Published : 25 Jun 2026, 02:50 PM
দেশে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর প্রাদুর্ভাব বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
তিনি বলেছেন, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা এএমআর ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর প্রাদুর্ভাব একটি ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার সকালে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে মন্ত্রীর লিখিত বক্তব্যে এ তথ্য জানানো হয়। প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপিত হয়।
ফেনী-২ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নাল আবদিন জানতে চেয়েছিলেন, দেশে ভয়াবহ হারে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু বেড়েছে কি না এবং তা সত্য হলে জীবাণু শনাক্তকরণ কিট তৈরির কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না।
জবাবে মন্ত্রী বলেন, অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ও অতিরিক্ত ব্যবহার, সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং মানব ও প্রাণী খাতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে এ সমস্যা বাড়ছে। এর ফলে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে এবং চিকিৎসা কার্যক্রম আরও জটিল হয়ে উঠছে।
জীবাণু শনাক্তকরণ কিট তৈরির উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলেও মন্ত্রীর জবাবে দেশে কিট উৎপাদন বা তৈরির কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, সময়সীমা বা প্রকল্পের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সরকার জীবাণু শনাক্তকরণ এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স নির্ণয়ের সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
এর মধ্যে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বা ন্যাশনাল অ্যাকশন প্লান অন এএমআর বাস্তবায়ন এবং ওয়ান হেলথ পদ্ধতির মাধ্যমে মানব, প্রাণী ও পরিবেশ খাতে সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলেন তিনি।
জাতীয় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সারভেইল্যান্স বা নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা ও সম্প্রসারণের কথাও মন্ত্রীর জবাবে এসেছে।
দেশের বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে আধুনিক মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবরেটরি স্থাপন ও উন্নয়নের কথাও জানানো হয়।
এসব ল্যাবে জীবাণু শনাক্তকরণ এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল সংবেদনশীলতা পরীক্ষা, অর্থাৎ কালচার অ্যান্ড সেনসিটিভিটি টেস্ট পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী।
পরীক্ষাগারে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট সরবরাহ এবং ল্যাবরেটরি জনবলের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের কথাও বলা হয়েছে।
মন্ত্রীর জবাবে বলা হয়, সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ, অর্থাৎ ইনফেকশন প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টুয়ার্ডশিপ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের প্রবণতা, ঝুঁকির কারণ এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিরূপণে সরকার বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার রোধে জনসচেতনতা তৈরির কার্যক্রম চলমান আছে বলে জবাবে বলা হয়। তবে দেশে কোন কোন জীবাণু সবচেয়ে বেশি প্রতিরোধী হয়ে উঠছে, কত শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হচ্ছে বা এএমআর মোকাবেলায় চলতি অর্থবছরে কত বরাদ্দ রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে জবাবে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
হাসপাতালে দালাল চক্র রোধে ‘জিরো টলারেন্স’
চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সংসদ সদস্য জসীম উদ্দীন আহমেদ দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে দালাল চক্র নির্মূলে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে কি না জানতে চান।
এ ছাড়া সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মোসা. নাজমুন নাহার স্বাস্থ্য খাতের সরকারি হাসপাতালগুলোর দুর্নীতি ও দালাল চক্র নির্মূলে সরকারের পরিকল্পনা জানতে চান।
জবাবে মন্ত্রী বলেন, একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতকে সম্পূর্ণ জনবান্ধব, স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করতে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে বলেও জানান তিনি।
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে দালালমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নেতৃত্বে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট কার্যক্রম চালু রয়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে এসব অভিযানে কতজন দালাল আটক হয়েছে, কতটি মামলা হয়েছে, কতজনের সাজা হয়েছে বা কোন হাসপাতালে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে জবাবে কোনো পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি।
দালাল চক্র ও দুর্নীতি রোধে স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি স্তরে ডিজিটালাইজেশন জোরদারের কথা বলেছে মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রীর জবাবে বলা হয়, স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করতে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের হস্তক্ষেপ কমাতে ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয়ভাবে ওষুধ সরবরাহ শৃঙ্খল পর্যবেক্ষণের জন্য সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম আধুনিকায়ন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে টেলিমেডিসিন সেবার পরিধি বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে রোগীদের হয়রানি কমেছে এবং সরাসরি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া সহজ হয়েছে বলে মন্ত্রীর জবাবে বলা হয়।
হাসপাতালে সেবা নেওয়া রোগীদের মতামত সংগ্রহ এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের জন্য তদারকি কমিটি গঠনের কথাও জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রীর জবাবে বলা হয়, সেবার মানে কোনো ব্যত্যয় বা অনিয়ম দেখা গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
অতি মুনাফালোভী চক্র নিয়ন্ত্রণে রাখতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্যের ওপর সরকারের নজরদারি রয়েছে এবং জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় নীতিমালা সংশোধন করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
পর্যায়ক্রমে প্রতিটি নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্য কার্ড বা স্বাস্থ্য ডাটাবেজ তৈরির কাজ চলছে বলে জবাবে বলা হয়।
তবে সরকারি হাসপাতালের দুর্নীতি ও দালাল চক্র নির্মূলে আলাদা কোনো সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা বা অগ্রগতি মূল্যায়নের তথ্য মন্ত্রীর জবাবে উল্লেখ করা হয়নি।
পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদ শূন্য, আউটসোর্সিং ‘করা হবে’
কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালাম জানতে চেয়েছিলেন, আইসিডিডিআরবির এক গবেষণায় ঢাকার সরকারি হাসপাতালগুলোর ৩২ শতাংশ টয়লেট ব্যবহার অযোগ্য ও অপরিচ্ছন্ন বলে যে তথ্য এসেছে, তা সত্য কি না এবং জনস্বার্থে সরকার এ বিষয়গুলো মনিটরিং করবে কি না।
জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরাসরি আইসিডিডিআরবির গবেষণার তথ্য সত্য কি না, তা বলেননি। তবে ঢাকার সরকারি হাসপাতালগুলোর টয়লেট পরিচ্ছন্ন রাখা কঠিন হওয়ার কারণ হিসেবে অতিরিক্ত রোগীর চাপ ও জনবল সংকটের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “ঢাকার সরকারি হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংখ্যার চেয়ে ৪-৫ গুণ বেশি রোগী ভর্তি হয়ে থাকে। এত বিপুল জনসংখ্যার জন্য সরকারি হাসপাতালের টয়লেটগুলো সার্বক্ষণিক পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা একটি চ্যালেঞ্জের বিষয়।”
দীর্ঘদিন নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ থাকায় হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির অধিকাংশ পদ শূন্য রয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।
টয়লেটগুলো যাতে সার্বক্ষণিক ব্যবহার উপযোগী থাকে, সেজন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা সুইপার আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সরবরাহের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জবাবে বলা হয়।
তবে কতটি হাসপাতালে কত পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদ শূন্য, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কতজন নেওয়া হয়েছে, কিংবা টয়লেট মনিটরিংয়ের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা আছে কি না, সে বিষয়ে জবাবে কোনো পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি।
চারটি এমআরআই কেনার কার্যক্রম চলছে
জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল জানতে চেয়েছিলেন, সরকারি হাসপাতালে এমআরআই, সিটি স্ক্যান, ডায়ালাইসিস ও আইসিইউ সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে রোগীরা বেশি খরচে বেসরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভর করছেন; এ প্রেক্ষাপটে জেলা পর্যায়ে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সম্প্রসারণে মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা কী।
জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এমআরআই, সিটি স্ক্যান, ডায়ালাইসিস ও আইসিইউর ভারী যন্ত্রপাতি ক্রয় প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ভারী যন্ত্রপাতি ক্রয় প্রক্রিয়া পুনরায় চালু করেছে এবং চারটি এমআরআই মেশিন ক্রয় কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
তবে জেলা পর্যায়ে কতটি হাসপাতালে এমআরআই, সিটি স্ক্যান, ডায়ালাইসিস বা আইসিইউ সুবিধা নেই, নতুন যন্ত্রপাতি কোথায় বসানো হবে, কিংবা কবে নাগাদ রোগীরা সেবা পাবেন, সে বিষয়ে জবাবে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি।
‘দ্রুতই এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ’
সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মাহফুজা হান্নানের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, শূন্য পদে জনবল নিয়োগ একটি চলমান প্রক্রিয়া। এর অংশ হিসেবে ২৭তম বিসিএস থেকে একজন সহকারী সার্জন পদায়ন করা হয়েছে।
তিনি জানান, ৪৫তম বিসিএসে ৪৫০ জন, ৪৬তম বিসিএসে ১ হাজার ৬৮২ জন, ৪৭তম বিসিএসে ১ হাজার ৩৩১ জন এবং ৫০তম বিসিএসে ৬৫০ জন সহকারী সার্জন নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
সিনিয়র স্টাফ নার্সের শূন্য পদ পূরণে সরকারি কর্ম কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগ কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলেও জবাবে বলা হয়।
মিডওয়াইফ পদ পূরণের বিষয়ে মন্ত্রী জানান, ২০২৬ সালের ১৯ এপ্রিল সরকারি কর্ম কমিশন সচিবালয়ে মিডওয়াইফ, দশম গ্রেড, পদে নিয়োগ পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পুলিশ প্রতিবেদন পাওয়ার পর তাদের পদায়নের কার্যক্রম নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে দ্রুত এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে।