Published : 07 Aug 2025, 06:40 PM
আওয়ামী লীগ শাসনামলে তখনকার শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি অন্যায় আবদার করতেন বলে আদালতে দাবি করেছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ। তার ভাষ্য, প্রতিবাদ করায় অপবাদও ছড়িয়েছেন দীপু মনি।
বৃহস্পতিবার ঢাকার মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মো. জাকির হোসেন গালিবের আদালতে জামিন শুনানিতে তিনি এ দাবি করেন।
এদিনই মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে কলিমউল্লাহকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। বিকাল ৪টার দিকে দুদকের সাদা একটি মাইক্রোবাসে করে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। তাকে সরাসরি এজলাসে তোলা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক মিনহজ বিন ইসলাম তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। এরপর ৪টা ১৬ মিনিটে বিচারক এজলাসে ওঠেন। পরে ৪টা ২২ মিনিটে কলিমউল্লাহ শুনানি শুরু হয়। তখন তিনি কাঠগড়ার সামনে এসে দাঁড়ান।
এরপর শুনানি শুরু হয়। কলিমউল্লাহর পক্ষে তার আইনজীবী শাহনাজ সুমি জামিন চেয়ে শুনানি করেন।
তিনি বলেন, “নিয়ম বহির্ভূতভাবে তিনি কিছু করেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির সবকিছুতে একার বিষয় থাকে না। চাইলেই ২/৪ জন টাকা আত্মসাৎ করে নিতে পারে না।
“সবকিছু ডকুমেন্টারি ব্যাপার। তিনি কিছু আত্মসাৎ করেননি। বিধি-নিয়মকানুনের সাথে সবকিছু করেছেন। বয়স্ক, অসুস্থ মানুষ। তার জামিনের প্রার্থনা করছি।”
দুদকের পক্ষে কৌঁসুলি দেলোয়ার জাহান রুমি জামিনের আবেদনের বিরোধিতা করেন।
তিনি বলেন, “দুদকের মামলা হঠাৎ করে হয় না। দীর্ঘ সময় অনুসন্ধান হয়। আসামিও সে বিষয়ে অবগত থাকেন।”
মামলার অভিযোগ তুলে ধরে জামিনের বিরোধিতা করেন আইনজীবী রুমি।
এরপর বিচারকের প্রশ্নের মুখোমুখি হন নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ। কত সালে নিয়োগ পান জানতে চান বিচারক।
তিনি বলেন, “আমাকে প্রথমে বিইউপিতে প্রো-উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর তৎকালীন সরকার একদিনের জন্য আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তরিত করা হয়। পরবর্তীতে আমাকে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।”
এরপর বিচারক বলেন, “২০১৭ সালে।”
তিনি বলেন, “হ্যাঁ।”
বিচারক জানতে চান, “ক্যাম্পাস কোথায়?”
কলিমউল্লাহ বলেন, “রংপুরে।”
বিচারক বলেন, “আপনি তো ফুল টাইম ঢাকায় থাকতেন।”
কলিমউল্লাহ বলেন, “না, স্যার। আমি ঢাকায় থাকলেও ওখানে আমার বাংলো ছিল। এর জন্য বেতনের ৪০ শতাংশ কেটে নিতো “
তখন বিচারক বলেন, “চাকরিকালে আপনি তো ১৩৫২ দিনের মধ্যে ১১১৫ দিনই ঢাকায় ছিলেন।”
এর জবাবে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য বলেন, “তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি অন্যায় আবদার করতেন। তার কারণে ক্যাম্পাসে যেতাম না। আমি এই আবদারের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করি। তিনি রাগান্বিত হয়ে আমার বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়িয়েছেন।
“প্রতিদিন ১৭/১৮ ঘণ্টা ভার্সিটির স্বার্থে কাজ করেছি। মুক্তিযুদ্ধের পর এটায় প্রথম- কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি শিক্ষামন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। এই কারণে দীপু মনি আমার বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়িয়েছেন।”
তখন বিচারক বলেন, “আপনি ও আপনার মা একই নিয়োগ বোর্ডে ছিলেন?”
তখন কলিমউল্লাহ বলেন, “তিনি (তার মা) মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ডিজি ছিলেন। এজন্য সরকার নিয়োগ বোর্ডে সদস্য করেন।”
তখন বিচারক বলেন, “আপনি কি (একসঙ্গে) ভিসি, বিভাগীয় প্রধান ও ডিন ছিলেন?”
তখন তিনি বলেন, “আমিই প্রথম না। আমার আগের ভিসির ধারাবাহিকতা রক্ষায় এসব দায়িত্বে ছিলাম৷ বিশেষ পরিস্থিতিতে এ দায়িত্বে থাকতে হয়েছে।”
বিচারক জানতে চান, “চার বছরে উন্নয়ন খাতে কোনো টাকা পেয়েছেন?”
তখন তিনি বলেন, “আমার আগের ভিসি নূর নবীর সময় ৯৯ কোটি টাকার কাজ চলমান ছিল। আমি দায়িত্ব নিয়ে কাজ চলমান রেখেছি। আর নকশা পরিবর্তনের অভিযোগ আগের ভিসির বিরুদ্ধে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটায় উন্নয়ন প্রজেক্ট।
“আমি এসে নিয়োগ বাণিজ্য, চাকরি বাণিজ্য বন্ধ করে দিয়েছি।”
তখন বিচারক বলেন, “নিয়োগ বাণিজ্য, চাকরি বাণিজ্য আপনার বিরুদ্ধেই।”
এ সময় কলিমউল্লাহ বলেন, “নো, নেভার, নেভার।”
এসময় দুদকের কৌঁসুলি দেলোয়ার জাহান রুমি বলেন, “উনি ১৭ ঘণ্টা কাজ করেছেন। আমরা তো তাকে টকশোতে দেখেছি।”
তখন কলিমউল্লাহ বলেন, “সেটা তো রাতে।”
এসময় দুদক কৌঁসুলির কাছে বিচারক জানতে চান, “তার বিরুদ্ধে অন্য মামলা আছে কি না।”
আদালতকে জানানো হয়, এ মামলাই আছে। নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগের তদন্ত শুরু হবে।
বিচারক বলেন, “অভিযোগ আগে তদন্ত হোক। আপনি কী করেছেন, সেটা আলিমুল গায়েব জানেন, আপনি জানেন। কিছুদিন পর দুদক জানবে। এরপর মানুষ জানবে।”
তখন কলিমউল্লাহ বলেন, “গত মাসের ১৮ তারিখে মামলার বিষয়ে ব্রিফিংয়ে জানানো হয়। আমি ভেবেছিলাম, দুদক থেকে আমাকে তলব করা হবে। আজ সকালে আকস্মিকভাবে নাস্তার পর ডিবি পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করে। আপত্তি করিনি।”
বিচারক বলেন, “আপনি আপত্তি করবেন কেন? আপনার তো জেলে যেতে হবে। কবরেও একা যেতে হবে, জেলখানায়ও একা যেতে হবে। সাথে কেউ যাবে না। দুর্নীতি যারা করছেন, তারা জেলে পচছেন। আর দুর্নীতির টাকায় (আত্মীয়রা) অনেকে বিদেশ ভ্রমণ করছেন।”
এরপর কলিমউল্লাহ বলেন, “মাননীয় আদালত, কিছু মনে না করলে একটা কথা বলি। আমি কমিশন্ড অফিসার, গ্রেড-১ পারসন।”
বিচারক বলেন, “আপাতত আপনাকে জেলে যেতে হচ্ছে।”
পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে গত ১৮ জুন সাবেক দুই উপাচার্য কলিমউল্লাহ এবং এ কে এম নূর-উন-নবীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে এই মামলা করে দুদক।
শেখ হাসিনা ছাত্রী হল ও ড. ওয়াজেদ মিয়া রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ভবন নির্মাণে প্রায় ৪ কোটি টাকার অনিয়ম ও আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয় সেখানে।
অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্যের দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এই পদে দায়িত্ব পালন করেন অধ্যাপক এ কে এম নূর-উন-নবী।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন, সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য সচিব মো. জাহাঙ্গীর আলম, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মো. আবদুস সালাম বাচ্চু ও এম এম হাবিবুর রহমান।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন, সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য সচিব মো. জাহাঙ্গীর আলম, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মো. আবদুস সালাম বাচ্চু ও এম এম হাবিবুর রহমান।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ‘পরস্পর যোগসাজশ, বিশ্বাসভঙ্গ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে’ বেরোবিতে উন্নয়ন প্রকল্পে অনুমোদিত ডিপিপি উপেক্ষা করে নকশা পরিবর্তন এবং ৩০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের চুক্তি মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অনুমোদন ছাড়াই সম্পাদন করা হয়।
এছাড়া, ঠিকাদারের চলতি বিল থেকে কাটা নিরাপত্তা জামানত এফডিআর (স্থায়ী আমানত) আকারে ব্যাংকে জমা রেখে, সেই এফডিআরকে লিয়েনে রেখে ঠিকাদারকে ঋণ দিতে ‘না-আপত্তি সনদ’ প্রদান করা হয়—যার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় তথা সরকারের প্রায় ৪ কোটি টাকা সরাসরি ঠিকাদারকে দিতে সহযোগিতা করা হয়।
ঠিকাদারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিতে অগ্রিম অর্থ দেওয়ার কোনো বিধান না থাকলেও, ‘আর্থিক সহযোগিতা’ দেখিয়ে ব্যাংক গ্যারান্টি নিয়ে অগ্রিম বিল দেওয়া হয়। সেই অগ্রিম বিলের বিপরীতে নেওয়া ব্যাংক গ্যারান্টিগুলো বিল সমন্বয়ের আগেই অবমুক্ত করা হয়।
এছাড়া, প্রথম পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের দেওয়া নকশা ও পরিকল্পনা না মেনে সরকারি ক্রয়বিধির বাইরে গিয়ে দ্বিতীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হয়। আবার দরপত্রে অস্বাভাবিক মূল্যদানের (ফ্রন্ট লোডিং) মত বিষয় থাকার পরেও, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর), ২০০৮ অনুযায়ী যথাযথ মূল্যায়ন না করেই কার্যাদেশ দেওয়া হয়।