Published : 14 Oct 2025, 09:34 PM
রাজধানীর মিরপুরে রূপনগর আবাসিক এলাকার ঠিক পাশে আড়াই কাঠার শিল্প প্লটে রাসায়নিকের গুদামটির অবস্থান। এর ঠিক সামনেই পোশাক কারখানা। আশপাশে আরও রয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিৎসা সেবাকেন্দ্রসহ আরও বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানা।
মঙ্গলবার দুপুরে রাসায়নিকের গুদামে আগুন লাগার পর চারদিকে বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়তে থাকে। দ্রুত আক্রান্ত হন ঠিক পাশের চারতলা পোশাক কারখানার ভবনটির কর্মীরা।
কারখানা দুটির আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধার কাজের সময় পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, পাশের কারখানার আগুন দ্রুত সরু গলির ওপারের পোশাক কারখানার ভবনের নিচে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে পোশাক কারখানার কর্মীরা নিচে নামতে পারেননি। আবার ছাদের দরজায় তালা থাকায় ধোঁয়া থেকে বাঁচতে ওপরেও যেতে পারেননি।
উদ্ধারকারী কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, এ কারণে কর্মস্থলেই বিষাক্ত ধোঁয়ায় অজ্ঞান হয়ে পড়েন পোশাক কারখানাটির ওপর তলায় থাকা কর্মীরা। পরে সেই ভবনের ওপরের দিকে আগুন আরও ছড়িয়ে পড়লে পুড়ে অঙ্গার হতে হয় তাদের।
মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১৬টি লাশ উদ্ধারের তথ্য দিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। সবগুলো লাশ উদ্ধার হয়েছে পোশাক কারখানা ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা থেকে।
ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে পোশাক কারখানায় তল্লাশি অভিযান শেষের তথ্য দিয়ে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে বলেন, “চারতলা পোশাক কারখানার উপরে ছাদ টিনের। ছাদে যাওয়ার জন্য সেখানে একটি গ্রিলের দরজা রয়েছে। সেটি তালা মারা ছিল। এ কারণে তারা উপরের দিকে যেতে পারেননি।
“আপনারা জানেন যে পরিমাণ কেমিকেল বিস্ফোরণ, সেটার ফ্ল্যাশওভারে টক্সিক গ্যাসের কারণে আকস্মিকভাবে ওনারা অজ্ঞান হয়েছেন। পরে তারা সরতে পারেননি। উপরে যেতে পারেননি, নিচেও যেতে পারেননি।”
রাসায়নিক গুদামের আগুন এখনও নিয়ন্ত্রণে না আসার তথ্য দিয়ে ফায়ার সার্ভিসের ঊর্ধ্বতন এই কর্মকর্তা বলেন, সেখানেও মৃতদেহ থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন তারা।
এদিন বেলা পৌনে ১২টার দিকে রূপনগরের শিয়ালবাড়ি এলাকার ওই রাসায়নিকের গুদাম এবং পাশের পোশাক কারখানায় আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। পর্যায়ক্রমে ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট সেখানে নিয়ে আগুন নেভানোর কাজে যোগ দেয়।
তারা পোশাক কারখানার আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলেও রাসায়নিকের গুদামে সন্ধ্যার পরও আগুন জ্বলছিল। সন্ধ্যা ৭টার পর ঘটনাস্থলে রাসায়নিকের তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। এরমধ্যেই সেখানে আগুন নেভানো ও উদ্ধার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। তাদের সহায়তায় পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাজুল বলেন, পোশাক কারখানা ও রাসায়নিকের গুদামের কোনটিরই অনুমোদন ছিল না। কোনো ধরনের নিরাপত্তা পরিকল্পনা ছিল না।
আগুন লাগা এই পোশাক কারখানা ও রাসায়নিকের গুদাম কোনটারই অনুমোদন ছিল না বলেও জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
তৈরি পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ বলছে, “মিরপুরের শিয়ালবাড়িতে যে কারখানায় আগুন লেগেছে, তা বিজিএমইএ এর সদস্যভুক্ত কোনো পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠান নয়। এটি একটি ওয়াশিং কারখানা।”
এটির নাম শাহ আলী ওয়াশিং লিমিটেড বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তথ্য দিয়েছে সংগঠনটি।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ও কেমিকেল ল্যাব এক্সপার্টরা সেখানে কাজ করছেন বলে এক বার্তায় জানানো হয়েছে।
তবে আগুনের পর নিখোঁজদের বিষয়ে এখনও পুলিশের কাছে কেউ কোনো রিপোর্ট করেনি। নিখোঁজদের বিষয়েও তাদের কাছে এখনও কোনো তথ্য না থাকার কথা বলেছেন রূপনগর থানার ওসি মোরশেদ আলম।
সতর্ক ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা
সপ্তাহ তিনেক আগে (২২ সেপ্টেম্বর) টঙ্গীতে একটি রাসায়নিকের গুদামে আগুন নেভাতে গিয়ে বিস্ফোরণে মারা যান ফায়ার সার্ভিসের তিন সদস্যসহ চারজন। যে কারণে মিরপুরের এ দুর্ঘটনায় আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধার কাজে এবার ফায়ার সার্ভিস শুরু থেকেই সাবধানী ছিল।
আগুন লাগার পর পুরো এলাকায় রাসায়নিকের ঝাঁঝালো ধোঁয়া টের পাওয়া যাচ্ছিল। দুই প্রস্থ মাস্ক পরেও নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, চোখও জ্বলছিল অনেকের। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও ঘটনাস্থলে ভিড় করে ছিলেন অনেক মানুষ। নিখোঁজদের স্বজনদের চাইতে বেশির ভাগই ছিলেন কৌতুহলী মানুষ। তাদের কারণে কাজে বেগ পেতে হচ্ছিল উদ্ধার কর্মীদের। আনসার, পুলিশ, বিজিবি এমনকি সেনা সদস্যরাও তাদের ঘটনাস্থল থেকে দূরে সরাতে পারেননি।
পাশাপাশি ভিড়ের কারণে স্বজনদের খুঁজতে আসা ব্যক্তিরাও ভিড়ের কারণে তথ্য পেতে ঝামেলায় পড়েন। এসব ব্যক্তিদের অনেকের হাতে ছিল নিখোঁজ স্বজনদের ছবি।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক তাজুল ইসলাম বলেন, নিহত ব্যক্তিদের অনেককে চেনা না যাওয়ায় এখনি পরিচয় প্রকাশ করা যাচ্ছে না।
নিহত এসব ব্যক্তির স্বজনরা এখানে ভীড় করছেন বলে ধারণা কর্মকর্তাদের।

ভাইয়ের ছেলে রবিনকে খুঁজতে ছবি হাতে ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে ছিলেন নাসিমা আক্তার। তিনি বলেন, রবিন আর এন ফ্যাশন্স নামে একটি পোশাক কারখানার কাটিং মাস্টার। ঘটনার সময় রবিন পুড়ে যাওয়া ভবনটির তিন তলায় কাজ করছিলেন। আগুন লাগার পর পাঁচতলা থেকে গ্রিল ভেঙে কিছু লোকজন বের হতে পারলেও রবিনরা বের হতে পারেননি।
ছাদের দরজায় তালা দেওয়া ছিল দাবি করে নাসিমা বলছেন, “মালিকের লোক ছাদের কেচি দরজায় তালা দিয়া রাখছিল। যার কারণে ওরা কেউ উপ্রে যাইতে পারেনি। উপ্রে গেলে হয়তো জীবনটা বাঁচত।”
আব্দুস সাত্তার নামের একজন মধ্যবয়সী দোকানকর্মী বলেন, ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন ছুটে ওই ভবনে গিয়েছিলেন উদ্ধারকাজের জন্য। সামনে দিয়ে আগুনের লেলিহান শিখা ছিল। পেছন দিয়ে অনেককে গ্রিল ভেঙে উদ্ধার করা হয়েছে। ভবন থেকে বের হওয়া শ্রমিকেরা বলছিলেন ছাদের দরজায় তালা দেওয়া ছিল।
প্রত্যক্ষদর্শী দাবিদার ইয়াসিন আলিফ নামে একজন বলেন, “কেমিকেল গোডাউনের আগুন লাগার পর একটা ব্লাস্ট হইছে। তখনই গুদামের সামনে যেই বিল্ডিংয়ে গার্মেন্টস ওইটার নিচতলায় আগুন লাইগা যায়। কেমিকেল গোডাউনের টিনের ফাঁক দিয়া আগুন বাহির হইতেছিল যেন কেউ ওয়েল্ডিং টর্চ জ্বালাইছে।”
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, “গোডাউনের সামনে একটি ছোট কাভার্ড ভ্যান ছিল, সেইটাতেও আগুন লাইগা যায়। তখনো কয়েকটা ব্লাস্ট হয়, এরপর গার্মেন্টসের পুরা বিল্ডিংটাতে আগুন লাগে।”
পোশাক কারখানার ভবনটির ছাদে তালা দেওয়া ছিল দাবি করে ইয়াসিন বলেন, “উপ্রে থাইকা যারা নাইমা আসছে অনেকে দম নিতে পারতাছিল না। কেউ কেউ ফুটপাথেই পইড়া যায়। লোকজন মাথায় পানি ঢালছে, চা-জুস খাওয়াইছে। কাউরে ধরাধরি কইরা হাসপাতালে নিছে।”
যা বলছে ফায়ার সার্ভিস
ফায়ার সার্ভিস শুরুতে বলেছিল, আগুনের সূত্রপাত যে রাসায়নিকের গুদাম থেকে সেটির নাম কসমিক ফার্মা। তবে পরে ফায়ার সার্ভিসের বোর্ডে গুদামের নাম লেখা হয় ‘শাহ আলম কেমিকেলস’। আবার স্থানীয় কয়েকজন বলেছেন, ওই গুদামের নাম ‘আলম ট্রেডার্স’।
তবে চারতলা ভবনটির দোতালায় পোশাকের একটি প্রিন্টিং কারখানা, নিচতলায় একটি ‘ওয়াশিং প্ল্যান্ট’ বা ‘ওয়াশ ফ্যাক্টরি’ ছিল বলে জানিয়েছেন কয়েকজন।
ঘটনাস্থলে সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাজুল ইসলাম চৌধুরী সাংবাদিকদের ১৬ জনের মৃত্যুর খবর দেন।
তিনি বলেন, “মৃতদেহগুলো এমনভাবে পুড়েছে, তাদের শনাক্ত করা সম্ভব নয়। আমার মনে হয় ডিএনএ টেস্ট ছাড়া কোনোভাবেই শনাক্ত করা সম্ভব না।”
এর আগে বিকালে ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তাজুল ইসলাম বলেন, ফায়ার কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে আগুন দেখেছেন। রাসায়নিকের গুদামে নাকি পোশাক কারখানা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
রাসায়নিকের গুদামের পরিস্থিতি তখন বিপদজনক থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে ফায়ার ফাইটারদের যেতে দেওয়া হচ্ছে না। আগুন নিয়ন্ত্রণে ড্রোনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরকেও কমপক্ষে ৩০০ গজ দূরত্ব বজায়ে রাখতে অনুরোধ করেন ফায়ার সার্ভিসের এই পরিচালক।
কারখানার কারো সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “যতটুকু জেনেছি, এটা আলম কেমিকেল ফ্যাক্টরি, সবাই বলে। কিন্তু এখন মালিকের কোনো মোবাইল ফোন অথবা মালিকের কোনো কর্মচারী ম্যানেজার কাউকেই পাওয়া যাচ্ছে না।
“পুলিশ এবং আর্মি সবাই চেষ্টা করছে, (কারখানার) কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না।”
স্বজনের খোঁজে মিরপুরে ছবি হাতে অনেকে
মিরপুরে পোশাক কারখানা ও রাসায়নিক গুদামের আগুনে মৃত্যু বেড়ে ১৬
মিরপুরের আগুনে পোড়া ওয়াশিং প্ল্যান্ট বিজিএমইএ-এর 'সদস্য নয়'