Published : 04 Jun 2026, 02:40 PM
ঢাকার পল্লবীতে আট বছর বয়সি রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলার রায় জানা যাবে আগামী ৭ জুন।
বৃহস্পতিবার রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ঢাকা মহানগরের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন রায়ের এই দিন ঠিক করে দেন।
যুক্তিতর্ক শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এ মামলার আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ‘প্রমাণিত হয়েছে’ দাবি করে তাদের সর্বোচ্চ সাজার আর্জি জানিয়েছে।
অন্যদিকে আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী তাদের ‘লঘুদণ্ড’ প্রার্থনা করেছেন।
স্বপ্নাকে সকাল ৮টার দিকে কাশিমপুর কারাগার থেকে এবং সোহেলকে ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়।
বেলা সাড়ে ১১টায় যুক্তিতর্ক শুনানি শুরুর কথা থাকলেও স্বপ্না অসুস্থ হয়ে পড়ায় শুনানি শুরু হতে কিছুটা বিলম্ব হয়। সেখানে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
বেলা সাড়ে ১১টার পর আসামিদের এজলাসে তোলা হয়। পৌনে ১২টার দিকে শুরু হয় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন।
রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রতাশা করেন তিনি।
সাক্ষীদের জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে তিনি আদালতকে বলেন, "আসামি সোহেল রানা শিশু রামিসাকে বাথরুমে নিয়ে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করেন। পরে গ্রিল কেটে তিনি পালিয়ে যান। এসব কাজে আসামি স্বপ্না আক্তার সহযোগিতা করেছে।
“বিচারে ১৬ সাক্ষীর জবানবন্দি ও জেরার তাদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। তাদের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড প্রার্থনা করছি।"
অন্যদিকে আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমূল্যাহ দুই আসামির পক্ষে যুক্তিতর্কে অংশ নেন।
তিনি বলেন, "জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। যে ছুরি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে সেটার ফরেনসিক পরীক্ষা হয়নি। এর ওপর ভিত্তি করে সাজা দেওয়া যেতে পারে না।
“আসামি সোহেল রানা নিজেকে জড়িয়ে জবানবন্দি দিয়েছেন। ঘটনার সময় তিনি নেশাগ্রস্ত ছিলেন৷ এ বিষয়টি বিবেচনা নিয়ে তার যাবজ্জীবন সাজা প্রার্থনা করছি।"
এ আইনজীবী বলেন, "স্বপ্না আক্তারের বিষয়ে ১৬ জন সাক্ষীর দেওয়া সাক্ষ্যে লাশ গুমের অভিযোগ ছাড়া কিছুই নেই। তাকে দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় সাজা দেওয়া হোক।"
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন।
বুধবার আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানিতে আসামি স্বপ্না নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার চান। আর সোহেল ক্ষমা চেয়ে বিচারককে বলেন,"স্যার,আমি নির্দোষ। খালাস চাই। আমাকে মাফ করে দেন। আমার সাথে ডলার ছিল, সেটা কেউ দেখে নাই। তাকে ধরেন স্যার। সেও তো দোষী।"
সোহেলের দাবি, তিনি রামিসাকে কেবল ‘দুই টুকরো’ করেছেন। আর মেয়েটিকে ধর্ষণ ও হত্যা করেছে ডলার নামের ওই ব্যক্তি। মেয়েটিকে এনে দেওয়ার জন্য দুই লাখ টাকাও দিয়েছিলেন ডলার।
গেল ১৯ মে দুপুরে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে শিশু রামিসার লাশ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ বলেছে, ওইদিন সকালে পাশের ফ্লাটের বাসিন্দা ৩২ বছরের সোহেল শিশুটিকে গলা কেটে হত্যার পর মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এরপর ফ্ল্যাটের সাবলেট এই ভাড়াটে গ্রিল কেটে পালিয়ে যান। তবে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ঘরেই ছিলেন।
পুলিশ বাসা থেকে স্বপ্নাকে আটক করে। পরে সন্ধ্যায় সোহেলকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। সোহেল রানা আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন।
এ ঘটনায় রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা দুইজনকে আসামি করে সেদিনই পল্লবী থানায় মামলা করেন।
মামলায় বলা হয়, পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে পরিবারের সঙ্গে থাকত রামিসা। সে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। সোহেল ও স্বপ্না ওই বাসার অন্য ফ্ল্যাটে সাবলেট থাকতেন। ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে রামিসা বাসা থেকে বের হলে আসামিরা কৌশলে তাকে ভবনের তৃতীয় তলায় তাদের রুমে নিয়ে যায়।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে আসামিদের রুমের সামনে মেয়েটির স্যান্ডেল দেখতে পায় তার মা। এরপর ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে রামিসার মা ফ্ল্যাটের অন্যদের নিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন। এ সময় সোহেল ও স্বপ্নার রুমে রামিসার মাথাবিহীন দেহ এবং বাথরুমের বালতির মধ্যে মাথা দেখতে পায়। স্বপ্না সেখানে দাঁড়ানো ছিলেন।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে স্বপ্না বলেন, রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণ করে মেরে ফেলেন সোহেল। লাশ গুম করার জন্য মাথা ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা করেন এবং দুই হাত কাঁধ থেকে অর্ধ বিচ্ছিন্ন করে মৃতদেহ বাথরুম থেকে এনে শোবার ঘরের খাটের নিচে রেখে দেন। কাটা মাথা বাথরুমের বালতির মধ্যে রেখে জানালার গ্রিল কেটে সোহেল পালিয়ে যান।
পাঁচ দিন তদন্ত করে গত ২৪ মে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান। সেখানে সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্নাকেই আসামি করা হয়।
রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ওই নৃশংস ঘটনার পর দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়। বিভিন্ন সংগঠন ও নানা শ্রেণি পেশার মানুষ সমাবেশ মানববন্ধনের মত কর্মসূচি পালন করেন। তার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচারের দাবি জানান।
আলোচিত এ মামলার বিচার দ্রুত শেষ করতে অভিযোগপত্র জমার দিনই মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত করে শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। ঈদের ছুটির পর আদালত খুললে সোমবার আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন বিচারক।
এরপর একদিনেই এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরার পর্ব শেষ হয়। রাষ্ট্রপক্ষে ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্য শোনে আদালত।
সাক্ষীরা হলেন- রামিসার বাবা ও মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লা, মা পারভীন আক্তার, বড় বোন রাইসা আক্তার, ফুপু মাহমুদা আক্তার, চাচা মিজানুর রহমান লিটন, চতুর্থ তলার বাসিন্দা মনির হোসেন, প্রতিবেশী জাকিরুল ইসলাম রাজু, দ্বিতীয় তলার বাসিন্দা শেখ আবু সামা, ফুপা মনিরুজ্জামান শাহীন, কনস্টেবল রোমা আক্তার, কনস্টেবল শরীফ মিয়া, এসআই ইকবাল হোসেন, চিকিৎসক নাসাদ জাবিন, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ, এসআই রাশেদুল ইসলাম ও তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. অহিদুজ্জামান।
বুধবার আত্মপক্ষ সমর্থন এবং বৃহস্পতিবার যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে মামলাটি রায়ের পর্যায়ে এল। সব ঠিক থাকলে হত্যাকাণ্ডের ১৯ দিনের মাথায় এ মামলার রায় ঘোষণা করবে আদালত।