Published : 17 Jan 2026, 12:20 AM
ঢাকার উত্তরায় আবাসিক ভবনে লাগা আগুনে দুই পরিবারের শিশুসহ নিহত ছয়জনের কেউই আগুনে পোড়েননি, প্রচণ্ড ধোঁয়ায় শ্বাস বন্ধ হয়ে প্রত্যেকেই মারা গেছেন বলে ধারণা চিকিৎসকদের।
ভবনের দ্বিতীয় তলায় আগুনের সূত্রপাত হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই উপরের বাসিন্দাদের নিচের দিকে আসা সম্ভব ছিল না, আবার ছাদের দরজায় তালা থাকায় কেউ উপরেও উঠতে পারেননি।
বারান্দা থেকেই অনেকে হাত নেড়ে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছিলেন; চিৎকার করছিলেন। আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনার পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জানালার গ্রিল কেটে বেশ কয়েকজনকে উদ্ধার করেন ঠিকই, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা বলছেন, ছাদের দরজা খোলা থাকলে সবাই হয়ত বেঁচে যেতেন।
ছুটির দিনের সকালে ঘুম ভাঙার আগেই ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার পর আবারও প্রশ্ন উঠেছে, ঢাকার বাড়িওয়ালাদের ছাদ বন্ধ করে রাখার ‘প্রবণতার’ বিষয়ে।
শুক্রবার সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের ৩৪ নম্বর বাসায় আগুনের খবর পায় ফায়ার সার্ভিস, ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলেও ভবনের পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার দুটি পরিবারের ৬ সদস্য মারা যান।
ছয় তলা ভবনটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় সামনের দিকের ইউনিটে ডুপ্লেক্স বানিয়ে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বসবাস করেন বাড়িওয়ালা জুয়েল মোল্লা। আগুনের সূত্রপাত ঘটে দ্বিতীয় তলা থেকে। ফায়ার সার্ভিসের ধারণা, রান্নাঘরে শর্টসার্কিট বা গ্যাস লিকেজ থেকে আগুন লাগে।

ঘটনাস্থল থেকে মোট ১৬ জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায় ফায়ার সার্ভিস, তাদের মধ্যে ছয়জনের মৃত্যু হয়।
উত্তরা ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টাফ অফিসার আলম হোসেন বলেন, “ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা যাচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগে। তবে এটি তদন্তের বিষয়, ভবনে লাগা আগুনে পুড়ে কেউ মারা যায়নি। ধোঁয়ায় শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।”
তার ভাষ্য, “ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় ডুপ্লেক্স ছিল, সেখানে অনেক দাহ্য পদর্থ দিয়ে ডেকোরেশন করা। আগুনে পুড়ে সেখান থেকে প্রচণ্ড ধোঁয়ায় তৈরি হয় এবং পুরো ভবন ধোঁয়ায় ছেয়ে যায়।”
স্থানীয়দের সবাই বলছিলেন ছাদ বন্ধের কথা
শুক্রবার দুপুরে বাড়িটির সামনে গিয়ে এলাকাবাসীর জটলা দেখা যায়। সবাই নিজেদের মধ্যে আগুনের সময়কার বিভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ করছিলেন; আক্ষেপ করছিলেন মুহূর্তের মধ্যে ছয় প্রতিবেশীর মৃত্যু নিয়ে।
বাড়িটির প্রতিটি তলাতে কালো ধোঁয়ার স্পষ্ট ছাপ। কোথাও কোথাও জানালার কাঁচ ভাঙা।
সামনে ‘ক্রাইম সিন’ লেখা টেপ ঝুলিয়ে বাড়িতে প্রবেশ বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ। ভেতরে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট আলামত সংগ্রহ করছিলেন, আর নিচের গ্যারেজে ছিল পুলিশ প্রহরা।
পার্শ্ববর্তী ভবনের বাসিন্দা শফিক বলেন, “সকাল সাড়ে ৭টায় আমার বাড়ির নিচে দারোয়ান এসে বলতেছে আগুন আগুন। রুম থেকে বারান্দায় এসে দেখলাম ওই ভবনের দ্বিতীয় তলার কর্নারের রুমে আগুন জ্বলতেছে। এর কিছুক্ষণ পর ফায়ার সার্ভিস আসে।
“আমরা বাইরে থেকে দেখতেছি, ভেতরের লোকগুলা বারান্দা দিয়ে ডাকতেছে। ৬ তলার একজন ছাদ দিয়ে বের হইতে চাইছিল। ছাদ লক করা ছিল, ছাদে আর যাইতে পারে নাই মনে হয়। উনারে তো আর বের করতে পারল না। উনি আর উনার ছেলে মারা গেছেন। উনার ভাইকে দেখছি বারান্দা দিয়ে ডাকতেছিল।”

আশরাফুল ইসলাম নামে আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “ফায়ার সার্ভিস যখন নিচ থেকে পানি দিচ্ছিল, কিছুই হচ্ছিল না। পরে মই নিয়ে এসে যখন ভেতরে পানি মারা হইছে, তখন কমে আসছে। দোতলা থেকে আগুনটা উপরের দিকে ছড়াইছে। শক্ত গ্লাস, ভাঙা যাচ্ছিল না। গ্রিল কেটে কয়েকজনকে বের করছে।
“আজকে ছাদের তালাটা যদি খোলা থাকত, বা চাবিটা যদি সবার কাছে থাকত, অনেকে ছাদে চলে যেতে পারত।”
সামনের ভবনের বাসিন্দা রেহানা বলছিলেন, শুরুতে দ্বিতীয় তলা দিয়ে আগুনের ফুলকি বের হচ্ছিল। আর অন্য তলাগুলো দিয়ে প্রচণ্ড কালো ধোঁয়া বের হচ্ছিল।
তিনি বলেন, “ফায়ার সার্ভিস আসছে, তাদের কাছে প্রয়োজনীয় যন্ত্র ছিল না, শুধু পানি দিচ্ছিল। প্রথমে তারা গ্রিলই কাটতে পারেনি, লোকও বের করতে পারেনি। গ্রিল না কাটার কারণে লোকগুলা আটকা পড়ে মারা গেছে।”
হাফিজুর রহমান নামে এক বাড়িওয়ালা বলেন, “আজকের আগুনে বেশি সমস্যা হইছে ছাদ বন্ধ থাকার কারণে। কত সময় তারা ভেতরে আটকা ছিল। ছাদটা খোলা থাকত যদি, অনেকেই উপরে উঠে যেতে পারত। কারণ তাদের নিচে নামার তো সুযোগ ছিল না।”

নানীর বাসায় থাকায় বেঁচে যায় বড় ছেলে
নিহতদের মধ্যে কাজী ফজলে রাব্বি রিজভী (৩৮), তার স্ত্রী আফরোজা আক্তার সুবর্ণা (৩৭) এবং তাদের আড়াই বছর বয়সী ছেলে কাজী ফাইয়াজ রিশান পঞ্চম তলার সামনের দিকের ফ্ল্যাটে থাকতেন।
উত্তরাতেই কাছাকাছি এলাকাতেই সুবর্ণার বাবার বাসা থাকায় রাব্বি-সুবর্ণা দম্পতির বড় ছেলে কাজী রাফসান প্রাণে বেঁচে যান।
কর্মজীবী এই দম্পতি দুই সন্তানকেই নানির বাসায় রাখতেন। শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় আগের রাতে ছোট ছেলেকে নানির বাসা থেকে নিজ বাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন তারা।
রাব্বির বাড়ি কুমিল্লা সদর উপজেলার নানুয়া দিঘিরপাড়ে। তিনি এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসে চাকরি করতেন। তার স্ত্রী সুবর্ণা চাকরি করতেন স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসে।
সুবর্ণাকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। আর রাব্বিকে মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং রিশানকে ঢাকা স্পেশালাইজড হাসপাতালে নেওয়া হলে মৃত ঘোষণা করা হয়।
জাতীয় বার্ন প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. শাওন বিন রহমান বলেন, “উত্তরার আগুনের ঘটনায় আমাদের এখানে আফরোজাকে মৃত অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছে। তার শরীরে কোনো পোড়া ক্ষত নেই, ধোয়ায় অসুস্থ হয়ে তিনি মারা গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।”
সুবর্ণার বোন আফরিন জাহান বলেন, “দুলাভাই ও আপা দুজনই কর্মজীবী হওয়ায় তাদের দুই ছেলেই আমার বাবার বাসায় থাকত। শুক্রবার অফিস বন্ধের দিন হওয়ায় গতরাতেই ছোট ছেলেকে নানির বাসা থেকে নিজ বাসায় নিয়ে যায় বোন।
“সকালে ওই বাসায় আগুনের ঘটনা শুনতে পেয়ে আমরা যাই। আমার বোন, দুলাভাই ও ভাগিনার কারো শরীর দগ্ধ হয়নি, তারা ধোঁয়াতেই মারা গেছেন।”

ভাই-সন্তান-ভাতিজাকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ শহীদুল
নিহত মো. হারিছ উদ্দিন (৫২), তার ছেলে মো. রাহাব (১৭) এবং হারিছের ভাতিজি রাহমাতুল ইসলাম রোদেলা (১৪) ষষ্ঠ তলার সামনের দিকের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা। তাদের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে।
হারিছ ও শহীদুলের উত্তরাতেই ফলের পাইকারি ও খুচরা দোকান রয়েছে। দুই ভাই পরিবারসহ ষষ্ঠ তলার একই ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন।
ঘটনার সময় হারিছের স্ত্রী ও এক সন্তান বাড়িতে ছিলেন না। আর বাসায় থাকা শহীদুল এক সন্তান ও স্ত্রীসহ প্রাণে বেঁচেছেন।
শহীদুল বলছিলেন, আগুন লাগার প্রচণ্ড ধোঁয়া দেখতে পেয়ে স্ত্রী ও এক সন্তানসহ বাসার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ান। তিনি চিৎকার চেঁচামেচি করে বাইরে থাকা লোকজনের কাছে সাহায্য চাচ্ছিলেন। পাশের কক্ষে তার সন্তান ও ভাতিজিকে জড়িয়ে ধরে মরে ছিলেন ভাই হারিছ।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বার বার কাঁদছিলেন। কান্না থামিয়ে তিনি বলেন, “আমার ভাই তার মেয়ে ও ভাতিজাকে নিয়া ছাদের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। বাসার দরজা খুলে দেখে খুব ধোঁয়া, সাথে সাথেই রুমে ঢুকে যায়। এদিকে আমরা বারান্দায় চলে যাই। কিন্তু ধোঁয়ার কারণে ভেতরে তাদের কী অবস্থা দেখতে পাই নাই।
“পরে দেখি রুমে তিনজনই পইড়া আছে। হাসপাতালে নেওয়ার পরে কাউরে বাঁচানো যায় নাই। তারা যদি বারান্দায় আইসাও দাড়াইতো, বাঁইচা যাইতো। ছাদটা খোলা থাকলে হয়তো ভেতরে এতো ধোঁয়া জমতো না, তারাও ছাদে যাইতে পারত।”
রোদেলা শাহীন ক্যাডেট স্কুলের ৭ম শ্রেণির এবং রাহাব সিভিল অ্যাভিয়েশন কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
জানাজা শেষে লাশ নেওয়া হয় গ্রামের বাড়িতে
হারিছ, তার ছেলে রাহাব ও ভাতিজি রোদেলার জানাজা শুক্রবার জুম্মার পর এবং রাব্বী, তার স্ত্রী সুবর্ণা ও সন্তান রিশানের জানাজা আসরের পর স্থানীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাদের লাশ গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানেই তাদের দাফন হবে বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।
চিকিৎসকের বরাতে উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি কাজী মো. রফিক আহমেদ জানিয়েছেন, নিহত ছয়জনের কেউই দগ্ধ হননি।
আগুনের সূত্রপাত ও বিভিন্ন বিষয়ে বাড়ির মালিক জুয়েল মোল্লার সঙ্গে কথা বলা হবে জানিয়ে ওসি বলেন, “আমরা বাড়ির মালিককে এখনো পাইনি। শুনেছি তিনিও হাসপাতালে আছেন।”
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের ঢাকা মেট্রো উত্তরের সহকারী পুলিশ সুপার এ কে এম নাসিরুদ্দি বলেন, “কী কারণে, কোথায় এবং কীভাবে আগুন লাগল, এটার বিষয়ে আমাদের সকল সংস্থা তদন্ত করবে, সকলের মিলিত তদন্ত ফল একসঙ্গে করলে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। তদন্তের পর জানা যাবে, এটি শর্টসার্কিট থেকে হয়েছে নাকি অন্য কোনো কারণ রয়েছে।”
আরও পড়ুন
উত্তরায় আবাসিক ভবনে আগুন: দুই পরিবারের ৬ জনের মৃত্যু
উত্তরায় আগুনে ৬ জনের মৃত্যু: পাশাপাশি খোঁড়া হচ্ছে তিন কবর, গ্রামজুড়ে শোক