Published : 10 Apr 2026, 10:28 PM
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলোর বৈধতা প্রশ্নে জাতীয় সংসদের সাংবিধানিক নিষ্পত্তির কাজ শেষ হয়েছে।
সমঝোতা, বিতর্ক, ‘ওয়াকআউটের’ মধ্য দিয়ে ছয়দিনে ৯১টি বিল পাসের মাধ্যমে ১২০টি অধ্যাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ করেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ।
এর মধ্যে ১১৩টি অধ্যাদেশকে ৮৭টি বিল পাসের মাধ্যমে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর যেগুলো আইনে পরিণত হবে।
আরও চারটি পৃথক রহিতকরণ বিল পাসের মাধ্যমে সাতটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে, এগুলোর মধ্যে ছিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ।
অন্যদিকে সংসদে বিল আকারে অনুমোদন না পাওয়ায় ১৩টি অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে গেছে।
যে কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি অধ্যাদেশ শনিবার থেকে কার্যকারিতা হারাবে।
শুক্রবার সংসদে শেষ দফায় ২৪টি বিল পাস হয়। দিনের কার্যসূচি শেষে স্পিকার আগামী ১৫ এপ্রিল বুধবার সকাল ১১টা পর্যন্ত অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন।
তার আগের দিন বৃহস্পতিবার ৩১টি, বুধবার ১৩টি, মঙ্গলবার ১৪টি, সোমবার ৭টি ও রোববার ২টি বিল পাস হয়।

কোন অধ্যাদেশের কী হল?
সংসদ চলমান না থাকলে জরুরি পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির জারি করা সাময়িক আইনই হল অধ্যাদেশ। এ অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপনের পর ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। শুক্রবারই ছিল সেই নিষ্পত্তির শেষ সময়।
গত ১২ মার্চ সংসদের প্রথম কার্যদিবসে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করেন। পরে সেগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে সেখানে পাঠানো হয়।
২ এপ্রিল বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন সংসদে প্রতিবেদন পেশ করেন।
ওই প্রতিবেদনে ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু, ১৫টি সংশোধিত আকারে পাসের সুপারিশ করা হয়। আর চারটি অধ্যাদেশ রহিত করার এবং ১৬টি পরবর্তীতে অধিকতর যাচাই-বাছাই করে শক্তিশালী আকারে নতুন বিল হিসেবে আনার সুপারিশ ছিল।
সংসদের চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে ১১৩টি অধ্যাদেশ অনুমোদন পেলেও, সাতটি অধ্যাদেশ রহিত করা হয়েছে। অন্যদিকে গণভোট, পুলিশ কমিশন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, দুদক অধ্যাদেশসহ ১৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করা হয়নি।
যেসব অধ্যাদেশ রহিত হল
সংসদে পাস হওয়া রহিতকরণ বিলগুলোর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, জাতীয় সংসদ সচিবালয় এবং মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশসহ মোট সাতটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে।
এই ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশের অধীনে আগে নেওয়া পদক্ষেপগুলোর সুরক্ষা রেখে সেগুলো রহিত করা হয়েছে।

গণভোট, গুম ও পুলিশ কমিশন নিয়ে অনিশ্চয়তা
সংসদে না তোলায় কার্যকারিতা হারাচ্ছে যে ১৩টি অধ্যাদেশ, সেগুলো হল-গণভোট অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, কাস্টমস (সংশোধন) অধ্যাদেশ, আয়কর (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) সংশোধন অধ্যাদেশ এবং রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ।
এসব অধ্যাদেশের অধীনে অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর আইনি পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে, গণভোট অধ্যাদেশের অধীনে হওয়া কার্যক্রম, গুমবিরোধী কাঠামো বা পুলিশ সংস্কার কমিশন-সংক্রান্ত উদ্যোগগুলোর অবস্থান এখন আলাদা আইনি ব্যাখ্যার বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তবে সংসদে বিতর্কের সময় আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দুজনেই বলেছেন, বিশেষ কমিটির সুপারিশে যেসব অধ্যাদেশ এখন বিল আকারে তোলা হয়নি, সেগুলো ভবিষ্যতে আবার আনা হবে। তাদের ভাষ্য, ‘ল্যাপস’ মানেই আলোচনার সমাপ্তি নয়; প্রয়োজনে নতুন বিল আকারে সেগুলো আবার সংসদে আসতে পারে।
সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদের কথা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদে বলেন, ৩০ দিনের মধ্যে অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করতে হয়; কোনোটি উত্থাপন না করা হলে তা ‘ল্যাপস’ হয়। কোনোটি উত্থাপন করা হয়। যেগুলো ‘ল্যাপস’ হয় সেগুলোকে পরে বিল আকারে অনুমোদন বা অননুমোদন করতে হয়।
বিশেষ কমিটির সুপারিশের বাইরে যা ঘটল
শেষ দিনের সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, ২০২৬ ঘিরে।
বিশেষ কমিটির সুপারিশ ছিল, এই অধ্যাদেশটি হুবহু বিল আকারে পাস হবে। কিন্তু সংসদে উত্থাপনের পর ৮ ধারায় তিনটি সংশোধনী আনা হয়। সরকারদলীয় সদস্য আনিছুর রহমানের প্রস্তাবিত ওই সংশোধনীগুলো কণ্ঠভোটে গৃহীত হওয়ার পর বিলটি সংশোধিত আকারে পাস হয়।
বিলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে পরিবর্তন ছিল তা হল, জাদুঘরের পর্ষদের সভাপতি হিসেবে বাইরে থেকে মনোনীত কোনো বিশেষজ্ঞের বদলে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীকে বসানোর বিধান।
এ নিয়েই বিরোধী দল ক্ষুব্ধ হয়। বিরোধী দলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে অভিযোগ করেন, বিশেষ কমিটিতে যে ‘সমঝোতা’ হয়েছিল, এই সংশোধনীর মাধ্যমে তা ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
তার ভাষায়, স্পিকারের সামনেই ‘দিন-দুপুরে ছলচাতুরি’ করে বিলটি সংশোধনীসহ পাস করা হয়েছে।
এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে দীর্ঘ বিতর্ক হয়।
বিতর্কের এক পর্যায়ে আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার বিশেষ কমিটির ‘সমঝোতা’ অনুযায়ীই বিলটি সংসদে এনেছে। পরে একজন বেসরকারি সদস্য সংশোধনী এনেছেন, সংসদ তা পাস করেছে।
তার ভাষায়, বিলটি সরকার ‘সমঝোতার’ ভিত্তিতেই উত্থাপন করেছে; পরে বেসরকারি সদস্যের অধিকার বলে আনা সংশোধনী কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বলেন, জাদুঘরটি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতীকী প্রতিষ্ঠান, ভবিষ্যতে এটিকে আরও শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য কাঠামোয় নিতে আলোচনার সুযোগ খোলা আছে। প্রয়োজনে আবার সংশোধনী বিলও আনা যেতে পারে।
বিরোধী দলের ‘ওয়াকআউট’
জুলাই স্মৃতি জাদুঘর বিলের সংশোধনী এবং বাকি অধ্যাদেশগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে অসন্তোষ থেকেই শেষ পর্যন্ত ‘ওয়াকআউট’ করে বিরোধী দল।
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, সরকারি দল তাদের সঙ্গে তৈরি হওয়া ‘আস্থার জায়গা নষ্ট করেছে’।
তিনি বলেন, বিরোধী দল এতক্ষণ সমঝোতার স্বার্থে সহযোগিতা করছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে তারা দেখেছেন ‘ট্রাস্ট’ আর রইল না।
দীর্ঘ তর্ক-বিতর্কের পর জামায়াত আমির বলেন, “ইনশাআল্লাহ আরও দেখা হবে, এখানেই দেখা হবে। তবে আজকের মতো দুঃখ নিয়ে আমরা ওয়াকআউট করছি।”
‘ওয়াকআউটের’ আগে বিরোধীদলীয় নেতা স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, “আপনি সবার জন্য ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু আজ আমরা আপনার কাছ থেকে ন্যায়বিচার পাচ্ছি না।”
পরে সন্ধ্যা ৭টা ৩৭ মিনিটের দিকে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও খেলাফত মজলিসের সদস্যরা অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন।
শেষ দিনে যে ২৪ বিল পাস হল
শুক্রবার পাস হওয়া ২৪টি বিলের মধ্যে ছিল গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রীর উত্থাপিত পাঁচটি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দুটি বিল, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দুটি বিল, অর্থমন্ত্রীর একাধিক আর্থিক ও রাজস্ব বিল, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুটি বিল, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দুটি বিল, মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) বিল এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার, জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন বিল।
এর মধ্যে আর্থিক খাতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল আমানত সুরক্ষা বিল, বাংলাদেশ ব্যাংক (সংশোধন) বিল, ব্যাংক রেজল্যুশন বিল এবং অর্থ (২০২৫-২৬) অর্থবছর বিল।
বিরোধী দলের ওয়াকআউটের পর সংসদে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) বিল পাস হয়।