Published : 28 Apr 2026, 12:53 AM
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল এখনো চালু না হলেও এই জুন থেকেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে।
২০৫৬ সাল পর্যন্ত এই কিস্তি চলবে বলেছেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)-এর চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক।
সোমবার এভিয়েশন ও পর্যটন খাতের সাংবাদিকদের সংগঠন এটিজেএফবি সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, “ফার্স্ট কিস্তিটা এখনো আমরা শুরুই করি নাই। এটা জুন থেকে শুরু হবে। ২০৫৬ সাল পর্যন্ত কিস্তি পরিশোধ করতে হবে।”
শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল আগামী ডিসেম্বর থেকে ‘সীমিত আকারে’ চালুর কথা বলা হচ্ছে বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে। উদ্বোধনের সম্ভাব্য তারিখ রাখা হয়েছে ১৬ ডিসেম্বর।
তবে টার্মিনাল চালু না হলেও ঋণের কিস্তি হিসেবে বাৎসরিক শোধ করতে হবে হাজার কোটি টাকার বেশি। জুন থেকে এই কিস্তি শুরু করতে যাচ্ছে বেবিচক।
মূলত বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকার এই ঋণ চুক্তি হয়েছে। এরপর বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে বেবিচক- এর ‘ঋণ সমন্বয়’ বিষয়ে একটি চুক্তি হয়েছে। আরও দেড় বছর আগেই কিস্তি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সরকারের কাছ থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময় বাড়িয়ে নিয়েছে বেবিচক।
২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার বা ২৫ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই ৯০ ভাগ শেষ হয় বলে দাবি করা হয়েছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকার চেষ্টা করেও থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার জন্য কোন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করতে পারেনি। বিএনপি সরকার গত ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতা নিলে ওই মাসেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান থার্ড টার্মিনাল চালুর নির্দেশ দেন। সেই অনুযায়ী তোড়জোড় শুরু করেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা।
মূলত থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের অর্থায়নে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) থাকায় তাদের দেশী কোম্পানির কাছে এটা পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার কথা শুরু থেকেই হচ্ছিল।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের হাল ধরা অন্তর্বর্তী সরকারও চারটি কোম্পানির একটি জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তি করে বিরাট এই অবকাঠামোটাকে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে ওই চুক্তি হয়নি।
জাপানি এই কনসোর্টিয়ামে রয়েছে জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন, সোজিৎজ করপোরেশন ও নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট করপোরেশন।
গেল মার্চ ও এপ্রিলে সেই জাপানি কনসোর্টিয়ামের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসেছিলেন সরকারের চার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও এক উপদেষ্টা।
উচ্চ পর্যায়ের সেই বৈঠকগুলো ফলপ্রসু হয়েছে দাবি করে বেবিচক চেয়ারম্যান বলেন, “এ পর্যন্ত আমরা ৯ বার তাদের সঙ্গে নেগোসিয়েশনে বসেছি। আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন, দেশের স্বার্থ সম্পূর্ণ রক্ষা করা হবে।
“আলোচনায় কিছু বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হলেও এখনো কিছু বিষয়ে গ্যাপ রয়ে গেছে। তবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই চুক্তি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।”
চুক্তির সময়সীমা বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “নেগোসিয়েশন শেষ হওয়ার পর চুক্তি সই হতে কমপক্ষে তিন মাস সময় লাগবে। এরপর ছয় মাস থেকে এক বছরের একটি টেস্ট রান পরিচালনা করা হবে। টেস্ট রানের প্রায় ছয় মাস পর আমরা সীমিত আকারে তৃতীয় টার্মিনাল চালু করতে পারব বলে আশা করছি। সরকার ১৬ ডিসেম্বরকে একটি ডেডলাইন হিসেবে নির্ধারণ করেছে। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই কাজ এগিয়ে চলছে।”
তবে বিমানবন্দর শিফটিং বা পরিবর্তনের বিষয়টি অনেক ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ মন্তব্য করে মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বলেন, “বিশ্বের অনেক বিশেষজ্ঞের গবেষণা অনুযায়ী, একটি বিমানবন্দর থেকে অন্যটিতে শিফটিং প্রায় ৭৪ শতাংশ ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়। তাই আমরা সময় নিয়ে এগোচ্ছি। আশা করছি কোনো ধরনের বিপদে পড়বো না।”
বিমানবন্দরের সেই টার্মিনালটি চালু হতে দেরি হলেও সেখানে আরও কয়েক বছর আগেই সরঞ্জামগুলো স্থাপন করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকায় এসব সরঞ্জামের মেয়াদ বা রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে চেয়ারম্যান বলেন, “সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এডিসির সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তারা জানিয়েছে, তারা নিয়মিতভাবে ইকুইপমেন্টগুলোর মেইনটেনেন্স করছে এবং ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তা চালিয়ে যেতে পারবে।
“এমনকি মৌখিকভাবে তারা ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত সাপোর্ট দেওয়ার কথাও জানিয়েছে। যদি জাপানি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব পায়, তাহলে তাদের সঙ্গে এডিসি সমন্বয় করে কাজ করবে।”
বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং নিয়েও কথা ওঠে সভায়। এখন পর্যন্ত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের সব বিমানবন্দরে একচ্ছত্রভাবে গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং সেবা নিয়ে ‘বিস্তুর’ অভিযোগ রয়েছে এয়ারলাইন্সগুলোর।
থার্ড টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ে বিমানের পাশপাশি আরেকটি বিদেশি কোম্পানিকে যুক্ত করা হবে বলেন বেবিচক চেয়ারম্যান।
অনুষ্ঠানে এটিজেএফবি সভাপতি তানজিম আনোয়ার, সাধারণ সম্পাদক বাতেন বিপ্লবসহ সংগঠনটির সদস্য এবং বেবিচক কর্মকর্তারা অংশ নেন।