থাকে এবং গড়াগড়ি করতে থাকে।”
তাইমের আরেক বন্ধু শাহরিয়ার ও চা দোকানি লিটন তাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করলেও ইন্সপেক্টর জাকির, ইন্সপেক্টর মামুন, এসআই সাজ্জাদ বাধা দেন তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমার ছেলে অনেকক্ষণ মাটিতে পড়ে থাকে এবং গড়াগড়ি করতে থাকে।”
এ সময় ট্রাইব্যুনালে ডুকরে কেঁদে ওঠেন এই পুলিশ সদস্য।
ময়নাল বলেন, ২৮ জুলাই তিনি ডিএমপির কল্যাণ ও ফোর্স বিভাগের ডিসিকে নিয়ে ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করতে যান।
“আমি এবং আমার বড় ছেলে রবিউল প্রায় এক ঘণ্টা ওয়েটিং রুমে বসে থাকি, কিন্তু ডিএমপি কমিশনার আমার সাথে দেখা করেন নাই। পরবর্তীতে ডিসি (ওয়ারী) ইকবালের নিকট যাই। আমার ছেলে কীভাবে মারা গেছে তার ছবি দেখালে তিনি খুব রাগ হয়ে বলেন, আপনার ছেলে কেন আন্দোলনে গিয়েছিল?
“আমার বড় ছেলে রবিউল পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করতে বলে। ডিসি ইকবাল সাহেব বলেন, আপনাদের মামলা করতে হবে না, পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে। আমার ছেলে রবিউল বলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করলে মামলা করার দরকার নাই। তখন আমরা চলে আসি।”
জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করে তাইমের বাবা বলেন, আন্দোলন দমনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের নির্দেশে যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার, ডিসি ইকবাল, এডিসি শামীম, এডিসি মাসুদ, এসি নাহিদ, ওসি আবুল হাসান যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায় অবস্থান করছিলেন।
তার ছেলের মৃত্যুর জন্য ওসি জাকির হোসেন, ওসি (অপারেশন) মামুন, এসআই সাজ্জাদকে দায়ী করেন তিনি। আর সুরতহাল প্রস্তুতকারী এসআই শাহদাত তার ছেলের মৃত্যুর দায় অন্য কারও ওপর চাপানো চেষ্টা করেন বলে ট্রাইব্যুনালকে বলেন এসআই ময়নাল।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার।