Published : 04 Jul 2026, 10:14 PM
বাসাবাড়ির ছাদে উড়ছে বিদেশি পতাকা; আর চায়ের দোকান, অফিস সবখানে তুমুল তর্ক¬-এমন দৃশ্যই বলে দেয় দেশে ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে কতটা উন্মাদনা চলছে।
রাজধানীর গুলশানে নিকেতন বাজার গেইট এলাকায় শুক্রবার ‘শামীম মামার টং দোকানে’ চা খেতে গিয়ে আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেখা।
ব্রাজিল বনাম আর্জেন্টিনা সমর্থক এই দুই বন্ধুর মধ্যে তখন চলছিল ধুন্ধুমার তর্ক।
এক পর্যায়ে মনে হল, মারামারি বেঁধে যায় কিনা। কিন্তু না, এই উত্তাপ বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা নিয়ে। দুই বন্ধুর একজনের নাম ফাহমিদ হাসান রোহান।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আসলে আমরা মজাচ্ছলেই খোঁচাখুঁচি করছিলাম। অন্য কিছু না। তাসীন (অপর বন্ধু) আর্জেন্টিনার বিরাট সমর্থক। আমি ব্রাজিলের। এ নিয়েই খুনসুটি।”
দুই একবার ব্যতিক্রম ছাড়া সাধারণত চার বছর পর-পর যে ফুটবল বিশ্বকাপ হয়, তার উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। ঢাকার পাড়া-মহল্লা হৈচৈ আর উচ্ছ্বাসে ভেসে যায়। উত্তাপ ছড়ায় কথায়, তর্কে।
বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডের পর রাউন্ড-৩২ এর খেলাও শেষ হয়েছে। শেষ ১৬ এর খেলা শুরু হচ্ছে শনিবার রাত থেকে।
বাংলাদেশে ফুটবল নিয়ে উন্মাদনার মূলে থাকে পাঁচবারের বিশ্বকাপজয়ী দল ব্রাজিল এবং তিনবারের বিশ্বকাপজয়ী দল আর্জেন্টিনা। তবে অন্যান্য দলের সমর্থকের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়।
এবারের বিশ্বকাপে চিরচেনা দলগুলোর বাইরে নজর কেড়েছে ইরান ফুটবল দলকে ঘিরে সমর্থকদের উল্লাস। যদিও গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছে দলটি। তবু, রাজধানীর অনেক বাসাবাড়ির ছাদেই ইরানের পতাকা উড়তে দেখা গেছে।
এই তিন দলের বাইরে ফ্রান্স, জার্মানি, পর্তুগাল, স্পেন ও মরক্কোর সমর্থকই বেশি।

বিশ্বকাপ উপলক্ষে শুধু ঢাকার পাড়া-মহল্লায় সবাই মিলে খেলা দেখার আমেজই শুধু নয়, বাসাবাড়িতে পছন্দের দলের পতাকা টানিয়েছেন অনেকে। বাস, গাড়ি, মোটরসাইকেলে কেউ-কেউ ঝুলিয়েছেন নিজের পছন্দের দলের পতাকা। এমনকি বাদ পড়েনি নৌযানও। নৌকা, ট্রলার, লঞ্চের ছাদে ওড়ছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইরানসহ প্রিয় দলের পতাকা। ব্যাটারিচালিত রিকশার সামনে ঝোলানো পতাকারও দেখা মিলছে।
কোনো-কোনো দলের ম্যাচ উপলক্ষে তো রীতিমতো সমর্থকরা রান্না-বান্না করে আয়োজন করে খেতে-খেতে খেলা দেখেছেন। কার পতাকা বেশি বড়ো, সেটি নিয়েও লড়াই কম নয়। নিজেরাও প্রিয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নেমে পড়ছেন ফুটবল নিয়ে।
তর্ক থেকে ঝগড়া, মারধরের জের ধরে হত্যকাণ্ডও ঘটে গেছে দুই-এক জায়গায়।
নিকেতন বাজার গেইট এলাকায় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন করেছেন স্থানীয় যুবকেরা।
জানতে চাইলে এখানে বসবাস করা বেসরকারি চাকরিজীবী সাইফুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিশ্বকাপ আসে চার বছর পরপর। বাসায় টিভি আছে, কিন্তু বড়ো পর্দায় সবাই মিলে খেলা দেখার মজাই আলাদা। গোল হলে পরে সবাই মিলে উল্লাস করাটা ভীষণ উপভোগ করি। আমি আর্জেন্টিনার সমর্থক, আশা করি এবারও আর্জেন্টিনাই কাপ জিতবে।”
এই এলাকার আরেক বাসিন্দা আলী হায়দারের ছেলের বয়স ছয় বছর। তার গ্রামের বাড়ি যশোরে।
হায়দার বলেন, “আমার ছেলের জন্য ব্রাজিলের জার্সি কিনব ভাবছি। তবে, যদি রাউন্ড ১৬ পেরোতে পারে, তখনই কিনব। নরওয়ে শক্ত প্রতিপক্ষ। তবে, আমি কাপ জেতার ব্যাপারে আশাবাদী।”
শুধু পাড়ায়-মহল্লায় বড়ো পর্দায় খেলা দেখাতেই বিশ্বকাপের উন্মাদনা সীমাবদ্ধ নয়, রাস্তাঘাটেও চোখে পড়ছে প্রিয় দলকে সমর্থনের নানারকম বহিঃপ্রকাশ। নিজেও পরছেন প্রিয় দলের জার্সি। মাথায় ব্যান্ডানা পরতেও দেখা যায় কাউকে-কাউকে।

তেমনই একজনের সঙ্গে শুক্রবার দেখা হল রাজধানীর মগবাজার ওয়্যারলেস এলাকায়। নাসির উদ্দীন নামে এই ব্যক্তি একজন ব্যবসায়ী। তার মটরসাইকেলের সামনে আটকানো স্পেনের পতাকা। গায়ে স্পেনের জার্সি।
তিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার একটি কাপড়ের দোকান আছে এখানে। আমি স্পেনের সমর্থক। বাসার ছাদেও পতাকা টানিয়েছি। আশা করছি প্রিয় দল এবার কাপ নেবে। জিতলেও স্পেন, হারলেও স্পেন।”
ধানমন্ডি-৩২ এলাকার বাসিন্সা মাহফুজ রোমেল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি ব্রাজিলের সমর্থক। এলাকায় আমরা একটা বড়ো পর্দায় খেলা দেখার ব্যবস্থা করেছি। একদিন বন্ধু-বান্ধব নিয়ে মোটরসাইকেল র্যালিও করেছি। সবই মজা আসলে।”

তার সঙ্গে থাকা বন্ধু রিয়াজ মাহমুদ এই শুনে একটু রসিকতাই করলেন। বললেন, “তোরা তো র্যালি করেছিস। আর্জেন্টিনার সঙ্গে কেইপ ভার্ডের খেলার দিন আমরা গরু জবাই করে পিকনিক করব। তোকেও দাওয়াত দিব। খেয়ে যাবি। ব্রাজিল সমর্থক বলে পিটুনি খেতে হবে না। আমি বলে রাখব।
“আসলে এই তো আনন্দ। একটা উপলক্ষ হল এই বিশ্বকাপ। একটু তর্ক-বিতর্ক, মজা বন্ধুদের সঙ্গে। এই তো।”
জার্সির পাশাপাশি বিশ্বকাপ উপলক্ষে দলের পতাকার নকশা, রঙের আদলে কাস্টমাইজড চশমা, রিস্টব্যান্ড, ব্যান্ডানা বিক্রি হতে দেখা গেছে।

এমনকি আইসক্রিমের প্যাকেট, চিপসের প্যাকেট, পানির বোতলের লেবেলের ওপরও বিভিন্ন ফুটবল দলের পতাকার নকশা আর রঙের ছাপ দেখা গেছে।
ঢাকার মহাখালী এলাকায় ভ্যানে জার্সি বিক্রি করছিলেন হাশেম নামের এক বিক্রেতা। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিশ্বকাপের মৌসুম ছাড়া দলের জার্সি তেমন চলে না। এমনি লিগের দলগুলোর জার্সি চলে টুকটাক অন্য সময়।”
কোন দলের জার্সি বেশি চলে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় আর্জেন্টিনার জার্সি। এরপর ব্রাজিল, জার্মানি এসব দলের জার্সি বেশি বিক্রি হয়। দিনে ২০-৩০টা পর্যন্ত বিক্রি করেছি এই কয়েকদিনে। মানভেদে ভিন্ন-ভিন্ন দামের জার্সি আছে।”

মগবাজার এলাকার রিস্টব্যান্ড এবং চশমা বিক্রেতা মো. সোহাগ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রিস্টব্যান্ড একসময় প্রচুর চলত। এখন কম চলে। তবে, বিশ্বকাপ উপলক্ষে দলের পতাকার আদলে তৈরি রিস্টব্যান্ড ভালো চলে এখন। ২০ থেকে ১০০ টাকা দামে এগুলো বিক্রি হয়।”