Published : 30 Apr 2026, 04:46 PM
হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ করে দিতেই বর্তমান গভর্নরকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জাতীয় সংসদে অভিযোগ তুলেছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেছেন, বর্তমান সরকারি দলের বহু প্রার্থী ও সংসদ সদস্য বড় অঙ্কের ঋণে জর্জরিত। তাদের অনেকেই নির্বাচনের আগে কিছু টাকা পরিশোধ করে ঋণ পুনঃতফসিল করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে গভর্নরের ‘স্পেশালিটি’ হচ্ছে ঋণ পুনঃতফসিল এবং সে কারণেই তাকে এ পদে বসানো হয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম তার বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে অপসারণ করে গ্রেপ্তারের দাবি যেমন জানিয়েছেন, তেমনই ১৯৭২ সালের সংবিধানকে ‘অগণতান্ত্রিক’ আখ্যা, নতুন সংবিধান বা সংবিধান পুনর্লিখনের পক্ষে অবস্থান, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন। সেই সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদকে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে দলীয় ইশতেহারে পরিণত করার অভিযোগ, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের তাগিদ, ঋণখেলাপি সংসদ সদস্যদের প্রসঙ্গ, আইনশৃঙ্খলা, জঙ্গি তৎপরতা, ধানের দাম, জুলাই গণহত্যার বিচার এবং কর্মসংস্থান নিয়েও কথা বলেছেন।
ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশনে তার আগে বক্তব্য দেন বাগেরহাট-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদুল ইসলাম।
বক্তব্যের শুরুতে নাহিদ ইসলাম বলেন, তিনি অন্য বিষয় দিয়ে আলোচনা শুরু করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এর আগে অর্থমন্ত্রী আর্থিক খাত নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেই সূত্র ধরেই তিনি বক্তব্য শুরু করছেন।
তিনি বলেন, ব্যাংকিং বা আর্থিক খাতের প্রসঙ্গ এলেই অর্থমন্ত্রী বারবার বলেন, বিএনপি আমলে আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলার কোনো রেকর্ড নেই। কিন্তু কিছুক্ষণ আগেই তিনি অস্বীকার করেছেন যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর একটি রাজনৈতিক নিয়োগ, যদিও তার দাবি, গভর্নর সরকারি দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন।
টিআইবির তথ্য তুলে ধরে নাহিদ বলেন, বর্তমান সরকারি দলের যেসব প্রার্থী নির্বাচনে ছিলেন, তাদের ৫৯ দশমিক ৪১ শতাংশ ঋণগ্রস্ত।
তিনি বলেন, সংসদ সদস্যদের ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে, যার অধিকাংশই সরকারি দলের সদস্যদের। এদের অনেকে নির্বাচনের আগে কিছু টাকা দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করে প্রার্থী হয়েছেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “বর্তমান যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, তার স্পেশালিটিটা কী? তার স্পেশালিটি হচ্ছে এই ঋণ পুনঃতফসিল করা। এটাতে তিনি এক্সপার্ট।”
তিনি এও বলেন, “এই যে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ, সেই ঋণগুলো যাতে ঋণ পুনঃতফসিল করতে পারে, সেই সুযোগ-সুবিধাটা করে দেওয়ার জন্যই বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন ব্যবসায়ীকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর দেওয়া হয়েছে।”
এরপর রাষ্ট্রপতি প্রসঙ্গে গিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, রাষ্ট্রপতির বক্তব্য ‘শুনিও নাই, পড়িও নাই’। কারণ এই রাষ্ট্রপতির বক্তব্য দেওয়ার সুযোগকেই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
তিনি বলেন, “এই রাষ্ট্রপতির অপসারণ প্রয়োজন, তাকে গ্রেপ্তার করা প্রয়োজন। এই রাষ্ট্রপতির আর কোনো অধিকার নেই বঙ্গভবনে থাকার।”
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের অতীত নিয়ে বিস্তর অভিযোগ তুলে নাহিদ বলেন, দুদকের কমিশনার থাকাকালে তাকে তিনটি ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ দেওয়া হয়েছিল। প্রথমত খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে শাস্তি নিশ্চিত করা, দ্বিতীয়ত পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অভিযোগ থেকে আওয়ামী লীগকে ‘ক্লিনশিট’ দেওয়া এবং তৃতীয়ত, ফখরুদ্দীন-মইনের আমলে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে হওয়া দুর্নীতির মামলাগুলো বাতিল করে দেওয়া।
এনসিপি প্রধান বলেন, “এমন একজন ব্যক্তিকে বিএনপি সরকার রাষ্ট্রপতি হিসেবে এখনো মেনে নিচ্ছে।”
নাহিদ বলেন, ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার সরকারের আমলে সাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে ২০০১ সালের সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে একটি বিচারিক তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছিল। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিএনপির ২৬ হাজার নেতাকর্মীকে দায়ী করা হয়েছিল এবং আওয়ামী লীগ দেশে-বিদেশে ওই প্রতিবেদন ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে।
তার ভাষায়, “এই রাষ্ট্রপতি চুপ্পু এস আলমের হাতে ইসলামী ব্যাংক তুলে দেওয়ার কারিগর, দুই কোটি আমানতকারীকে পথে বসিয়েছিল।”
জুলাই আন্দোলনের সময় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা সবার জানা।
“আমাদের দুর্ভাগ্য এই দুর্নীতিবাজ, অপদার্থ, মিথ্যুক, গণহত্যার দোসর এখনো বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি।”
রাষ্ট্রপতির অধীনে অন্তবর্তী সরকারে উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেওয়া নিয়ে সমালোচনার জবাবও দেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, ৫ অগাস্টের পর তাদের সামনে দুটি পথ ছিল। একটি ছিল জাতীয় সরকার গঠন, অন্যটি ছিল ক্ষমতা সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া।
নাহিদের ভাষ্য, জাতীয় সরকারের প্রস্তাব বিএনপি নাকচ করে দেয়। সে সময় যদি সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া হত, তাহলে বিএনপি এখনো ক্ষমতায় আসতে পারত কি না, তা নিয়েও সন্দেহ আছে।
তিনি বলেন, “দেশের স্বার্থে, দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থে আমরা সেই সময় সরকারে গিয়েছিলাম। আমরা শপথ নিয়েছিলাম।”
জুলাই আন্দোলনে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ দাবি করেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ২০২৪ সালেই রাষ্ট্রপতির অপসারণ চেয়েছিল। কিন্তু তখন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার কথা বলে বিএনপি রাষ্ট্রপতির পক্ষে অবস্থান নেয়। এখন যেহেতু একটি নির্বাচিত সরকার আছে, তাই চাইলে সরকার রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন করতে পারে।
তিনি বলেন, “এখন তো সাংবিধানিক সংকট নেই। তাহলে কেন এখন তাকে অপসারণ করা হচ্ছে না?”
নাহিদ বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি বিএনপিতে সেই ধরনের যোগ্য, আস্থাভাজন ব্যক্তি নিশ্চয়ই রয়েছে।”
সরকারি দলের কিছু সদস্যের বক্তব্য টেনে তিনি বলেন, তারা গৌরবের সঙ্গে বলেছেন যে, রাষ্ট্রপতি একসময় জিয়াউর রহমানের বিরোধিতা করেছিলেন, সেই রাষ্ট্রপতিই এখন জিয়াউর রহমানের প্রশংসা করছেন।
এ প্রসঙ্গে নাহিদ বলেন, “গাধাকে দিয়ে হাল চাষ করিয়ে এটার মধ্যে কোনো বাহাদুরি নাই।”
তিনি বলেন, “এটা আপনাদের দেউলিয়াত্ব, সরকারের দেউলিয়াত্ব যে- সরকার এখনো রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন করতে পারছে না।”
সংবিধান প্রসঙ্গে গিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধানকে ১৯৭১ সালের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে, যা তার কাছে ‘অদ্ভূত’ লেগেছে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সবসময় ’৭২-এর সংবিধানকে ’৭১-এর ফসল বা ’৭১-এর চেতনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখিয়েছে। কিন্তু তারা বরাবরই এর বিরোধিতা করেছেন। বিএনপির বহু নেতাও এর বিরোধিতা করেছেন।
তার ভাষায়, ১৯৭২ সালের সংবিধানের সমালোচনা তিনটি জায়গায়। প্রথমত, এটি স্বাধীন বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা প্রণয়ন করেননি। দ্বিতীয়ত, এটি ‘ইনহেরেন্টলি একটা আনডেমোক্রেটিক কনস্টিটিউশন’। তৃতীয়ত, এটি ‘মুজিববাদী আদর্শ’ দ্বারা রচিত।
নাহিদ বলেন, পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র রচনার জন্য ১৯৭০ সালের নির্বাচনে যারা নির্বাচিত হয়েছিলেন, তারাই ১৯৭২ সালের সংবিধান তৈরি করেন।
তার মতে, স্বাধীন দেশের শাসনতন্ত্র স্বাধীন দেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের রচনা করার কথা ছিল।
তিনি বলেন, শেখ মুজিবকে সামনে রেখে এমন একটি সংবিধান করা হয়েছিল, যাতে তার হাতে নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ, এমনকি বিচার বিভাগের ক্ষমতাও নানা কায়দায় কেন্দ্রীভূত করা যায়।
নাহিদ বলেন, “স্বৈরতন্ত্রের বীজ কিন্তু সেই ’৭২-এর সংবিধান থেকে বাংলাদেশে শুরু হয়েছিল।”
তার ভাষায়, ১৯৭১ সালের আদর্শ ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। কিন্তু ১৯৭২ সালের সংবিধানে এসে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের চার মূলনীতি বসানো হয়।
তিনি বলেন, “এটার বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ করেছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান।”
নাহিদ ইসলামের ভাষায়, ১৯৭২ সালের সংবিধানের বিরোধিতা শুধু জামায়াতে ইসলামী করেনি; বদরুদ্দীন উমর, মাওলানা ভাসানী, কমরেড মুজাফফর আহমদ এবং ‘শত শত মুক্তিযোদ্ধা’ও এর বিরোধিতা করেছেন।
তিনি এও বলেন, ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর নতুন গণপরিষদের মাধ্যমে নতুন সংবিধান করার একটি সুযোগ এসেছিল, কিন্তু সেটি নেওয়া হয়নি।
জিয়াউর রহমানের প্রতি ‘সম্মান রেখেই’ তিনি একে একটি ‘ঐতিহাসিক ভুল’ বলে মন্তব্য করেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর তারা নতুন সংবিধান বা সংবিধান পুনর্লিখনের দাবি তুলেছিলেন জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপি সে পথে যায়নি; তারা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার কথা বলেছিল। পরে মধ্যপন্থায় এসে সংস্কারের আলোচনা শুরু হয়। এখন বিএনপি যদি সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদের প্রশ্নে সরে যায়, তাহলে তাদেরও আবার আগের দাবিতে ফিরে যেতে হবে।
তিনি বলেন, “আমরা নতুন সংবিধান চাই, অথবা সংবিধান পুনর্লিখন চাই।”
জুলাই জাতীয় সনদ নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, যেদিন জাতীয় জুলাই সনদে স্বাক্ষর হয়, সেদিন তাদের দল অনুষ্ঠানে যায়নি। পরে তারা নিজেদের মতামত জমা দিয়েছে।
তার অভিযোগ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ‘অনেক কষ্টের ফসল’ এই সনদকে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে কলুষিত করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবগুলোর পাশে এমন নোট বসানো হয়েছে, যাতে নির্বাচনে জিতে যে দল আসবে, তারা নিজেদের ইশতেহার অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এতে ঐকমত্যের জায়গাই নষ্ট হয়েছে।
নাহিদ বলেন, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষাকে ধার করে আমি বলতে চাই, জুলাই জাতীয় সনদকে এক অন্তহীন প্রতারণার দলিলে পরিণত করেছে বিএনপি।”
তিনি বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধানকে যেমন আওয়ামী লীগ দলীয় ইশতেহারে পরিণত করেছিল, তেমনই জুলাই জাতীয় সনদকে বিএনপি কলুষিত করেছে।
গণভোটের প্রশ্নেও সরকারকে চাপে ফেলেন নাহিদ ইসলাম। তার বক্তব্য, গণভোটের আদেশ নিয়ে সমালোচনা থাকলেও সব পক্ষ অংশ নিয়েছিল এবং বিএনপিও এর পক্ষে প্রচার করেছিল। এখন সেই গণরায় অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, “যেই গণভোট অনুসারে যে সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদ, অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদ গঠন করা উচিত।”
নাহিদ ইসলাম বলেন, নতুন সংবিধানের দাবি থেকে সরে এসেও এখন অন্তত উচ্চকক্ষ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নির্দলীয় ও গ্রহণযোগ্য নিয়োগ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো প্রশ্নে সমাধান হওয়া দরকার।
বিচার বিভাগ নিয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া বহু বিচারক এখনো রয়েছেন। তবে তাদের সরালেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত না করলে সমাধান হবে না।
গুম ও মানবাধিকার-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিলের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সরকার যদি বলে ভালো আইন আনা হবে, তাহলে তা দ্রুত আনতে হবে। না আনা পর্যন্ত সমালোচনা সহ্য করতে হবে।
মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্পর্ক নিয়েও বিস্তারিত কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধকে তারা শ্রদ্ধা করেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেই মুক্তিযুদ্ধেরই ‘নবায়ন’ এবং ‘ধারাবাহিকতা’।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ফাউন্ডেশন। এ ব্যাপারে আমরা আনকমপ্রোমাইজিং।”
তিনি বলেন, তারা কেউ বলেননি, জুলাই গণঅভ্যুত্থান মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে বড়। আবার এটি ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে ছোট-বড় মাপারও কিছু নেই। বাংলাদেশের ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ যেমন একটি বিশেষ ঘটনা, জুলাইও তেমন একটি বিশেষ ঘটনা।
জামুকা আইন সংশোধন করে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা থেকে মুজিব বাহিনীকে বাদ দেওয়ার প্রসঙ্গও তোলেন নাহিদ ইসলাম।
তার দাবি, মুজিব বাহিনীর সদস্যদের যুক্ত করে অতীতে বহু ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে মুক্তিযোদ্ধার সনদ দেওয়া হয়েছিল। তারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে দেশের ভেতরে আওয়ামী লীগ বাদে অন্য পক্ষের লোকদের হত্যা করেছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমান আইনে মুজিব বাহিনী আর মুক্তিযোদ্ধা নয়। কিন্তু এখনো কেউ কেউ নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। এ জায়গায় স্পষ্টতা আনা দরকার।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিএনপির ভূমিকা নিয়ে চলা বিতর্ক নিয়েও কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, বিএনপি অবশ্যই জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছিল, অন্য বিরোধী দলও ছিল। কিন্তু এটি কোনো দলীয় আন্দোলন ছিল না।
এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, “এই গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা সামনে নয়, পিছনে ছিল। সামনে সাধারণ জনগণ ছিল, ছাত্ররা ছিল।”
নাহিদের মতে, এখন যদি বলা হয় কোনো নির্দিষ্ট দলের নেতৃত্বে এ গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, তাহলে তা শহীদদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হবে।
একইসঙ্গে তিনি বলেন, আন্দোলনের সময় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, এটি ছাত্রদের আন্দোলন, তাদের আন্দোলন নয়। নাহিদের মতে, সে সময় কৌশলগতভাবে এ বক্তব্যই সঠিক ছিল।
বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ বলেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাকে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের সময় চাপ দিয়েছিল এই আন্দোলনকে বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলন বলতে। কিন্তু তারা কখনও তা বলেননি। যদিও ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ভূমিকা তারা অস্বীকারও করেননি।
পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ভিত্তি কী, সেই প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, সরকার আসার পর থেকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সেই সম্পর্ক কোন ভিত্তিতে গড়ে উঠবে, তা স্পষ্ট নয়।
নাহিদের ভাষ্য, ১৯৭১ সালের পর থেকে ভারত বাংলাদেশকে ‘করদ রাজ্যে’ পরিণত করতে চেয়েছে; সীমান্ত হত্যা বন্ধ হয়নি, পানির ন্যায্য হিস্যা মেলেনি, উল্টো বাংলাদেশি বলে মানুষকে বাংলাদেশে পুশ-ইন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “ভারতের সাথে সম্পর্ক আমরা উন্নয়ন করতে চাই। ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ। কিন্তু মর্যাদার ভিত্তিতে, সাম্যের ভিত্তিতে সম্পর্ক হতে হবে।”
তার ভাষায়, ভারতের সঙ্গে বর্তমান সরকারের সম্পর্কের ভিত্তি কী এবং সীমান্ত হত্যা, পুশ-ইন, শেখ হাসিনাসহ অভিযুক্তদের আশ্রয় দেওয়া এসব বিষয়ে সরকার কথা বলেছে কি না, তা জনগণ জানতে চায়।
দুর্নীতি ও ঋণখেলাপি সংসদ সদস্যদের প্রসঙ্গেও সরব হন নাহিদ ইসলাম। কয়েকজন সংসদ সদস্যের ঋণের পরিমাণ ১৭০০ কোটি, ৭৬৫ কোটি, ৬৭৯ কোটি, ৬২১ কোটি, ২০১ কোটি, ১৮২ কোটি ও ৯৭ কোটি টাকার অঙ্ক উল্লেখ করেন। তবে নাম বলেননি। পরের সেশনে নাম বলবেন বলেও ঘোষণা দেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সমালোচনা করেন নাহিদ। তার দাবি, দুই মাসে বিএনপির হাতে ৩১ জন খুন হয়েছে, ১৪টি ধর্ষণ, ৮৩টি চাঁদাবাজি ও ১৫৪টি হামলার খবর এসেছে। কিন্তু সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সদস্যদের শাহবাগ থানার সামনে মারধর এবং মামলা না নেওয়ার অভিযোগও তোলেন তিনি। তার ভাষায়, থানার ভেতরে ঢুকে ওসির কক্ষে ডাকসুর দুই নির্বাচিত প্রতিনিধির ওপরও হামলা হয়েছে।
মাজারে হামলা নিয়েও উদ্বেগ জানান নাহিদ ইসলাম। কুষ্টিয়ায় মাজারে হামলা করে একজনকে হত্যার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ধর্মীয় বিতর্কে তারা ঢুকবেন না, তবে আইনের শাসনের প্রশ্নে এসব ঘটনা গ্রহণযোগ্য নয়।
জঙ্গি তৎপরতা প্রসঙ্গে নাহিদ বলেন, সরকারকে এ বিষয়ে সমন্বিত বক্তব্য দিতে হবে। কারণ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক কথা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা আরেক কথা বলছেন।
কৃষকদের ধান কেনার দামের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সরকার কৃষি কার্ড দিয়েছে, যা প্রশংসনীয়। কিন্তু গত বছরের দামে এবারও কৃষকের ধান কেনা হলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে কৃষক লোকসানে পড়বেন।
জুলাই গণহত্যার বিচার নিয়েও তিনি আইনমন্ত্রীর কাছ থেকে সংসদে নিয়মিত ব্রিফিং চান। একই সঙ্গে শহীদ পরিবার ও আহতদের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রাখা এবং আরও বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
চাকরি ও কর্মসংস্থান নিয়ে তিনি বলেন, আন্দোলনের শুরুই হয়েছিল চাকরির দাবিতে। তাই আর্থিক খাতের দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে, বিনিয়োগ আনতে হবে এবং সরকারি চাকরিতে স্বজনপ্রীতি-দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে।
বিরোধী দল কীভাবে কথা বলবে, তা সরকার শিখিয়ে দিতে পারে না মন্তব্য করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিরোধী দল সরকারের ‘প্রেসক্রিপশন’ অনুযায়ী কথা বলবে না; জনগণই ঠিক করবে বিরোধী দলকে কতটা সমর্থন দেবে।
নিজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে নাহিদ বলেন, খালেদা জিয়া গ্রেপ্তারের পরদিন তার বাবাও রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। মায়ের সঙ্গে তিনি থানা, আদালত ও কারাগারে ঘুরেছেন। সেই অভিজ্ঞতাই তাকে রাজনীতিতে দায়বদ্ধ করেছে বলে ভাষ্য তার।
নিজের নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১১ এর কথা তুলে নাহিদ বলেন, সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যেমন বৈষম্য, তেমনই ঢাকা-১৭ ও ঢাকা-১১ এর মধ্যেও তেমন বৈষম্য আছে। তবে সমালোচনার কারণে তার এলাকার উন্নয়ন যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সে অনুরোধও জানান তিনি।
দীর্ঘ বক্তব্যের একেবারে শেষে নাহিদ ইসলাম বলেন, সংসদের প্রথম অধিবেশন দেখে তিনি ‘অনেক হতাশ’ হয়েছেন। তার অভিযোগ, সরকারি দলের সদস্যরা অতিরিক্ত স্তূতি করেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদকে বাতিল করা হয়েছে, গণভোটকে অস্বীকার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমি আশা করব, আমাদের এই হতাশা অতি দ্রুতই শেষ হবে এবং আমরা যেই কমিটমেন্ট জনগণের কাছে করেছি, সেই সকল প্রতিশ্রুতি আমরা রক্ষা করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারব।”