Published : 20 Apr 2026, 07:10 PM
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) আইন চ্যালেঞ্জ করে এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রমের ওপর স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে নির্দেশনা চেয়ে হাই কোর্টে রিট আবেদন করেছেন কয়েকজন আইনজীবী।
তবে হাই কোর্ট এখনই এ বিষয়ে বিস্তারিত শুনানিতে যাচ্ছে না। এ বিষয়ে রায় হওয়া আরেকটি রিট মামলার আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি অপেক্ষমান রাখা হবে। ততদিন পর্যন্ত এ রিট মামলা কার্যতালিকায় থাকবে।
বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের হাই কোর্ট বেঞ্চে সোমবার এই সিদ্ধান্ত দেয়।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. সাদ্দাম হোসেনসহ সাতজন আইনজীবী রোববার ‘জনস্বার্থে’ এ রিট আবেদন করেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব, আইন সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের সেখানে বিবাদী করা হয়।
রিটকারী পক্ষ শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক এং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মেহেদী হাসান।
এর আগে সাত আইনজীবীর করা এক রিট আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাই কোর্ট গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের জন্য তিন মাসের মধ্যে পৃথক স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে নির্দেশ দেয়। এ বছর ৭ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ১৮৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশ করা হয়।
হাই কোর্ট ওই রায় ঘোষণার পর ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ শিরোনামে একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর ১১ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় উদ্বোধনও করা হয়।
কিন্তু ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ওই অধ্যাদেশ বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়। বিরোধী দলের আপত্তির মধ্যেই গত ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল’ পাস হয়।
আইনজীবী শিশির মনির সেদিনই বলেছিলেন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) আইন চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করা হবে। রোববার সাত আইনজীবী সেই আবেদন করেন।
সোমবার এ বিষয়ে শুনানির পর অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, “অতি সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস করা সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ আইনটাকে চ্যালেঞ্জ করে রিট পিটিশনটি দায়ের করা হয়েছে। এই যে রহিতকরণ আইন যেটা, সেটা কেন সংবিধান বহির্ভূত বলে ঘোষণা করা হবে না মর্মে একটা রুল চাওয়া হয়েছে।”
কাজল বলেন, “আপনারা জানেন যে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ, সেটাকে চ্যালেঞ্জ করে একটা রিট পিটিশন দায়ের হয়েছিল। সেই রিট পিটিশন দায়েরের ফলশ্রুতিতে ৭২ সালের যে সংবিধানে যেভাবে বিধান ছিল, সেই বিধানটা ফিরে এসেছিল ওই রায়ের মাধ্যমে।
“কিন্তু ইতোপূর্বে যে রায়ের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, সেই রায়টি চূড়ান্ত নিষ্পত্তিকৃত রায় নয়। এ কারণে নয় যে তখন মাননীয় বিচারপতিগণ মামলার রায় দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু আমাদের সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী একটা সার্টিফিকেট দিয়েছেন। সার্টিফিকেট দেওয়ার অর্থ হচ্ছে যে, সেটা সরাসরি আপিল বিভাগে আপিল হিসেবে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে।”
তিনি বলেন, “এই চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আমাদের পক্ষ থেকে বক্তব্য, আমি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে বক্তব্য রেখেছি, বলেছি, যেহেতু ম্যাটারটা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এবং আপিলের দায়েরের প্রক্রিয়া আমাদের এই অফিসের পক্ষ থেকে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, সুতরাং ওটা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই মামলাটার শুনানি করা উচিত হবে কিনা।”
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, “আদালত নিজেও এক্ষেত্রে উল্লেখ করেছেন, তিনি যেহেতু এই মামলার পূর্বের রায় প্রদানকারী বিচারপতি, যদিও বেঞ্চের এখন আরেকজন বিচারপতি পরিবর্তন হয়েছে, উনিও এ ব্যাপারে একটা, কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে ছিলেন।
“আমাদের পক্ষ থেকে আমি আদালতকে বলেছি, রহিতকরণ আইনের মধ্যে বলা আছে, আরো অধিকতর যাচাই-বাছাই করা হবে। এই অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের অর্থ তো এটাও হতে পারে যে, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি পর্যন্ত তারা দেখতে পারে।
“আমাদের পক্ষ থেকে আমরা বলেছি যত দ্রুত সম্ভব আমরা পূর্বের রায়ের বিরুদ্ধে আমরা আমাদের আপিল দায়ের করব।”
কাজল বলেন, “আদালতও আমাদের এই বক্তব্যটাকে গ্রহণ করার এক পর্যায়ে, এই মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী তিনি বললেন যে, আমরা একটু অপেক্ষা করি, আমাদের মামলাটা এই আদালতে থাকুক।”
তিনি বলেন, “এই রায়টি যখন ইনিশিয়ালি হয়েছিল তারপরেই কিন্তু এই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশটি জারি হয়েছিল। এবং সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পার্লামেন্টে কোনো অধ্যাদেশ হলে কীভাবে সেটা ডিল হবে সেটাও কিন্তু সংবিধানের বিষয়টা আমি আদালতের সামনে উপস্থাপন করেছি।
“এখন আদালতের কাছে মামলাটি তাদের কার্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত থাকবে। আমরা আমাদের প্রক্রিয়া, আমাদের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিলের যে প্রক্রিয়া, সেটা যত দ্রুত সম্ভব আমরা সম্পন্ন করব।”
রিটকারীর আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, “আবেদনে তারা তিনটি গ্রাউন্ড রেখেছেন। এক নম্বর গ্রাউন্ড ছিল, জুডিশিয়াল ইমপারমিসেবল লেজিসলেটিভ ওভাররাইড। অর্থাৎ যেটি পার্লামেন্ট করেছে, এই করাটুকু বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে একটি জাজমেন্ট থাকা অবস্থায় করতে পারে কিনা।
“সেকেন্ড প্রশ্ন ছিল, ইনস্টিটিউশনাল ইন্ডিপেন্ডেন্স ইজ এ সাইনে কোয়া নন ফর ইন্ডিপেন্ডেন্স অফ জুডিশিয়ারি। অর্থাৎ বিচারকরা শুধু স্বাধীন বললেই হবে না, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তারা স্বাধীন কিনা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা স্বাধীন কিনা, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে তারা স্বাধীন কিনা, এই বিচারটিও এখানে বিচার্য বিষয়।
“আর থার্ড হল, সংবিধান এমেন্ড করেও বেসিক স্ট্রাকচার যেগুলো আছে সংবিধানের, বাংলাদেশের সংবিধানের ওয়ান অফ দি বেসিক স্ট্রাকচার হল বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ইন্ডিপেন্ডেন্স অব জুডিশিয়ারি। ইন্ডিপেন্ডেন্স অব জুডিশিয়ারি ইনক্লুডস থ্রি থিংস- একটা হলো বিচারিক কাজে তারা ইন্ডিপেন্ডেন্ট হবেন, ইনস্টিটিউশনালি তারা ইন্ডিপেন্ডেন্ট হবেন, ফাইনান্সিয়ালি তারা ইন্ডিপেন্ডেন্ট হবেন।”
শিশির মনির বলেন, “এই বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে খর্ব করে এরকম কোনো আইন পার্লামেন্ট যদি পাস করে, তাহলে এটি অসাংবিধানিক অতীতে ডিক্লেয়ার করা হয়েছে। শুধু আইন না, সংবিধান সংশোধন করে যে সমস্ত সংশোধনী এনেছিলেন, সেগুলোকেও আমাদের উচ্চ আদালত অসাংবিধানিক ডিক্লেয়ার করে দিয়েছে।”
সবকিছুর প্রেক্ষাপটে এই মামলাটি তালিকায় থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, “রাষ্ট্রপক্ষ বলেছেন তারা আপিল দায়ের করবেন। প্রেফারেবলি আগামী কালকের মধ্যেই আপিল দায়ের করবেন। আর তৃতীয়ত হল, আদালতের এক্সপেক্টেশন যে ইন দ্য মিনটাইম এখানকার যে সমস্ত এস্টাবলিশমেন্ট আছে, এগুলোকে যেন বিচার বিভাগের, সুপ্রিম কোর্টের প্রতি সম্মান জানিয়ে সরিয়ে ফেলা না হয়। লার্নেড অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন তিনি আদালতের এক্সপেক্টেশন শুনেছেন এবং তিনি এই মেসেজটি কনভে করবেন।”