Published : 25 Mar 2026, 01:36 AM
নেত্রকোণার মোহনগঞ্জের কলেজছাত্র রিয়াদ হাসান অপু ঢাকার রায়েরবাজারে বোনের বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন। সেহরির আগ মুহূর্তে হঠাৎ বিস্ফোরণে ঘুম ভেঙে গেলে ঘরে আগুন দেখতে পান।
তড়িঘড়ি তিন বছর বয়সী ভাগ্নে মায়ানকে সঙ্গে নিয়ে বের গেলেও শেষ রক্ষা হয়নি। ততক্ষণে ভাগ্নের শরীরের ২৪ শতাংশ পুড়ে যাওয়ার পাশাপাশি অপুর নিজের শরীরের ৭ শতাংশ পুড়েছে।
তার বোন পিংকির পুড়েছে ৭৫ শতাংশ; দুলা ভাই মো. রোমানের পুড়েছে ২৫ শতাংশ। তারা সবাই জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন বিভাগে চিকিৎসাধীন।
চিকিৎসকরা বলছেন, অপুর বোন-দুলাভাই ও ভাগ্নের অবস্থা ‘আশঙ্কাজনক’।
২৩ ফেব্রুয়ারি রাতের ওই দুর্ঘটনার বর্ণনা করে অপু বলেন, সেহরির জন্য রান্না করতে উঠেছিলেন তার বোন পিংকি। চুলা জ্বালতেই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয়ে আগুন সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রাথমিকভাবে ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, লাইনের ছিদ্র থেকে ঘরে গ্যাস জমেছিল। সে কারণে আগুন জ্বালাতেই বিস্ফোরণ ঘটে।
একইরকমভাবে সেদিন সেহরির সময় খেতে উঠে চট্টগ্রামের হালিশহরের একটি বাসায় গ্যাস বিস্ফোরণে দগ্ধ হন এক পরিবারের ৯ জন। যাদের মধ্যে ছয়জন ইতোমধ্যে মারা গেছেন; বাকি তিনজন ‘আশঙ্কাজনক’ অবস্থায় জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন।
একইদিন ভোরে দেশের দুই প্রান্তে ভয়াবহ এ দুটি ঘটনার পরবর্তী তিন সপ্তাহে দেশের ১০টি জায়গায় গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ ও আগুনে দগ্ধ হয়ে মোট ৫৩ জন ঢাকার এই বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন; তাদের মধ্যে ১২ জন মারা গেছেন।
এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহারকারীদের পাশাপাশি পাইপলাইনের প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারকারীরাও রয়েছেন দগ্ধদের মধ্যে। প্রশ্ন উঠেছে, ‘হঠাৎ করে’ গ্যাস লিক থেকে বিস্ফোরণের এত ঘটনা কেন ঘটছে?
বিশেষজ্ঞরা এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দায়ী করছেন ‘সচেতনতার অভাবকে’। পাশাপাশি বহু পুরনো গ্যাস সংযোগের দিকে আঙ্গুল তুলেছেন; বলেছেন সিলিন্ডারের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নজরদারিতে ‘উদাসীনতার’ কথা।
সিলিন্ডার কোম্পানিগুলোর ভাষ্য, প্রায় সব ঘটনার পরই সিলিন্ডার অক্ষত পাওয়া যায়। কিন্তু সিলিন্ডারে ব্যবহার করা হোসপাইপ, রেগুলেটর, ক্লাম্পসহ সামগ্রীগুলো মানসম্মত কি না, সেসব দিয়ে গ্যাস লিক হচ্ছে কি না, গ্রাহক পর্যায়েই তা নিশ্চিত করতে হবে।
অপরদিকে লাইনে গ্যাস সরবরাহকারী কোম্পানি বলছে, তারা পুরাতন পাইপগুলো পরিবর্তনের ‘চেষ্টায় আছে’। পাইপের সমস্যার কারণে বাইরে লিক হলে সাধারণত কোম্পানির ‘সিস্টেম লস’ হলেও দুর্ঘটনা ‘তেমন হয় না’। বাড়ির ভেতরে থাকা লাইনগুলো নজরদারির দায়িত্ব ভবন মালিক বা ব্যবহারকারীদের নিতে হবে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহম্মেদ খান বলেন, বিভিন্ন গ্যাস লাইন কেটে চোরাই লাইন নেওয়া হয়। আবার অনেক জায়গায় লাইনগুলো পুরনো হয়ে গেছে।
“বাসা বাড়িতে যারা এলপিজি গ্যাস ব্যবহার করে, সেই সিলিন্ডারগুলোর নিয়মিত তদারকি নাই। এছাড়া সিলিন্ডারে ব্যবহৃত রেগুলেটরসহ অন্যান্য সামগ্রী খুবই নিম্নমানের।”
এর বাইরে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে মানুষের ‘উদাসীনতাকে’ দায়ী করেন তিনি।
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েয়ের (কুয়েট) উপাচার্য মো. মাকসুদ হেলালী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গ্রামে গ্রামে কাঠের ব্যবহার কমিয়ে দিয়ে মানুষ সিলিন্ডারের এলপিজিতে যাচ্ছে। যত ব্যবহার বাড়ছে, তত ঝুঁকি বাড়ছে, কারণ মেনটেইনেন্স জানে না। ভুলে চুলা বন্ধ করে না। দুর্ঘটনার ৬০-৬৫ শতাংশ ঘটনাই হিউম্যান এরর।”

এমন দুর্ঘটনা কেন?
চট্টগ্রামের হালিশহরে বিস্ফোরণের কারণ অনুসন্ধানে দুটি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) ও ফায়ার সার্ভিস। তবে দুর্ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ঘরে জমে যাওয়া গ্যাস থেকে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটতে পারে।
ভয়াবহ ওই ঘটনার পরদিন ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোরে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে গ্যাস লিক থেকে বিস্ফোরণে চারজন দগ্ধ হন।
ওই বাড়ির সংযোগটি ‘অবৈধ’ ছিল বলে জানিয়েছেন বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেডের প্রকৌশলী অম্লান কুমার দত্ত।
তিনি বলেন, “ওই বাড়িতে কোনো বৈধ সংযোগ ছিল না। তারা অবৈধ সংযোগ ব্যবহার করতেন। কিছুদিন আগে সেই অবৈধ সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। পরে হয়ত তারা আবার নিজস্ব কোনো পদ্ধতিতে এই লাইন ব্যবহার করেছে। আর এ কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।”
চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলায় ২৫ ফেব্রুয়ারি ভোরে গ্যাস সিলিন্ডারের লিক থেকে বিস্ফোরণে একই পরিবারের তিনজন দগ্ধ হয়ে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিতে এসেছেন।
দগ্ধ গৃহকর্তা মাহমুদুলের ছোট ভাই হাসান বলেন, ভোর ৪টার দিকে মাহমুদুলের স্ত্রী খাদিজা আক্তার সেহরির জন্য রান্না ঘরে যান। চুলায় আগুন দিতে গেলে বিস্ফোরণ ঘটে।
গত ৬ মার্চ ভোরে উত্তরা কামারপাড়া এলাকার একটি বাসায় গ্যাস লাইন লিক থেকে বিস্ফোরণে ১০ জন দগ্ধ হন, যাদের মধ্যে ৩ জন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
এরপর ১০ মার্চ রাতে ঢাকার ধামরাইয়ে রান্নাঘরে জমে থাকা গ্যাস থেকে বিস্ফোরণে সারা শরীরে আগুন লাগে সুমনা বাদশা নামে ৪৫ বছর বয়সী এক গৃহবধূর। তাকে বাঁচাতে এগিয়ে গিয়ে দগ্ধ হন তার স্বামী ও দুই সন্তান। পরদিন জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই গৃহবধূর মৃত্যু হয়।
ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া অফিসার তালহা বিন জসিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গ্যাস লিক থেকে দুর্ঘটনা প্রায়ই কম-বেশি ঘটে, এখন বড় ঘটনা ঘটেছে বলে চোখে পড়ছে।”
তার ভাষ্য, “গ্যাস লিক কয়েকভাবে হয়, যেখানে বার্নার থাকে বার্নারের সাথে সিলিন্ডারের সাথে যে লাইনটা থাকে, সেখান থেকে সাধারণত লিক হয়। আর অনেকে এগুলোর ব্যাপারে সতর্ক না।”
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক আলী আহম্মেদ খানের পর্যবেক্ষণ, মানুষ সিলিন্ডার ব্যবহার করে, কিন্তু নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পরীক্ষা করে না।
“ব্যবহারকারীরা একদম উদাসীন। কেউ চুলা ছেড়ে চলে গেল, তখন হয়ত গ্যাসের প্রেশার চলে গেছে। আবার প্রেশার চলে এলে তখন গ্যাস বেরিয়ে জমে যায়। যেজন্য এক্সিডেন্টগুলো হয় বাসার ভেতরে।”

বাড়ছে দুর্ঘটনা, বাড়ছে প্রাণহানি
>> ২০২৫ সালে সারা দেশে ২৭ হাজার ৫৯টি আগুনের ঘটনায় ৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আরো ২৬৭ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
এর মধ্যে চুলা থেকে ২ হাজার ৯০৯টি (১০.৭৫%), গ্যাস সিলিন্ডার লিক থেকে ৯২০টি (৩.৪০%), গ্যাস সরবরাহ লাইন লিক থেকে ৫৬২টি (২.০৮%) এবং গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে ১২১টি (০.৪৫%) আগুনের ঘটনা ছিল।
>> ২০২৪ সালে সারাদেশে গ্যাস সিলিন্ডার লিক থেকে ৫৩৯টি, সিলিন্ডার বিস্ফোরণজনিত ২৯টি, গ্যাসের সরবরাহ লাইনের লিক থেকে ৩৭৯টি এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র থেকে ৬১টি আগুনের ঘটনা ঘটে।
>> ২০২৩ সালে সারাদেশে গ্যাস লাইন লিক থেকে ৬৯৪টি, সিলিন্ডার থেকে ২১০টি এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ত্রুটির কারণে ৮৮টি অগ্নিকাণ্ড হয়।
>> ২০২২ সালে গ্যাস লাইন এবং সিলিন্ডার লিক ও বিস্ফোরণ থেকে ৭৬৭টি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র থেকে ৪৮টি অগ্নিকাণ্ড হয়।
>> ২০২১ সালে গ্যাস লাইন এবং গ্যাসের সিলিন্ডার থেকে ৮৯৪টি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রে ত্রুটির কারণে ৩৯টি অগ্নিকাণ্ড হয়।
সারাদেশ থেকে ২০২৫ সালে গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনায় দগ্ধ ২৬৪ জন রোগী চিকিৎসা নিতে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে আসেন বলে ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক শাওন বিন রহমান জানান।
আসার পর তাদের অবস্থা অনুযায়ী হাসপাতালটির ছয়টি ইউনিটে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তাই সবগুলো ইউনিট থেকে তথ্য এক করে মৃত্যুর সংখ্যাটা তাৎক্ষণিকভাবে দিতে পারেননি তিনি।
শাওন বিন রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বেশিরভাগ ঘটনাই হয় রান্নাঘরে। চুলা জ্বালাতে গেছেন, তখন বিস্ফোরণটা হয়। এটা সাধারণত লাইন লিক থেকে গ্যাস জমেই হয়।”
এমন ঘটনায় অধিকাংশ রোগীর শ্বাসনালী পুড়ে যায়, ফলে অধিকাংশ রোগীই মারা যান বলে এই চিকিৎসক জানান।

কেন এ সময়ে ঘটনা বেশি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বি এম রাব্বী হোসাইন বলেন, যখন একটি বদ্ধ জায়গায় জমে থাকা গ্যাসে হঠাৎ করে আগুন ধরে যায়, তখন সেখানে অক্সিজেনের অভাব হয়। এ অবস্থায় চারপাশ থেকে প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন আসতে থাকায় একটি চাপ সৃষ্টি হয়। তাতেই শব্দ করে বিস্ফোরণ ঘটে।
তিনি বলেন, “সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ঘটনাই ঘটেছে সেহরির সময়। শীতের এই সময়টায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কম থাকে। দেখা যাচ্ছে কেউ রান্না করতে করতে গ্যাস চলে গেল, তখন হয়ত সে চুলাটা বন্ধ করতে ভুলে যাচ্ছে। যখন গ্যাস আসে তখন কিন্তু বের হয়ে জমা হতে থাকে।
“আবার এই সময়ে সাধারণত ঘরের দরজা জানালা বন্ধ থাকে। ঘুম থেকে উঠেই যখন চুলা ধরাতে যাচ্ছে, তখন আগুন লেগে বিস্ফোরণ হচ্ছে।”
অসচেতনতার পাশাপাশি বহু বছরের পুরাতন গ্যাস লাইন থেকে লিক হয়ে গ্যস জমে থাকার কথা তুলে ধরে এই শিক্ষক বলেন, “লাইনগুলো রক্ষণাবেক্ষণে কোম্পানিগুলোর গাফিলতি আছে। প্রধানত ব্যক্তিগত অসচেতনতার জন্য এমন ঘটনা বেশি হচ্ছে।”

এলপিজি মেঝেতে জমে বাড়াচ্ছে ঝুঁকি
বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েয়ের (কুয়েট) সাবেক উপাচার্য মো. মাকসুদ হেলালী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সিলিন্ডারের এলপি গ্যাসটা বাতাসের চেয়ে ভারী। আগে প্রাকৃতিক যে গ্যাসটা আমরা ব্যবহার করতাম সেটা উপরের দিকে উড়ে যেত। এখন বদ্ধ অবস্থায় এলপিজি গ্যাস ফ্লোরে জমা হতে থাকে।
“বিষয়টি আমার মনে হয় ৯০ ভাগ মানুষই জানে না। কিন্তু বিষয়টা প্রত্যেকটা গৃহিণীকে জানতে হবে। প্রয়োজনে ঘরের ডিজাইন পরিবর্তন করতে হবে।”
গ্যাস লিক থেকে বিস্ফোরণের বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের পরিকল্পনা বিভাগের মহাব্যবস্থাপক সত্যজিৎ ঘোষ বললেন, তাদের প্রাকৃতিক গ্যাসের লাইন লিক হলে গ্যাস ছড়াতে পারে ‘ওপেন এয়ারে’।
“ওপেন এয়ারে জীবনহানির সম্ভাবনা কম। বড় আগুন ধরলেও সাধারণ খুব বেশি ক্ষতি হয় না। এতে আমাদের সিস্টেম লসটা বাড়ে।”
তিনি এলপিজি সিলিন্ডারের দিকে আঙ্গুল তুলে বলেন, “এটা সঠিকভাবে হ্যান্ডেল না করা গেলে বিপদজনক। তাই সিলিন্ডারের ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ।”
সত্যজিৎ ঘোষ বলেন, “আগুন লাগলেই অনেকে মনে করেন সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়েছে। কিন্তু সিলিন্ডার থেকে চুলা পর্যন্ত যে কানেন্টিং পাইপ, সেখানে হয়ত লিক থাকে। সূক্ষ্ম লিক হলেও গ্যাসটা বের হয়ে ফ্লোরে জমা হয়ে থাকে। যখন কেউ রান্না করতে আসে, বিস্ফোরণ হয়। এটা খুবই সাংঘাতিক, অনেকগুলা বোমা একসঙ্গে বিস্ফোরণের মত শক্তিশালী হতে পারে।”
এই প্রকৌশলীর ভাষ্য, “পাইপলাইনের গ্যাস বাতাসের চেয়ে হালকা, সেটি সিলিংয়ের দিকে যেতে থাকে। ভেন্টিলেশন প্রপার থাকলে জমা হতে পারে না, দুর্ঘটনার সম্ভানা কমে যায়। যদি বের না হতে পারে সেক্ষেত্রেও গ্যস চেম্বার হয়ে যায়, তখন কিছু একটা ফায়ার করলে সাংঘাতিক রকমের এক্সপ্লোশন হতে পারে।”

বাজারে তিন কোটির বেশি সিলিন্ডার
আগুন বা বিস্ফোরণের পর ৯০ শতাংশ ঘটনাতেই ঘটনাস্থলে গিয়ে সিলিন্ডার অক্ষত পাওয়া যায় বলে দাবি করেছেন একটি এলপিজি বিপণন কোম্পানির কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, “একটা সিলিন্ডার ৫ বছর পর পর টেস্ট করা, ১০ বছর পর পর রিনিউ করা এবং ২০ বছর পর বাতিলের নিয়ম রয়েছে। কিন্তু দেশে ২০ বছরের পুরাতন সিলিন্ডার আছে বলে মনে হয় না।”
সিলিন্ডারগুলো বাজারজাত করার আগে বিস্ফোরক পরিদপ্তরসহ অন্তত ৩-৪টি প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র নিয়ে বাজারজাত করতে হয়।
ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, “প্রত্যেকটা ঘটনাতে দেখা গেছে, কেউ রেগুলেটর সুইচ খুলে রাখল, বা পাইপসহ যে এক্সেসরিজগুলো ব্যবহৃত হয়, সেগুলোতো গ্রাহকরা কেনেন। সেখান দিয়ে লিক হয়ে গ্যাস বের হয়ে থাকলে কোম্পানির কী করার আছে?”
তবে অধ্যাপক মাকসুদ হেলালী বলেন, “পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে সিলিন্ডারগুলো ডাবল প্রোটেকশন থাকে, আমাদের সিঙ্গেল প্রোটেকশন। এভাবেই আমাদের অনুমোদন দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের সরকারের পলিসিগত গণ্ডগোল রয়েছে।”
সিলিন্ডারগুলো বাজারে ছাড়পত্র দেওয়ার আগে সবশেষ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ছাড়পত্র দেয় বিস্ফোরক পরিদপ্তর। সংস্থাটির হিসেবে, বর্তমানে অন্তত ৩ কোটি সিলিন্ডার বাজারে রয়েছে।
সিলিন্ডারগুলো বাজারে ছাড়ার পর তদারকির বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক মো. আলিম উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটা তদারকির কিছু নাই। যে সিলিন্ডার টেস্টে ওকে হয়, সেটাই বাজারে ছাড়া হচ্ছে। এছাড়া প্রতিবার রিফিলের আগে সেটি চেক করা হয়, কোনো লিক আছে কি না।
“সিলিন্ডারতো বিস্ফোরণ হয় না। এখন রেগুলেটর, পাইপলাইন বা ভাল্ব থেকে যদি লিক হয়, সেটি গ্রাহকের অসেচতনা। এলপিজি ব্যবহারকারীদের রান্নার আধঘণ্টা আগে জানালা খুলে দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া আছে, সেটা অনেকে মানে না। দেখা গেল রান্নার পর রেগুলেটর বন্ধ করল না, লিকেজ থেকে গ্যাস জমে বিস্ফোরণ হল।”

গ্যাস বিতরণ কোম্পানির দায় কতটা?
গ্যাস লিক থেকে বিস্ফোরণের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের পরিকল্পনা বিভাগের মহাব্যবস্থাপক সত্যজিৎ ঘোষ বলেন, একটা বাসার গ্যাসলাইনের রাইজার পর্যন্ত দায়িত্ব কোম্পানির। রাইজার থেকে বাড়ির অভ্যন্তরে দেখভালের দায়িত্ব বাড়ির মালিক বা ব্যবহারকারীর।
তিনি বলেন, “বাসাবাড়ির ইন্টারনাল লাইনগুলে যাতে তারা নিয়মিত পরীক্ষা করিয়ে নেয়, সেজন্য আমরা বলি।”
এর বাইরে তিতাসের আওতাধীন লাইনগুলো বিভিন্ন সময়ে নজরদারি করার কথা বলেন সত্যজিৎ ঘোষ।
ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ আশপাশের এলাকার পুরনো সরবরাহ লাইন মেরামতের একটি প্রকল্প তৈরি করেছিল তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। তবে তা চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি।
সত্যজিৎ ঘোষ বলেন, “অনেক জায়গায় পুরোনো লাইনগুলো পরিবর্তনের চেষ্টা করছি আমরা। যেসব এলাকায় পুরাতন বা অনেক লাইন আছে, দ্রুত পরিবর্তন করা যায় কি না। সেই প্রকল্প এখনো অনুমোদন পর্যায়ে যায়নি, তবে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। পরিকল্পনা প্রণয়নে অনেকদূর এগিয়ে গেছে।”

সবার আগে প্রয়োজন সচেতনতা
ফায়ার সার্ভিসের সাবেক মহাপরিচালক আলী আহম্মেদ খান বলেছেন, “গ্যাস লাইনগুলো মেনটেইনেন্স করা প্রয়োজন। যারা বাসাবাড়ির মালিক, তারা এবং ব্যবহারকারীদের এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে।”
সবার আগে সচেতনতার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “ঘুমানোর আগে গ্যাসের সুইচ অফ করতে হবে। সকালে ঘুম থেকে উঠে দরজা জানালা খুলে দিতে হবে।”
ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া অফিসার তালহা বিন জসিম বলেন, “গ্যাসের চুলা যেখানে থাকবে, সেখানে সবসময় বড় জালানা থাকতে হবে, খোলা বাতাস থাকবে। যেন গ্যাস লিকেজ হলেও বের হয়ে যেতে পারে। চুলার আশেপাশে যে লাইন লাগানো আছে, সেটা পরীক্ষা করা হয় না। ম্যাক্সিমাম ঘটনাগুলোই যেহেতু মানুষের অসচেতনতার জন্য হচ্ছে, সেজন্য সচেতনতা বাড়াতে হবে।”
কেউ একজন সিলিন্ডার কিনলে সেটা রিফিল করতে দিয়ে আরেকটা নিয়ে আসেন। তার কেনা সিলিন্ডার কোথায় গেলো কেউ জানে না। এভাবে সিলিন্ডারগুলো হাতে হাতে ঘুরতে থাকে। তাই সেগুলো নেওয়ার সময় মেয়াদের তারিখ দেখে নেওয়ার পরামর্শ দেন এই কর্মকর্তা।
পাশাপাশি যখন সেটা বাসায় ব্যবহার করা হচ্ছে, তখন এর সঙ্গে ভালো টিউব বা ভালো রেগুলেটর এবং পাইপ লাগানো হচ্ছে কি-না, সে বিষয়েও নিশ্চিত হওয়ার কথা বলেন তিনি।