Published : 25 Aug 2025, 06:55 PM
জুলাই আন্দোলনের সময় আহত হয়ে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আসা অনেকেই ভয়ে পরিচয় গোপন রেখেছিলেন বলে আদালতকে বলেছেন এক চিকিৎসক।
ওই হাসপাতালের চিকিৎসক জাকিয়া সুলতানা নীলা সোমবার বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ সাক্ষ্য দেন।
মানবতাবিরোধী এ মামলার তিন আসামি হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন। এ মামলায় চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন রাজস্বাক্ষী হয়েছেন।
সাক্ষী জাকিয়া সুলতানা নীলা জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের রেটিনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।
জাকিয়া সুলতানা বলেন, ১৭ জুলাই থেকে তাদের হাসপাতালে রোগী আসা শুরু করে। প্রথম দিন আসেন ৫ জন, যারা ‘মেটালিক পিলেটে’ বিদ্ধ হন।
১৮ জুলাইকে ‘রক্তস্নাত’ দিন উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ওই দিন আমার অস্ত্রোপচার ছিল; আমি অপারেশন থিয়েটারে ছিলাম। দুপুরে হঠাৎ খবর এল, হাসপাতালে অনেক রোগী আসতে শুরু করেছে। তাদের চিকিৎসা দিতে হবে।”
তিনি বলেন, ওই দিন ভর্তি হয়েছিলেন ১০০ জনের মতো রোগী। এর বাইরে আরও ৮০ থেকে ১০০ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।
“দুপুরের পর জরুরি বিভাগে দেখি ভয়াবহ চিত্র। সেখানে শতাধিক আহত রোগী, যাদের বয়স ১৪ থেকে ২৫ এর মধ্যে। কেউ এক হাত দিয়ে এক চোখ ধরে রেখেছে, কেউ দুই হাত দিয়ে দুই চোখ ধরে রেখেছে। তাদের শরীর রক্তস্নাত।
“ওই দিন অস্ত্রোপচার শুরু হয় ১০টি অপারেশন টেবিলে; চলে রাত ১০টা পর্যন্ত। পরের দিনও আমরা প্রায় একই রকম চিত্র দেখতে পাই। সেদিন ৮০ থেকে ১০০ জন রোগী ভর্তি করি। সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত অপারেশন চলে ১০টি টেবিলে। বেশির ভাগ রোগী ছিলেন মেটালিক পিলেটবিদ্ধ, কেউ কেউ ছিল রিয়েল বুলেটে আহত।”
জাকিয়া বলেন, আহতদের বিভিন্ন ধরনের জখম ছিল। কারো কর্নিয়া ছিদ্র, কারো স্কলেরা (চোখের সাদা অংশ) ছিদ্র, কারো চোখ ফেটে যাওয়া, কারো রেটিনা আঘাতপ্রাপ্ত এবং কারো কারো চোখে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল।”
এ চিকিৎসক বলেন, তাদের হাসপাতালে আসা রোগীদের মধ্যে চিরতরে এক চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন ৪৯৩ জন। দুই চোখের দৃষ্টি হারান ১১ জন। দুই চোখে গুরুতর দৃষ্টি স্বল্পতায় ভুগছেন ২৮ জন, এক চোখে গুরুতর দৃষ্টি স্বল্পতায় ভুগছেন ৪৭ জন। এক চোখে সাধারণ দৃষ্টি স্বল্পতায় ভুগছেন ৪৩ জন।
তিনি সাক্ষ্যে বলেন, নিরাপত্তার কারণে অনেক রোগী আসল নাম গোপন করেন; কেউ কেউ ডাকনাম দিয়েছে, কেউ কেউ মোবাইল ফোন ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ভুল নম্বর দেন। তারা ভীত ও আতঙ্কিত ছিলেন।”
এ সময় তিনি আদালতের অনুমতি নিয়ে একটি ‘পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন’ দেখান, যেখানে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া রোগীদের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।
এদিন জাকিয়া সুলতানা নীলাসহ পাঁচজন সাক্ষ্য দেন। অন্যরা হলেন জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. খায়ের আহমেদ চৌধুরী, বাড্ডার ফুচকা ও চটপটি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইদ্রিস, লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী আমেনা আক্তার এবং কুমিল্লার হাসনেয়ারা বেগম।
এদের মধ্যে মোহাম্মদ ইদ্রিস হারিয়েছেন তার উচ্চমাধ্যমিক পড়ুয়া ছেলেকে। আর বাসচালক ছেলেকে হারিয়েছেন হাসনেয়ারা।