ভারত সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র বন্ধ চান হাছান, তুললেন বিজিবি সদস্য হত্যার কথা

চীনকে বাংলাদেশ সামরিক ঘাঁটি করার সুযোগ দেওয়ার গুঞ্জনের বিষয়ে এক প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এটা বানোয়াট, বোগাস।”

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 8 Feb 2024, 06:29 PM
Updated : 8 Feb 2024, 06:29 PM

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে আলোচনায় সীমান্তে বিজিবি সদস্যকে হত্যা, তিস্তার পানি বণ্টনসহ অমীমাংসিত নানা বিষয় তুলে ধরেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ। বলেছেন, ‘ভারতের জাতীয় নির্বাচনের পর এর একটা সমাধান পাওয়া উচিত।’

বৃহস্পতিবার দিল্লিতে এক মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকদের প্রশ্নে এই বিষয়গুলো উঠে আসে।

মঙ্গলবার মধ্যরাতে ঢাকা থেকে দিল্লি পৌঁছেন হাছান। ৭ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর এটিই বাংলাদেশ সরকারের কোনো প্রতিনিধির ভারত সফর।

সফরের প্রথমদিন বুধবার সকালে দিল্লির সরদার প্যাটেল ভবনে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোবালের সঙ্গে বৈঠক করেন হাছান। এরপর সন্ধ্যায় দিল্লির হায়দ্রাবাদ হাউজে জয়শংকরের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন তিনি।

বৃহস্পতি সন্ধ্যায় দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ায় তার মতবিনিময়ের বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশ-ভারতের বর্তমান সম্পর্ক’। সেখানে সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের মুখে পড়েন। সেখানে একটি ছিল যশোর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বিজিবি সদস্যের প্রাণহানি নিয়ে।

গত ২২ জানুয়ারি যশোরের বেনাপোল সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে প্রাণ হারান বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষা বাহিনী বিজিবির এক সদস্য।

পর দিন বিজিবির এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ভোর আনুমানিক সাড়ে ৫টার দিকে বিজিবি যশোর ব্যাটালিয়নের ধান্যখোলা বিওপি'র জেলেপাড়া পোস্ট সংলগ্ন এলাকায় ভারত থেকে আসা একদল গরু চোরাকারবারিদের সীমান্ত অতিক্রম করে আসতে দেখে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষা বাহিনীর টহল দল তাদের ‘চ্যালেঞ্জ’ করে। চোরাকারবারিরা তখন দৌড়ে ভারতের দিকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।

“এ সময় বিজিবি টহল দলের সদস্য সিপাহি মোহাম্মদ রইশুদ্দীন চোরাকারবারিদের পিছনে ধাওয়া করতে করতে ঘন কুয়াশার কারণে দলবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন । প্রাথমিকভাবে তাকে খুঁজে পাওয়া না গেলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যায়, সে বিএসএফের গুলিতে আহত হয়ে ভারতের অভ্যন্তরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

“ঘটনার পরপরই এ বিষয়ে ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক করা হয় এবং জানা যায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় উক্ত সৈনিক মৃত্যুবরণ করেছে।”

এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানানোর পাশাপাশি প্রতিবাদলিপি পাঠানোর কথা বলা হয় সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে।

বিজিবি সদস্যের প্রাণহানির উদাহরণ টেনে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে জয়শঙ্করের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে হাছান মাহমুদের কাছে জানতে চান এক সাংবাদিক।

জবাবে তিনি বলেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে তিনি আলোচনা করেছেন। প্রাণঘাতী অস্ত্র যাতে সীমান্তে ব্যবহার না হয়, বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

প্রাণহানির ওই ঘটনার তদন্ত চলছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

জয়শঙ্করের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে আরেক প্রশ্নে হাছান বলেন, “ভারত-বাংলাদেশের অনেক ইস্যু রয়েছে। আমাদের সীমান্ত সমস্যা, মিয়ানমার পরিস্থিতি আমরা উভয়ে মোকাবেলা করছি। আমরা বাংলাদেশে ১২ লাখ মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিচ্ছি।

‘তিস্তায় সমাধান পাওয়া উচিত’

তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে জয়শঙ্করের সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গে এক প্রশ্নে হাছান বলেন, তার বিশ্বাস, ভারতের নির্বাচনের দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা এই চুক্তির একটা মীমাংসা হবে।

তিনি বলেন, “আমরা তিস্তা নিয়ে আলোচনা করেছি। কেন্দ্রীয় সরকারের এ বিষয়ে কোনো আপত্তি নাই। তবে আপত্তি এসেছিল রাজ্য সরকার থেকে। আপনাদের নির্বাচন হচ্ছে। আগামী মাসে নির্বাচনি প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং নির্বাচন হবে এপ্রিল ও মে মাসে। সুতরাং নির্বাচনের পরে।

“আমি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর (এস জয়শঙ্কর) সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছি এবং বিষয় নির্বাচনের নেওয়া উচিত। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের একটা সমাধান পাওয়া উচিত।”

‘বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব কমছে’

বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাবের বিষয়ে এক প্রশ্নে ক্ষমতাসীন দলের এই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলেন, “দেখুন বাংলাদেশে আমাদের দলকে ভারতপন্থি হিসাবে দোষ দেওয়া হয়। কিন্তু এই ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল অতীতে যেমন কাজ করত, এখন তেমন করে না।

“বাংলাদেশে বিভিন্ন গোষ্ঠী রয়েছে, ভারতবিরোধী উপাদান রয়েছে। আমরা বাংলাদেশপন্থি দল, আমরা অন্য কোনো পন্থি নই।”

মন্ত্রী বলেন, “সময়ে সময়ে, বিশেষ করে নির্বাচনের সময় ভারতবিরোধী মনোভাবকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে কিছু মানুষ। তবে এটা ক্রমান্বয়ে কমছে। জনগণের বড় অংশ বুঝে যে, আমাদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক থাকা উচিত। বাংলাদেশের অগ্রগতি ও প্রতিবেশী এলাকার অগ্রগতির জন্য আমাদের ভালো সম্পর্ক থাকা উচিত।”

বাংলাদেশে ভারতীয় পণ্য বর্জনের আহ্বানের উদাহরণ টেনে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “দেখুন, বাংলাদেশ স্বাধীন সমাজ, বহুত্ববাদী দেশ এবং গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে। যে কেউ তার মতামত প্রকাশ করতে পারে।

“সুতরাং ভারতবিরোধী, চীনবিরোধী, যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী, ইউরোপবিরোধী বা পাকিস্তানবিরোধী এমন বিভিন্ন স্লোগান বা পোস্টার রয়েছে। তবে এসব বিষয়, ভারতবিরোধী স্লোগান আগে যেমন কাজ করত, এখন তেমন কাজ করে না।”

ভারত থেকে বছরে বাংলাদেশের ১৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি এবং বাংলাদেশ থেকে দুই বিলিয়ন ডলার রপ্তানির উদাহরণও টানেন হাছান।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ‘তুলনাহীন’

ভারতীয় আরেক সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে হাছান মাহমুদ বলেন, “অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্কের সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক তুলনীয় নয়। চীন আমাদের নিকট প্রতিবেশী না হলেও প্রতিবেশী দেশ; তারা আমাদের উন্নয়ন সহযোগী- এটাই।”

চীনের দিকে বেশি ঝুঁকে না গিয়ে ভারত ও পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা হবে- সেখানে মন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন রাখেন সেই সাংবাদিক।

জবাবে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের ভূমিকার কথা তুলে ধরে হাছান বলেন, “অন্য কোনো সম্পর্কের সঙ্গে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের সঙ্গে অন্য কোনো সম্পর্ক তুলনীয় নয়। কেননা, আমাদের সম্পর্কে রক্তের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত।

“আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের জনগণ ও ভারতের সৈনিকরা আত্মত্যাগ করেছে। ভারত আমাদের এক কোটি মানুষকে আশ্রয় দিয়েছিল। তখন ভারত তার সীমানা খুলে দিয়েছিল এবং খুলে দিয়েছিল তাদের হৃদয়।”

চীনকে বাংলাদেশ সামরিক ঘাঁটি করার সুযোগ দেওয়ার গুঞ্জনের বিষয়ে এক প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এটা বানোয়াট, বোগাস।”

‘ভারত সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ’

মতবিনিময়ের শুরুতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভারতের মত বাংলাদেশেও উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হয়। কিন্তু, বরাবরই বিএনপি ও জামায়াত একে বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত থাকে। তারা জনগণকে ভোটদানে নিরুৎসাহিত করে।

“কিন্তু, বাংলাদেশের জনগণ সেসব অপচেষ্টা রুখে দেয়। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ।”

কয়েক দশকে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে জানিয়ে তিনি বলেন, “একে আরও এগিয়ে নিতে দুই দেশ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে।”

দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে ভারতের অবস্থানের জন্য ধন্যবাদ দিয়ে তিনি বলেন, “গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশে আমাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমরা ভারতের জনগণ, নাগরিক সমাজ এবং সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ। গণতন্ত্রকে বাধাগ্রস্ত করার ক্ষেত্রে একটি গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রকে রুখে দিতে ভারত আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল।”

ক্লাবের প্রেসিডেন্ট এস ভেঙ্কট নারায়ণ এবং সেক্রেটারি প্রকাশ নন্দের পরিচালনায় মতবিনিময়ে ক্লাবের পরিচালনা পর্ষদের পাশাপাশি দিল্লিভিত্তিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

শুক্রবার বিবেকানন্দ ফাউন্ডেশনে বক্তৃতাদান এবং একাধিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কথা রয়েছে হাছান মাহমুদের।